kalerkantho


নতুন ডাক্তার ভাই

ডাক্তার ভাই এড্রিক বেকার মধুপুরের কালিয়াকুড়িতে গরিবের জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন। বেকার মারা যাওয়ার পর দায়িত্ব নিয়েছেন জেসন-মারিন্ডি দম্পতি। তাঁদের খবর নিয়ে এসেছেন মো. আমিনুল হক

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



নতুন ডাক্তার ভাই

আমেরিকার উইসকনসিনে এমবিবিএস প্রথম বর্ষের ছাত্র তখন জেসন। ১৯৯৯ সাল সেটা। জেসনের চাচা ফাদার ডাকলেসের মাধ্যমে থানারবাইদ গ্রামে বেকারের সঙ্গে পরিচয় হয় জেসনের। বেকারের হাসপাতাল তখন থানারবাইদে ছিল। চালু ছিল আউটডোর। একটা মোটা খাতায় রোগীর নামধাম লিখে রাখতেন বেকার। পরের বছরই মানে ২০০০ সালে আবারও বাংলাদেশে আসেন জেসন; কিন্তু ডাক্তার ভাইকে পাননি। তিনি তখন ঢাকায় ছিলেন। জেসন একাই এক সপ্তাহ থেকেছেন হাসপাতালে।

 

অন্যদিকে জেসনের সঙ্গী ডাক্তার মারিন্ডির বাড়ি আমেরিকারই মিনেসোটায়। পড়াশোনা করেছেন ইউনিভার্সিটি অব ওকলাহোমায়। ক্যালিফোর্নিয়ার নেটিভিডেড মেডিকেল সেন্টারে কাজের সূত্রে ২০০৩ সালে জেসনের সঙ্গে পরিচয়। ২০০৫ সালে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন তারা। 

তত দিনে হাসপাতাল চলে গেছে কালিয়াকুড়িতে। মারিন্ডিকে নিয়ে জেসন কালিয়াকুড়িতে এসে এক সপ্তাহ থাকেন। এখানকার সব কিছু তাঁর ও তাঁর স্ত্রী মারিন্ডির ভালো লেগে যায়। নতুন দম্পতি সিদ্ধান্ত নেন আমেরিকা ফিরে গিয়ে কমিউনিটি বেইজড চিকিৎসায় উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেবেন। এর মধ্যে ২০০৯ সালে জেসনের চাচা ডাকলেস মারা যান ময়মনসিংহে। সংক্ষিপ্ত সফর শেষে সেইবার দ্রুতই ফিরে যান জেসন। তারপর ২০১৫ সালে কালিয়াকুড়িতে এসে দেখেন ডাক্তার ভাই অসুস্থ। কয়েক মাস পর আমেরিকায় বসে জেসন খবর পান ডাক্তার ভাই মারা গেছেন। তখন নিজের ব্যস্ততা ও ছেলে-মেয়েরা ছোট থাকার কারণে জেসন বাংলাদেশে আসতে পারেননি।

শেষে সব গোছগাছ করে ২০১৮ সালের জুন মাসে পাকাপাকিভাবে বাংলাদেশে চলে আসেন জেসন আর মারিন্ডি। বলেন, ‘প্রথমে ভাষা শিখতে শুরু করি। ভাত আর পাঙ্গাশ মাছ খাওয়া রপ্ত করেছি। বাঙালি পোশাক পরতে আমরা দুজনেই ভালোবাসি। ডাক্তার ভাই যে পদ্ধতিতে হাসপাতাল চালাতেন, আমরা সে পদ্ধতিই অনুসরণ করছি। এখানে সবাই আন্তরিক। তবে নিউজিল্যান্ড থেকে টাকা আসা কমে গেছে। ডাক্তার ভাই বলে গেছেন, এলাকার মানুষের সঙ্গে ভালো বন্ধুত্ব গড়তে হবে। তবেই মানুষ কাছে আসবে। ভরসা করবে।’

