kalerkantho


শেখ সুলতানের অজানা অধ্যায়

শেখ সুলতান আহমেদ বায়ান্নয় বাড়ি ছাড়া হয়েছিলেন। তারপর ১৩ বছরের নির্বাসিত জীবন। ময়মনসিংহ শহরেরও বেশি মানুষ জানে না। নিয়ামুল কবীর সজল জানতে গিয়েছিলেন

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



শেখ সুলতানের অজানা অধ্যায়

শহরের প্রবীণরাও বুঝি ভুলে গেছে। আর তরুণ-যুবারা তাঁকে চেনে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মী হিসেবেই। অথচ সুলতান আহমেদের যৌবনের সবটাই আর মধ্য বয়সেরও অনেকটাই সংগ্রাম, ত্যাগ আর সাহসে ভরা। সালটা বায়ান্ন। মানে ভাষা আন্দোলনের বছর। ওই বছর থেকেই পরের ১৩ বছর মানুষটাকে বাড়ির বাইরে থাকতে হয়েছে। আজও তাঁর সেসব দিনের স্মৃতি টাটকা।

 

পাতিল ছুড়ে মারেন সোজা

সুলতান আহমেদের জন্ম ১৯২৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। শহরের সেহড়া এলাকায়। বাবার নাম শেখ ইজ্জত আলী। মা তাহিরুন্নেসা। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে শেখ সুলতান তৃতীয়। ১৯৪৭ সালে ময়মনসিংহ শহরের সিটি কলেজিয়েট স্কুলে তিনি নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৪৯ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। রাজনীতির সঙ্গে যোগ তৈরি হয়েছিল স্কুলবেলায়ই। সভা-সমাবেশে যেতেন। গোপন বৈঠকেও হাজিরা দিতেন। জানালেন, বায়ান্নর মিছিলে ঢাকার ছাত্র-যুবাদের ওপর পুলিশের গুলি চালানোর খবর ময়মনসিংহ জেলা শহরে ছড়িয়ে পড়ার পর উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। শেখ সুলতান আহমেদ তখন ছাত্র ফেডারেশন করতেন। পার্টি অফিসে সিদ্ধান্ত হয় সেহড়া এলাকায় কালো পতাকা টানানো হবে। পোস্টারও লাগানো হবে। সেহড়াকে লোকে তখন বলত কমিউনিস্ট পাড়া। তখন সুলতানের বিরুদ্ধে হুলিয়া ছিল। তিনি পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে এলাকার বাসায় বাসায় গিয়ে পুরনো কালো শাড়ি সংগ্রহ করে পতাকা বানান। ময়মনসিংহ মহিলা পরিষদের সভানেত্রী কমরেড আলতাব আলীর স্ত্রী মজিরন নেছা এবং কমরেড ওয়াহেদ মিয়া ও কমরেড আক্তার আলীও তাঁর সঙ্গী ছিলেন। মজিরন নেছার পিতার বাসায় পোস্টার লেখার কাজ চলে। অ্যাডওয়ার্ড স্কুলের (এডওয়ার্ড ইনস্টিটিউশন) দেয়ালে পোস্টার লাগানোর খবর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পৌঁছে যায় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আব্দুল মোনায়েম খানের ছেলে আখতারুজ্জামান বাচ্চুর কাছে। বাচ্চু অস্ত্রসহ লোকজন নিয়ে সেহড়া এলাকায় আসে। প্রথমে গালাগাল করতে থাকে; তারপর একপর্যায়ে ছুরি (ডেগার) দিয়ে শেখ সুলতান আহমেদকে আঘাত করতে যায়। এ সময় সুলতানের হাতে ছিল গরম আঠা ভরা মাটির পাতিল। পাতিলটি সোজা বাচ্চুর মুখে ছুড়ে মারেন সুলতান। তারপর কিছু কিল-ঘুষি মেরে সোজা দৌড়। আশ্রয় নেন ভগ্নিপতি আশরাফ আলীর বাসার খাটের তলায়। চাচাতো বোন হালিমা খাতুন বিছানার চাদর দিয়ে শেখ সুলতানকে ঢেকে রাখেন।

 

