kalerkantho


রাজশাহী মহানগরে জুয়া

৫০ স্থানে কোটি টাকা লেনদেন

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



৩১ জানুয়ারির ঘটনা। এদিন রাতে রাজশাহী মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে দড়িখরবোনা এলাকা থেকে একসঙ্গে ১৩ জন জুয়াড়িকে আটক করে। তবে পরের দিন আদালত থেকে তাঁরা জামিনে মুক্ত হন। এরপর বন্ধ ছিল নগরের প্রাণকেন্দ্রে গড়ে ওঠা জুয়ার আসরটি। কিন্তু চার-পাঁচ দিন ধরে আবার সেখানে বসছে তাসের মাধ্যমে জুয়ার আসর।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মহানগরের ৫০টির বেশি স্থানে জুয়ার আসর (বেশির ভাগ তাসের মাধ্যমে) বসে। আর এসব আসরে প্রতিদিন লেনদেন হয় অন্তত এক কোটি টাকা। বিশেষ করে রাজশাহী জেলা ক্রীড়া সংস্থা পরিচালিত হাউজি নামের প্রকাশ্যে চলা জুয়ার আসরেই অন্তত ৩০ লাখ টাকার লেনদেন হয়। এখানে প্রতিদিন সাইড খেলার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে তিন লাখ টাকার মতো।

সরকারি দলের স্থানীয় কিছু নেতা এই টাকাগুলো ভাগ-বাটোয়ারা করে নেন। কিছু টাকা যায় জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তাদের পকেটে। এ নিয়ে সম্প্রতি কালের কণ্ঠে একটি অনুসন্ধানী খবর প্রকাশ হয়। এরপর নড়েচড়ে বসেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা; কিন্তু আবার চলছে হাউজিতে অবৈধ সাইড খেলা। মহানগর পুলিশ মাঝেমধ্যে জুয়ার আসরগুলোতে অভিযান চালিয়ে জুয়াড়িদের আটক করলেও কয়েক দিন পর আবার আসর বসে।

একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, জেলা স্টেডিয়াম মার্কেটসহ রাজশাহী নগরীতে যেসব স্থানে জুয়ার আসর বসে, সবকয়টি থেকেই নিয়মিত মাসোহারা নেন সংশ্লিষ্ট থানার কর্মকর্তারা। গোয়েন্দা পুলিশের সেকেন্ড অফিসার হাসান আলী এবং সংশ্লিষ্ট থানার ক্যাশিয়াররা নগরে বসা জুয়ার আসরগুলো নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে কখনো কখনো অভিযান চালানোর আগেই জুয়াড়িদের কাছে খবর চলে যায়। ফলে পুলিশের সেসব অভিযান ব্যর্থ হয়। তবে অভিযুক্ত হাসান আলী বলেন, ‘আমি এসবে জড়িত নই। আমার বিরুদ্ধে যারা বলেছে তারা মিথ্যা বলেছে।’

অভিযোগ রয়েছে, দড়িখরবোনা এলাকার জুয়ার আসরটি নিয়ন্ত্রণ করেন রাসেল ইসলাম, উজ্জ্বল হোসেন, তোজাম্মেল হোসেন টনি, ইয়ার আলী প্রমুখ। গত ৩১ জানুয়ারি তাঁদেরসহ ১৩ জনকে আটক করেছিল পুলিশ; কিন্তু কয়েক দিন পর তাঁরা আবার একই স্থানে জুয়ার আসর বসিয়ে প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। নগরের শালবাগান বাজারে স্থানীয় আবদুস সালাম জুয়ার আসর নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ। কয়েক দিন আগে পুলিশ সেখানে অভিযান চালিয়েছিল; কিন্তু পুলিশ যাওয়ার আগেই জুয়াড়িরা খবর পেয়ে পালিয়ে যান। তবে এখনো সেখানে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর বসে জুয়ার আসর।

স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, নগর গোয়েন্দা পুলিশই জুয়াড়িদের পালিয়ে যেতে সহায়তা করে। এরপর লোক-দেখানো অভিযান করে চলে আসে পুলিশ। অভিযানের আগেই জুয়াড়িদের খবর পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন নগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার আল-আমিন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সেখানে অভিযান করেছিলাম; কিন্তু কেমনে কেমনে তারা আগেই টের পেয়ে গেল বুঝলাম না। তবে জুয়াড়িদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। প্রায় প্রতিদিনই জুয়াড়ি আটক হচ্ছে; কিন্তু জুয়াড়িরা দ্রুত

আদালত থেকে মুক্ত হয়ে ফের একই কাজে জড়িয়ে পড়ছে।’

পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া তথ্য মতে, মহানগরের অর্ধশতাধিক স্থানে জুয়ার আসর বসে প্রতিদিন। এখানে এসে টাকা হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে এক শ্রেণির মানুষ। আর জুয়ার আসর বসিয়ে রাতারাতি লাখোপতি বনে যাচ্ছে অনেকেই। অনেকে বাড়ি-গাড়িরও মালিক এখন। অথচ এক-দুই বছর আগেও তাদের সহায়-সম্বল ছিল না। কেউ বস্তিতে থেকে জুয়ার আসর বসিয়েই লাখোপতি হয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে নগরের কাশিয়াডাঙ্গা থানার গোবিন্দপুরের ওয়াপদা মাঠ, বন্ধগেট এলাকা, কোর্টবাজার কাঁচাবাজার, বুলনপুর, আলীর মোড়, রায়াপাড়া ঘুঘুপাড়া, চারখুটার মোড়, বোয়ালিয়া থানার জেলা স্টেডিয়াম মার্কেট, দড়িখরবোনা, শিরোইল বাসস্ট্যান্ড, উপশহর নিউ মার্কেট এলাকা, মতিহারের শ্যামপুর, কাটাখালী, বিনোদপুর, শাহমখদুম থানার মালদা কলোনি, নওদাপাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে রমরমা জুয়ার আসর বসতে দেখা গেছে। শহর ও শহরের বাইরে থেকে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কার নিয়ে গিয়েও জুয়ার আসরে যোগ দেয়। তবে গাড়িগুলো রাখা হয় জুয়ার আসর থেকে একটু নিরাপদ দূরত্বে। জুয়ার আসরগুলো স্থানীয় থানা পুলিশকে ম্যানেজ করে বসে বস্তির গলির মধ্যে খুপরি বাড়িতে অথবা কোনো ঘরে। এসব আসরে প্রতিদিন অন্তত ৫০০ জুয়াড়ি যোগ দেয়। তাসের মাধ্যমে চলে জুয়াখেলা।

জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক রাফিউস শামস বলেন, ‘হাউজিতে সাইড খেলার মাধ্যমে কিছু টাকা মিসিং হচ্ছে। এ টাকা লেনদেন হচ্ছে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে। এখানে আমরা জড়িত নই।’

জানতে চাইলে রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ইফতে খায়ের আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের থানাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া আছে যে কোনো ধরনের জুয়ার আসর বসতে দেওয়া যাবে না। মাঝেমধ্যে আমরা রেইডও দিচ্ছি। বোয়ালিয়ার শিরোইল এলাকায় আমরা মাঝেমধ্যেই অভিযান চালাই; কিন্তু তার পরেও কিছু ঘটনা ঘটছেই। এসব নিয়ে আমরা বড় ধরনের অভিযানে যাব প্রয়োজনে।’


মন্তব্য