kalerkantho

আসমার ১০০

২৬ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



আসমার ১০০

জেদের বশেই বিশ্ব ভ্রমণ শুরু করেছিলেন কাজী আসমা আজমেরী। বাংলাদেশি পাসপোর্ট হাতে দেশ ভ্রমণে সেঞ্চুরি করেছেন তিনি।

আসমাকে অভিনন্দন জানিয়েছে কালের কণ্ঠ। প্রতিবেদন তৈরি করেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

 

২০০৭ সাল। সবে স্নাতক শেষ করেছেন আসমা। এত দিন দেশের নানা জায়গা ঘুরেছেন। এবার ভাবলেন সীমানা পার হবেন। থাইল্যান্ডের বিমানে চাপলেন ২৭ অক্টোবর। সেখানে ছিলেন টানা ৪২ দিন। থাইল্যান্ডে গিয়ে যেন চোখ খুলে গেল। দেখলেন, দুনিয়াটা অনেক বড়। অনেক কিছুই এখনো অদেখা রয়ে গেছে। ২০০৮ সালটা অবশ্য ভ্রমণ খরায় কেটেছে। সেবার একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কনসালট্যান্ট হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন আসমা।

 

দেখব এবার জগত্টাকে

আসমার পুরোদস্তুর পরিব্রাজক জীবনের শুরু ২০০৯ সালে। একটা ঘটনায় মনে ভীষণ জেদ চেপে গিয়েছিল। এক বন্ধুর মায়ের কথায় কষ্ট পেয়েছিলেন সেইবার। কথায় কথায় আসমা তাঁকে বলেছিলেন, ‘এবার আমি পৃথিবীর এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে ঘুরে বেড়াব।’ শুনে বন্ধুর মা ভ্রু কুঁচকালেন। বললেন, ‘ছেলেরাই তো পারে না, তুমি তো মেয়ে! এমন দস্যিপনা করলে শেষে কেউ বিয়ে করতে চাইবে না।’ চ্যালেঞ্জটা লুফে নিয়েছিলেন আসমা। বলেছিলেন, ‘আমি একা একা ৫০টি দেশ ঘুরে তবেই বসব বিয়ের পিঁড়িতে!’

 

বাদ সাধল পরিবার

আসমাকে একা একা ছাড়তে চাইলেন না বাবা। ভাবলেন টাকা না দিলে মেয়ের ইচ্ছা এমনিতেই দমে যাবে। তবে আসমা দমার পাত্র নন। নিজের গয়না বিক্রি করে তিন লাখ ৮০ হাজার টাকা পেলেন। এর সঙ্গে যোগ হলো চাকরির বেতন। ২০০৯ সালের মে মাসে বেরিয়ে পড়লেন বিশ্ব ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। চোখে-মুখে স্বপ্ন, মনে জেদ। শুরুতে গিয়েছিলেন নেপাল। সেখানে নানা দেশ থেকে ঘুরতে আসা তরুণীদের সঙ্গে পরিচিত হলেন। তাদের সঙ্গে আলাপে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলেন। আসমা বললেন, ‘ওদের লাইফটা অন্য রকম। ওরা একা একা ঘোরে। আমাদের দেশের মেয়েরা এসবের চেয়ে পোশাক-আশাক ও গয়নার প্রতি বেশি আকর্ষণ বোধ করে।’

 

পৃথিবীর পথে পথে

সেই যে বেরিয়েছেন, আসমা এখনো ছুটে চলেছেন বিপুল এই পৃথিবীর পথে পথে। তাঁকে হয়তো বছরের শুরুতে হাঁটতে দেখা যায় মঙ্গোলিয়ার তপ্ত মরুপথে, আবার বছরের শেষে দেখা গেছে বলিভিয়ার সালার দ্য উইনির লবণ সাগরে। কখনো জলে ভাসতে ভাসতে গেছেন ব্রাজিল কিংবা সাইপ্রাস। কখনো তাঁকে দেখা গেছে, মিসরের পিরামিডের সামনে কিংবা চীনের মহাপ্রাচীরে। সবচেয়ে দীর্ঘ ছিল ট্রান্সসাইবেরিয়ান ট্রেন ভ্রমণ। এ যাত্রায় তিনি চীনের পেইচিং থেকে মঙ্গোলিয়া, রাশিয়া হয়ে বেলারুশে পৌঁছাতে প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন। বললেন, ‘দারুণ রোমাঞ্চকর ছিল সে ভ্রমণ।’ এই বিশ্বপরিক্রমায় অম্লমধুর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন আসমা। বন্ধুবান্ধবও জুটেছে বেশ।