বাচ্চু খুব খেপে ছিল

সুলতানকে খুঁজতে থাকে বাচ্চু। জীবনের হুমকি তৈরি হলো। বুঝলেন শহরটি আর নিরাপদ নয়। যেকোনো সময় প্রাণনাশ হতে পারে। ভগ্নিপতির সঙ্গে পরামর্শ করলেন। একটি রিকশার চারদিক কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো। ওই সময়ে পর্দানশিন মহিলারা এভাবে রিকশায় চলতেন। রিকশায় করে সুলতান পৌঁছান শহরতলীর কেওয়াটখালী। সেখান থেকে হেঁটে যান পাশের এলাকা সুতিয়াখালী। সেখানে এক আত্মীয়ের বাড়ি ছিল। তারপর গেলেন কাছের রেলস্টেশনে। রাত ২টার দিকে একটি মেইল ট্রেন লাইন ক্লিয়ার না পেয়ে হুইসেল দিয়ে আস্তে আস্তে যাচ্ছিল। শেখ সুলতান দৌড়ে চলন্ত ট্রেনে উঠে পড়লেন। জানেন না কোথায় যাবেন। একসময় চট্টগ্রামে পৌঁছলেন। সম্বল মাত্র ১৫ টাকা।

চট্টগ্রাম রেলস্টেশনের কাছেই ছিল সুলতানীয়া হোটেল। সেখানে উঠলেন। টাকা ফুরিয়ে গেল সাত দিনের মাথায়। নিজের বাটা জুতা জোড়া বিক্রি করে দিলেন তিন টাকায়। তারপর এক লোক মারফত কাজ নেন রিকশার গ্যারেজে। কিছুদিন পর ট্রাংক, স্যুটকেস মেরামত ও রং করার কাজ ধরলেন। আরো কিছুকাল পর চলে গেলেন চন্দ্রঘোনায়। সেখানে গিয়ে নামও বদলে ফেললেন। হলেন ওয়াজেদ মিয়া। চন্দ্রঘোনায় সাইকেল, টর্চলাইট আর গ্রামোফোন মেরামতের কাজ করতে থাকলেন। একসময় সেখানে সিরাজ মিয়ার সঙ্গে পরিচয় হলো। তাঁর মারফত বিয়ে করলেন কুমিল্লায়। সেটি ১৯৬১ সাল। তার পরও কেটে গেলে পাঁচ বছর। এলো ১৯৬৬ সাল। পাকিস্তান এয়ারলাইনসের একটি বিমান মিসর যাওয়ার সময় দুর্ঘটনাকবলিত (ক্রাশ) হয়। মারা যায় সব যাত্রী। আক্তারুজ্জামান বাচ্চুও ওই বিমানের যাত্রী ছিল। চট্টগ্রামে এ খবর পৌঁছলে বাড়ির পথ ধরেন শেখ সুলতান আহমেদ। তত দিনে চলে গেছে ১৩টি বছর। সুলতান আহমেদ নিজের শহর ময়মনসিংহে প্রবেশ করেন। এলাকার লোকজন ও পুরনো রাজনৈতিক বন্ধুরা তাঁকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

 

তারপর দেশ স্বাধীন হলো

স্বাধীনতার পর অসহায় গরিব মানুষদের জন্য কিছু করতে চাইলেন সুলতান। গড়ে তুললেন ‘সেহড়া বহুমুখী সমাজকল্যাণ সমিতি’। ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বেসরকারি সংস্থা এখন ময়মনসিংহের একটি নামি প্রতিষ্ঠান। মূলত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীদের কর্মসংস্থান বিষয়ে কাজ করে।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের আগে ১৯৪৯ সালে বেশ কয়েক মাস জেল খেটেছিলেন শেখ সুলতান আহমেদ। সেইবার টংক আন্দোলনের (উত্তর ময়মনসিংহে খাজনা বিলোপের এ আন্দোলন শুরু হয় ১৯৩৭ সালে) সমর্থনে পোস্টার লাগাচ্ছিলেন। ধরা পড়েন পোস্টারসহ। তাই দোষ স্বীকার করতে হয়েছিল।

এখন সুলতানের বয়স নব্বই ছুঁই ছুঁই। এখনো তিনি সক্রিয়। সমাজ ও মানুষ নিয়ে ভাবেন। নতুন প্রজন্ম অবশ্য সেভাবে তাঁকে জানে না।



মন্তব্য