মাটির হাসপাতাল

হাসপাতালটি যেমন

ছোট ছোট ২৩টি ঘর আছে হাসপাতালের। সবই মাটির ঘর। এখানে রান্না করে খাওয়ার ব্যবস্থাও আছে। সেবার মান ভালো, তাই রোগীর ভিড় সব সময় থাকে। প্রতিষ্ঠাতা এড্রিক বেকার ছিলেন নিউজিল্যান্ডের মানুষ। মারা যাওয়ার পর বেকারকে হাসপাতালে তাঁর থাকার ঘরেই সমাহিত করা হয়। উল্লেখ্য, বেকারের স্বাস্থ্যকেন্দ্র চার একর জায়গার ওপর। তাঁর দুই বোন হিলারি ও হিল্ডা মাঝেমধ্যে এসে হাসপাতালটি দেখে যান। অর্থ সাহায্যও দিয়ে যান তাঁরা। হাসপাতালটিতে ডায়াবেটিস বিভাগ, যক্ষ্মা বিভাগ, মা ও শিশু বিভাগ এবং ডায়রিয়া বিভাগ আছে। ৪০ জন রোগী এখানে ভর্তি থাকতে পারে। এখানে বহির্বিভাগে প্রতিদিন প্রায় ১০০ রোগী দেখা হয়।  বহির্বিভাগে নতুন রোগী এলে টিকিট কাটতে হয়। নতুন রোগীর জন্য টিকিটের মূল্য ২০ টাকা, রোগ নির্ণয় শেষে নামমাত্র মূল্যে ওষুধ দেওয়া হয়। গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ভর্তি করে নেওয়া হয়। আছে জরুরি বিভাগও।

এড্রিক বেকার

বেকারের মন কাঁদত

একাত্তর সালে বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানিদের অত্যাচারের নানা ছবি দেখে বেকারের মন কাঁদত। বেকার বাংলাদেশে আসার সংকল্প করেন। তখন তিনি ভিয়েতনামে ছিলেন একটি চিকিৎসক দলের সদস্য হিসেবে। ডিসেম্বরে বিজয়ের খবরের শুনে তিনি খুশি হন। বেকারের জন্ম ১৯৪১ সালে নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটনে। তাঁর বাবা ছিলেন পরিসংখ্যানবিদ। মা শিক্ষক। চার ভাই, দুই বোনের মধ্যে দ্বিতীয় এড্রিক। ডানেডিন শহরের ওটাগো মেডিক্যাল কলেজ থেকে ১৯৬৫ সালে এমবিবিএস পাস করেন। পরে ওয়েলিংটনে ইন্টার্নি শেষে চলে যান যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনামে। বেকার ট্রপিক্যাল মেডিসিন, গাইনি ও শিশুস্বাস্থ্য বিষয়ে পড়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট হন। ১৯৭৬ সালে পাপুয়া নিউগিনি ও জাম্বিয়ায় যান; কিন্তু কোথাও মন টেকেনি। বাংলাদেশে এসে বেকার প্রথমে মেহেরপুর মিশন হাসপাতালে প্রায় দুই বছর কাটান। তারপর টাঙ্গাইলের মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতালে আট মাস কাজ করেন। বেকারের বড় কোনো হাসপাতালে কাজ করার ইচ্ছা কখনো ছিল না। ইচ্ছা ছিল প্রত্যন্ত গ্রামে কাজ করার। সে চিন্তা থেকেই চলে আসেন টাঙ্গাইলের মধুপুর গড় এলাকায়। জলছত্র খ্রিস্টান মিশনে এক বছর থেকে বাংলা ভাষা শিখেছেন। টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার উত্তরে এক পাহাড়ি এলাকায় কালিয়াকুড়ি গ্রাম। এখন সেখানেই চলছে বেকারের মাটির হাসপাতাল।

ছবি : লেখক



মন্তব্য