 

বাংলাদেশের পাসপোর্ট হাতে

নেপাল ছাড়াও ২০০৯ সালে আসমা পা রাখেন ভারত, ভুটান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ায়। পরের বছর ঘোরেন মিসর, মরক্কো, তুরস্ক, চীন, ফ্রান্স, ব্রুনেই, বেলজিয়ামসহ ১১টি দেশ। ২০১২ সালে নিউজিল্যান্ড, ফিজি, অস্ট্রেলিয়া, কিরিবাতিসহ ১৩টি দেশ ভ্রমণ করেন। সবচেয়ে বেশি দেশ ভ্রমণ করেছেন ২০১৬ সালে। সেইবার ঘুরে বেড়িয়েছেন মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের ১৯টি দেশ। ২০১৮ সালে গেছেন ফিলিপাইন, মঙ্গোলিয়া, কানাডা, বেলারুশ, জর্জিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তানসহ ১৭টি দেশ। সর্বশেষ গেল অক্টোবরে তুর্কমেনিস্তান গিয়ে দেশ ভ্রমণে সেঞ্চুরি করলেন। সব দেশেই তিনি ঘুরেছেন বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে। ২০১২ সাল থেকে আসমা নিউজিল্যান্ডে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা রেডক্রসে কাজ করেছেন। চেষ্টা করলে তখন হয়তো ইউরোপীয় পাসপোর্টও পেয়ে যেতেন। বললেন, ‘এতে হয়তো আমার একার উপকার হতো। অন্য বাংলাদেশিরা আগের মতো হয়রানির শিকার হতো। বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের দেখলে অনেক দেশের ইমিগ্রেশন অফিসাররা সন্দেহের চোখে তাকায়। সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করতে চেয়েছি। ফলে কখনো অন্য দেশের পাসপোর্টের জন্য আবেদন করিনি।’

 

ঘুরতে গিয়ে জেলও খেটেছেন

একা একা ঘুরতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ভালো-মন্দের মুখোমুখি হয়েছেন। ঠেকে শিখেছেন। সেই রকমই একবার তুরস্ক থেকে বোটে করে সাইপ্রাস যাচ্ছিলেন। রাতভর নৌপথে জার্নি শেষে সকালে সাইপ্রাসে পা রাখলেন; কিন্তু ইমিগ্রেশনের বৈতরণী পার হতে পারেননি। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত কয়েক দফা তাঁকে জিজ্ঞাবাদ করলেন ইমিগ্রেশন অফিসার। আসমার বিরুদ্ধে অভিযোগ—হোটেল বুকিং নেই, সঙ্গে পর্যাপ্ত ডলারও নেই। তত্ক্ষণাৎ জুবায়ের নামের এক বন্ধুর মাধ্যমে হোটেল বুকিংয়ের ব্যবস্থা করতে পেরেছিলেন। তবে আসমার কাছে নগদে মাত্র ৪০০ ডলার ছিল; কিন্তু ইমিগ্রেশন অফিসার বললেন, ‘৪০০ ডলার এনাফ নয়। বাংলাদেশিরা সাইপ্রাস হয়ে অবৈধভাবে গ্রিসে চলে যায়। আপনিও যে যাবেন না তার নিশ্চয়তা কী?’ একপর্যায়ে যাবতীয় ডকুমেন্ট সংযুক্ত করে ইংরেজিতে একটা চিঠি লিখে ইমিগ্রেশন অফিসারের হাতে দিলেন আসমা; কিন্তু অফিসার সেটি ছিঁড়ে ঝুড়িতে ফেলে দেন। আসমা অনুরোধ করলেন—‘অন্তত একবার পড়ে দেখুন।’ কোনো কথা না শুনেই আসমাকে হাজতে পুরল পুলিশ। হাজতে আরো বেশ কয়েকজন বাঙালি ও ভারতীয়র সঙ্গে দেখা হয়েছিল আসমার। বুঝলেন, অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিতে চাওয়া এ রকম মানুষগুলোর জন্যই জেল খাটতে হচ্ছে তাঁকে। ২৭ ঘণ্টা হাজতবাস শেষে আসমাকে আবার ফিরতি বোটে তুরস্কে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এটাই প্রথম নয়। ২০১০ সালে ভিয়েতনামে একবার এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। ফিরতি টিকিট না থাকার কারণে তাঁকে আটক করল হো চি মিন সিটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পুলিশ। আসমা ভেবেছিলেন ভিয়েতনাম ঘুরে সেখান থেকে সড়কপথে কম্বোডিয়া যাবেন। তাই ফিরতি টিকিট কাটেননি; কিন্তু পুলিশ আসমার কথা বুঝতেই চাইল না। উল্টো হাজতে পুরল। সেইবার ২৩ ঘণ্টা জেল খাটার পর মুক্তি মিলেছে। ২০১৩ সালের ঘটনা। জেলে যেতে না হলেও হয়রানির শিকার হয়েছিলেন আমেরিকায়। ইমিগ্রেশন পুলিশ সাড়ে চার ঘণ্টা আটকে রেখেছিল তাঁকে। মোট আটবার আসমার লাগেজ চেক করেছিল তারা।

