kalerkantho


তিনি হবিগঞ্জের মামুন

ইংল্যান্ডের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাঁর কাজের প্রশংসা করেছেন। রানির জন্মদিনের স্মারকগ্রন্থে তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে, এ লেভেল অব কোয়ালিটি। তিনি হবিগঞ্জের মামুন চৌধুরী। ঐতিহ্যবাহী ডাফেল কোট নতুনরূপে বাজারে এনে ইংল্যান্ড তো বটেই বিশ্বও মাতিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে দেখা করে এসেছেন জুয়েল রাজ

১৯ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



তিনি হবিগঞ্জের মামুন

১৯৯৩ সাল। মামুন চৌধুরী সদ্য তরুণ। লন্ডনের মার্কেটগুলোয় ঘুরে ঘুরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক বিক্রি করতেন। এক দিন একটি ব্যাগে কিছু শার্ট পুরে গেলেন মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সারের (বিশ্বখ্যাত চেইনশপ) অফিসে। সিকিউরিটি গার্ডকে বললেন, ‘ভেতরে যাওয়া যাবে? কিছু ভালো শার্ট নিয়ে এসেছি।’ গার্ড হেসে ফেললেন। বললেন, ‘এভাবে তো হবে না। আপনি এই ফোন নম্বর নিয়ে যান। কথা বলে আসুন।’

বাসায় ফিরে মামুন ওই নম্বরে ফোন করেছিলেন। ও প্রান্ত থেকে বলা হয়েছিল—পরে যোগাযোগ করা হবে। কিছুদিন পর মামুনের ঠিকানায় কিছু বই ও কাগজপত্র এলো। একটিতে ছিল মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সারের প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল মার্কসের জীবনী। সেটি পড়ে মামুনের মনে হয়েছিল, পূর্ব ইউরোপ থেকে খালি হাতে এসেছিলেন মার্কস। ছিলেন শরণার্থী। সেই মানুষ যদি এত বড় ব্যবসা গড়ে তুলতে পারেন, তবে আমি কেন নয়?

পরের বছরই মামুন নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুললেন। নাম ‘লন্ডন ক্লথিং লিমিটেড’। দেশ থেকে গার্মেন্টসামগ্রী নিয়ে গিয়ে ইংল্যান্ড ও ইউরোপের মার্কেটগুলোতে সাপ্লাই দিতেন। সেই সঙ্গে একটি ম্যানুফ্যাকচারিং (প্রস্তুতকারক) ইউনিটও স্থাপন করলেন। যেখানে জ্যাকেট কিংবা কোটের মতো পোশাক তৈরি হতো। এখানে তৈরি করতে থাকলেন জ্যাকেট ও কোট। শুরুতে তিনি স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য পোশাক বানাতেন। পরে একসময় উচ্চ মূল্যের পোশাক তৈরি করতে থাকেন। দুই বছরের মধ্যে ব্যবসা বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিল। তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিলেন। তাঁরা নতুন নতুন নকশায় পোশাক তৈরি করতে থাকলেন। তবে ব্যাপারটি সহজ ছিল না। বলছিলেন মামুন, ‘যতবার সফল হয়েছি, তার চেয়ে কমবার ব্যর্থ হইনি। তবে কোনোবারই হতাশ হইনি; বরং ব্যর্থতাকে গুরু মেনেছি। শিখেছি সেখান থেকে।’

 

মামুন ও তাঁর ডাফেল কোট

লন্ডন ট্রাডিশন ডাফেল কোট

ফ্যাশন জগতে এখন পরিচিত নাম লন্ডন ট্রাডিশন। মামুন বলছিলেন, ‘ব্যাবসায়িক সূত্রে বন্ধু রব হিউসনের সঙ্গে আমার বহুদিনের চেনা-জানা। ২০০২ সালে আমরা শুরু করি লন্ডন ট্র্যাডিশন।’

