kalerkantho


শখের তোলা

ইকবাল মজিদের চিঠির বাক্স

একসময় শখের বশে ডাকটিকিট সংগ্রহ করতেন। এখন সংগ্রহ করেন পোস্টবক্স রেপ্লিকা। পিন্টু রঞ্জন অর্ক দেখে এসেছেন

১৯ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



ইকবাল মজিদের চিঠির বাক্স

ইকবাল মজিদের বাবার ডাকটিকিট সংগ্রহের নেশা ছিল। ছোটবেলায় বাবার কাছ থেকেই অনেক ডাকটিকিট পেয়েছিলেন। একসময় তাঁরও সংগ্রহের নেশা চাপে। সেটা ১৯৬৮ সালের কথা। তখন তো চিঠির স্বর্ণযুগ। অনেক ডাকটিকিট পেতেন; কিন্তু ই-মেইল, ফেসবুকের এই সময়ে চিঠির ব্যবহার দ্রুতই কমেছে। একসময় খেয়াল করলেন, চিঠি কমে যাওয়ায় রাস্তার ধারে থাকা ডাকবাক্সগুলোরও কদর কমেছে। হঠাৎ মনে উঁকি দিল, একসময় বুঝি ডাকবাক্সও হারিয়ে যাবে। তাই ভাবলেন ডাকবাক্স সংগ্রহ করে রাখবেন; কিন্তু এই শখ মেটাতে গিয়ে সমস্যায় পড়লেন, কারণ এগুলো সরকারি সম্পত্তি, আর জানেনও না কোথা থেকে কিনবেন। আবার ডাকবাক্সগুলোর আকার এত বড় যে রাখার জায়গারও সমস্যা। শেষে ভাবলেন রেপ্লিকা সংগ্রহে তো বাধা নেই।

 

তিন বছর আগের এক দিন

গুলিস্তানের জিপিওতে ডাকঘরের নানা সামগ্রী নিয়ে একটা প্রদর্শনী হয়েছিল। সেখান থেকে বাংলাদেশের ডাকবাক্সের একটা রেপ্লিকা কেনেন মজিদ। সেই শুরু। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ, ব্রিটেন, থাইল্যান্ড, হংকংসহ আরো কিছু দেশের ৪৫টির মতো ডাকবাক্সের রেপ্লিকা আছে তাঁর সংগ্রহে। এর মধ্যে থাইল্যান্ডের বেশি। এগুলোর কিছু নিজের কেনা। বাকিগুলো বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া। প্রথম প্রথম বন্ধুদের বলে দিতেন—বই, চকোলেট কিংবা দামি কোনো উপহারসামগ্রী নয়, আমার জন্য ডাকবাক্সের রেপ্লিকা এনো।

শুধুই লাল, কালো কিংবা নীলের মতো একরঙা যেমন আছে, তেমনি লাল-সাদা, লাল-কালো কিংবা লাল-হলুদ-সাদাসহ কয়েক রঙের মিশেলের ডাকবাক্সও আছে। ইকবাল মজিদ বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ডাকবাক্সের কমন কালার লাল। এটার একটা কারণ হতে পারে, লাল রং সহজে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আগে আমাদের দেশে লাল, নীল ও হলুদ—এই তিনটি রঙের ডাকবাক্স ছিল। এখন অবশ্য লাল রঙেরগুলোই দেখতে পাওয়া যায়।’

 

শুধু টিনের নয়

মজিদের কাছে টিনের তৈরি ডাকবাক্সের পাশাপাশি আছে সিরামিক ও পিতলের তৈরি বাক্সও। কালো রঙের একটা রেপ্লিকা যেমন লোহার তৈরি। সবচেয়ে ছোটটা উচ্চতায় চার ইঞ্চির বেশি হবে না। ইংল্যান্ড থেকে আনা এই রেপ্লিকাটি দেখতে অনেকটা জর্দার কৌটার মতো। সবচেয়ে বড়টা উচ্চতায় ১৫ ইঞ্চি আর প্রস্থে ছয় ইঞ্চি। থাইল্যান্ড থেকে আনা এই ডাকবাক্সটির গঠন আমাদের দেশের ডাকবাক্সের মতোই। কোনোটার গায়ে কিছু লেখা আছে, কোনোটা আবার একেবারেই লেখাবিহীন। পিতলের তৈরি সোনালি রঙের একটা ডাকবাক্সের রেপ্লিকা ভারত থেকে আনা। এতে কিছুই লেখা নেই।

অনেক ডাকবাক্সের গায়ে কখন সেটা খোলা হবে, কর্মদিবস এবং ছুটির দিনের উল্লেখ থাকে। ইংল্যান্ড থেকে আনা লাল রঙের ডাকবাক্সে চিঠি ফেলার জায়গার ঠিক ওপরেই ইংরেজি হরফে লেখা ‘ইটু আর রয়েল মেইল’। এর নিচেই সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপর কালো কালিতে লেখা কালেকশান টাইমস—মর্নিং ৯:০০ এএম, ১০:০০ এএম, ১১:০০ এএম, ১২:০০ এএম, আফটারনুন—১৩:০০ পিএম, ১৪:০০ পিএম, ৬:৩০ পিএম। এই বাক্সটির নিচের অংশ কালো রঙের। সেখানে লেখা ‘পোস্ট অফিস লন্ডন’। এর সঙ্গে কিছুটা মিল দেখা গেল থাইল্যান্ডের একটা ডাকবাক্সের। এর একেবারে ওপরের অংশে সেখানকার ঐতিহ্যবাহী মন্দিরের নকশা ব্যবহার করা হয়েছে। বাক্সটির গায়েও নানা নকশা। তার নিচের অংশে সাদা কালিতে প্রথমে থাই এবং পরে ইংরেজি হরফে লেখা—থাইল্যান্ড পোস্ট, কালেকশান টাইমস ১১ :০০ এএম, ১৫:০০ পিএম। এরপর লেখা ‘ওয়ার্কিং ডেইজ, হলিডে’। থাইল্যান্ডের আরেকটি ডাকবাক্স আছে। দূর থেকে দেখায় ল্যাম্পপোস্টের মতো। কালো রঙের একটা স্ট্যান্ডের ওপর বাক্সটা রাখা ছিল। আমাদের দেশের বাক্সগুলোর গায়েও সাদা কালিতে খোলার সময় লেখা থাকে।

শুধু ডাকবাক্স নয়, এর সঙ্গে সম্পর্কিত নানা ধরনের জিনিসের রেপ্লিকাও সংগ্রহ করছেন ইকবাল মজিদ। এসবের মধ্যে আছে টেলিফোন বুথ, ডাকম্যান (ডাকপিয়ন), ডাকগাড়ি। ‘রয়েল মেইল ভ্যান লেখা’ ইংল্যান্ডের দুটি গাড়িও আছে। ইংল্যান্ডের ডাকবাক্সের নকশায় বানানো চায়ের বাক্সও রয়েছে কয়েকটি।

ইকবাল মজিদ বললেন, স্মার্টফোনের এই সময়ে ডাকবাক্সের কদর আর আগের মতো নেই। রাস্তার ধারে থাকা এই ডাকবাক্সগুলো আগে নিয়মিতই খোলা হতো। এখন সপ্তাহে একবার খোলা হয় কি না সন্দেহ। নতুন প্রজন্মকে আমি ডাকবাক্সের বিবর্তন দেখাতে চাই। আরো কিছু সংগ্রহ হলে এগুলো নিয়ে একটা প্রদর্শনী করারও চিন্তা আছে।

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ



মন্তব্য