 

মধুর স্মৃতিও আছে

২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসের কথা। চেচনিয়া থেকে রাশিয়ার পায়াটিগোরস্ক (চুধঃরমড়ত্ংশ) শহরে যাবেন। এক ভদ্রলোককে আসমা বললেন, ‘মাশুক্কা (বাসস্ট্যান্ড) যাব। প্লিজ হেল্প?’ ভাষাগত দূরত্বের কারণে আসমার কথা বুঝতে না পেরে লোকটি উবার কল করল। আসমার কাছে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় উবারে যেতে চাইছিলেন না। ভদ্রলোক বললেন, ‘অসুবিধা নেই। ওঠেন।’ ট্যাক্সিতে করে লোকটি আসমাকে বাস কাউন্টারে নিয়ে গেলেন। বাসের টিকিটও কেটে দিলেন। আসমার হাতে টিকিট দিয়ে বললেন, ‘উঠুন। ১০ মিনিটের মধ্যে বাস ছেড়ে যাবে।’

আসমা ভদ্রলোককে টিকিটের টাকা সাধলেন; কিন্তু তিনি বিনয়ের সঙ্গে ফিরিয়ে দিলেন। বললেন, ‘আপনি আমার গেস্ট। আপনার কাছ থেকে টাকা নিই কি করে?’ আসমা বললেন, ‘বিদেশবিভুঁইয়ে কোথাও এমন মানুষের দেখা পাব ভাবিনি।’ আরেকবার যুক্তরাষ্ট্রের লাসভেগাস থেকে ব্রাজিল যাচ্ছিলেন। পথে মেক্সিকোতে এরিস নামে এক চীনা তরুণীর সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। এরিসের ব্যবহারে মুগ্ধ আসমা বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে প্রায় আড়াই মাস ছিলাম। এরিসের সঙ্গে হন্ডুরাস, গুয়াতেমালা, নিকারাগুয়া, এল সালভাদরে ঘুরেছি।’

 