নতুন কিছু বাজারে আনার কথা ভাবছিলেন মামুন। তরুণরা ছিল টার্গেট। ডাফেল কোটের চল তখনো ছিল। তবে নকশায় বৈচিত্র্য আনতে চেয়েছিলেন মামুন। উল্লেখ্য,  ১৮৯০ সাল থেকে এটি ছিল ব্রিটিশ নৌবাহিনীর পোশাক। ডাফেল আসলে বেলজিয়ামের একটি শহর। তবে ১৮৫০ সাল নাগাদ কোটটি পুরো ইউরোপেই জনপ্রিয় ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ডাফেল কোট ইংল্যান্ডের ছাত্ররা অনেক পরত। যাহোক মামুন সাফল্য পেতে মরিয়া ছিলেন। তিনি নতুন নকশায় কোটটি বাজারে আনলেন। ২০০৪ সালে নতুন নকশার কিছু ডাফেল কোট জাপানেও পাঠান। কারণ জাপানের লোক ডাফেল কোটকেও ব্রিটেনের স্মারক ভাবে। জাপান থেকে তিনি আশাব্যঞ্জক সাড়া পেলেন। তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করতাম, লন্ডন ট্র্যাডিশন একদিন একটি গ্লোবাল ব্র্যান্ড হবে। আজ তা-ই হয়েছে। আমরা এখন ওভারকোট, রেইনকোটসহ আরো কিছু গার্মেন্টসামগ্রীতে স্পেশালিস্ট। আমরা এই যন্ত্রের যুগেও কাটিং-ফিনিশিং সব হাতে করি। এ জন্য দামও একটু বেশি ধরি। আমাদের ডাফেল কোট ২৫০ পাউন্ডের কমে পাবেন না। ১২৫০ পাউন্ড দামেরও কোট আছে লন্ডন ট্র্যাডিশনের। গুণগত মানে আমরা আপস করি না।’

 

প্রায় এক শ কর্মী কাজ করেন মামুনের কারখানায়

মামুনের লোকবল

এক শর বেশি অভিজ্ঞ কর্মী আছে মামুনের কারখানায়। সপ্তাহে গড়ে এক হাজার ডাফেল কোট তৈরি করেন। লন্ডন ট্র্যাডিশন বছরে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোট রপ্তানি করে। উল্লেখ্য, তাদের তৈরি কোটের ৯০ শতাংশই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। লন্ডনের সাবেক মেয়র কেন লিভিংস্টোন ও বরিস জনসন থেকে শুরু করে ব্রিটেনের সাবেক অর্থমন্ত্রী জর্জ অসবোর্নও প্রশংসা করেছেন মামুন চৌধুরীর এই ব্যাবসায়িক উদ্যোগের।

 

রানির প্রশংসা

ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের বয়স নব্বই হয়েছিল ২০১৬ সালে। সে উপলক্ষে বাকিংহাম প্যালেস একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করে। তাতে মামুন চৌধুরীকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। শিরোনাম ছিল ‘এ লেভেল অব কোয়ালিটি’। ডাফেল কোটকে সময়োপযোগী করার কারণে লন্ডন ট্র্যাডিশন কুইন্স অ্যাওয়ার্ডও জিতেছে ২০১৪ সালে। উল্লেখ্য, কুইন্স অ্যাওয়ার্ড ব্রিটেনের ব্যাবসায়িক ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সম্মানজনক পদক। রবকে নিয়ে বাকিংহাম প্যালেসে গিয়েছিলেন মামুন। সাড়ে চার মিনিট মামুনের সঙ্গে কথা বলেছিলেন রানি আর সম্মাননা স্মারকও তুলে দিয়েছিলেন হাতে। মামুন চৌধুরীর উৎপাদিত পোশাকের ৯০ শতাংশ বিদেশে রপ্তানি হয় শুনে খুব খুশি হয়েছিলেন রানি।

 

পূর্ব লন্ডনে লন্ডন ট্র্যাডিশনের কারখানা

সেই হাইস্ট্রিটে প্রথম শোরুম

১৯৮৫ সালের দিকে মামুন চৌধুরী ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় সৌদিতে পাড়ি জমান। জীবন সেখানে বড় কঠিন ছিল। ১৯৮৭ সালে নিজে ফুড ডিস্ট্রিবিউশন বিজনেস শুরু করেন। ইরাক যুদ্ধের আগ পর্যন্ত সব কিছুই ঠিকঠাক চলছিল; কিন্তু যুদ্ধ শুরু হলে সব হঠাৎই বদলে যায়। বন্ধুরা পরামর্শ দিল ব্রিটেন যাওয়ার। ব্রিটেনে এসে দেশের তৈরি পোশাক বিক্রি করতেন ঘুরে ঘুরে। একসময় যেখানে পোশাক ফেরি করে ফিরতেন সেই লন্ডনের হাইস্ট্রিটে এখন লন্ডন ট্র্যাডিশনের একটি আউটলেট হতে যাচ্ছে। লন্ডনের অভিজাত পাড়ায় বাঙালি মালিকানাধীন প্রথম শোরুম হবে সেটি। আগামী এপ্রিল থেকে চালু হওয়ার কথা রয়েছে।

 

মামুনের পরিবার

মামুন চৌধুরীরা চার ভাই, চার বোন। পিতা মরহুম হাবিবুর রহমান চৌধুরী ছিলেন ব্যবসায়ী। মা ঢাকায় ছোট ভাইয়ের সঙ্গে থাকেন। ব্যক্তিগত জীবনে মামুন তিন সন্তানের জনক। বড় ছেলে তাসিম ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিচ্ছে।



মন্তব্য