হাফ সেঞ্চুরি ব্রাজিলে

ব্রাজিল ফুটবল দলের ভক্ত আসমা। নিজের ৫০তম ভ্রমণের দেশ হিসেবে তাই বেছে নিলেন ব্রাজিলকেই। তখন বিশ্বকাপ চলছিল। আমাজানের পাশ দিয়ে জলপথে তিন দিন বোটে করে মানাউস শহরে পৌঁছেছিলেন সেইবার। সেই স্মৃতি এখনো মনে আছে। বললেন, ‘প্রায় আড়াই শর মতো লোক। এর মধ্যে আমিসহ বিদেশি মেয়ে মাত্র দুজন। বোটে শোবার জন্য কেবিন ছিল না। সবাইকে হ্যামাকে ঘুমাতে হতো। প্রথমে ভীষণ চিন্তায় ছিলাম। তবে বোটের ওপর দোলনায় দুলতে দুলতে সূর্যাস্ত দেখার অনুভূতি ছিল অসাধারণ। ব্রাজিলে আমরা একেকজন একেক হোটেলে থাকতাম; কিন্তু ডিনারের সময় সবার সঙ্গে দেখা হয়ে যেত। দারুণ কেটেছিল সময়টা।’ সেইবার বেলজিয়াম-আলজেরিয়ার ম্যাচ দেখেছিলেন স্টেডিয়ামে বসে।

 

এবার সেঞ্চুরি

২০০৭ সালের অক্টোবরে পর্যটক জীবন শুরু। কাকতালীয়ভাবে সেই অক্টোবরেই শততম দেশ ভ্রমণের গৌরব অর্জন করলেন। দিনটি ছিল ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর। তুর্কমেনিস্তানের অ্যাম্বাসাডরের আমন্ত্রণে আশখাবাদে গিয়েছিলেন আসমা। বললেন, ‘শততম দেশ ভ্রমণ হিসেবে বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় রাশিয়া যেতে চেয়েছিলাম; কিন্তু ভিসা জটিলতায় তা আর হয়ে ওঠেনি। তুর্কমেনিস্তান ভ্রমণ সে কষ্ট ভুলিয়ে দিয়েছে।’

 

যা দেখি, যা খুঁজি

‘আমি মিউজিয়াম দেখতে খুব পছন্দ করি। যেকোনো দেশে গেলে সেখানকার স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মেশার চেষ্টা করি। জানতে চাই, সেখানকার মানুষ কী পরে, কী খায়। প্রথম দিকে খাবার নিয়ে একটু সমস্যা হতো। এখন কুমিরের মাংস থেকে শুরু করে সব ধরনের খাবার খেতে অভ্যস্ত আমি। যেখানেই যাই না কেন, তিনটি বাক্য শেখার চেষ্টা করি—কিভাবে তারা ‘থ্যাংক ইউ’ বলে, কিভাবে বলে ‘সরি’ আর কোন জিনিসের দাম কিভাবে জিজ্ঞেস করে।’

আসমা এখনো সময় করে বেরিয়ে পড়েন নতুন কোনো দেশ দেখার উদ্দেশে। জানালেন, ভ্রমণ ক্ষুধাটা মেটেনি। এখনো আফ্রিকার অনেক দেশ দেখা বাকি। আগামী মাসে তাই উড়াল দেবেন আফ্রিকার উদ্দেশে।

 

একজন কাজী আসমা আজমেরী

আসমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা খুলনায়। বাবা কাজী গোলাম কিবরিয়া ও মা কাজী সাহিদা আহমেদ। দুই ভাই-বোনের মধ্যে আসমা বড়। ইকবালনগর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও খুলনা মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কেটিংয়ে স্নাতক। একই বিষয়ে এমবিএ করেন ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। একটি বেসরকারি কম্পানিতে কনসালট্যান্সির মাধ্যমে ক্যারিয়ার শুরু। রিয়াল স্টেট কম্পানিতেও চাকরি করেছেন। দীর্ঘদিন কাজ করেছেন আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা রেড ক্রসে। দেশ ভ্রমণের সময় রেড ক্রস ও রোটারি ইন্টারন্যাশনালের হয়ে বিভিন্ন সমাজসচেতনতামূলক কাজে অংশ নিচ্ছেন। ভবিষ্যতে একটা ট্রাভেল এজেন্সি খোলার পরিকল্পনা আছে তাঁর।

তাইওয়ানে

এই পাসপোর্ট হাতেই দেশে দেশে ঘুরেছেন। ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

চীনে

মাচুপিচু, পেরু

 

পৃথিবীর পথে পথে আসমা

 

অস্ট্রেলিয়ায়

বলিভিয়ায়

জর্জিয়ায়

ব্রাজিলে

মঙ্গোলিয়ায়

 

 



মন্তব্য