kalerkantho


রবি লিখেছিল ‘জয় আমাদের হবেই’

বাবাকে না বলে যুদ্ধে গিয়েছিল রবি। দেশ স্বাধীন হওয়ার মুখে শহীদ হয়েছিল। আগস্টে বাবাকে লেখা চিঠিতে বলেছিল, জয় আমাদের হবেই। চিঠিটি খুঁজে পেয়েছেন লুৎফর রহমান

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



রবি লিখেছিল ‘জয় আমাদের হবেই’

রবির রং লাল

পঞ্চগড় জেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের গ্র্রাম উত্তর প্রধানপাড়া। গ্রামটি পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নে। শহীদ হারুন অর রশিদ রবি এই গ্রামেই জন্মেছিলেন। বাড়ির কয়েক শ মিটার দূরেই ভারতের সীমান্ত। বাবার নাম করিম প্রধান। রবির জন্মদিন ১৯৫১ সালের ১১ জুলাই। ৯ ভাই-বোনের মধ্যে রবি ছিলেন চতুর্থ। তাঁর হারুন অর রশিদ নামটি রাখেন দাদা উমের উদ্দিন প্রধান। তবে দেখতে খুব সুন্দর হওয়ায় বোন জামাতা তোজাম্মেল হোসেন আদর করে ডাকতেন রবি। লেখাপড়ায় ভালো ছিল রবি। আবার প্রতিবাদীও ছিল। বাড়ির পাশের পাকিস্তানি সীমান্ত চৌকির সেনাদের আচার-আচরণ রবির ভালো লাগত না। একবার তো হাতাহাতি পর্যন্ত হয়েছিল। রবির ছোট ভাই মাহবুব আলম সেই দিনটির কথা ভোলেননি—দিনটি ছিল একুশে ফেব্রুয়ারি। ১৯৬৬ বা ১৯৬৭ সাল। হাড়িভাসা বাজারের কাছে একটি অস্থায়ী শহীদ মিনারে লোকেরা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছিল। শিক্ষার্থীরা ছিল সবার আগে। রবিও ছিল তাদের মধ্যে। সবাই যখন শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাচ্ছিল, তখন কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা বুট পরেই বেদির ওপর হাঁটছিল। রবি আর স্থির থাকতে পারেননি। বলেছিলেন, ‘আপনারা জুতা খুলে বেদিতে উঠুন।’ কিন্তু তারা হেসে গড়াগড়ি খেয়েছিল। একপর্যায়ে রবির সঙ্গে তাদের হাতাহাতি হয়। তারপর সব মানুষ একত্র হয়ে সেনাদের গণধোলাই দেয়। জনতা তাদের কয়েকজনের অস্ত্রও কেড়ে নেয়। রাতে অতিরিক্ত সৈন্য নিয়ে সে অস্ত্র উদ্ধার করে পাকিস্তানি সেনারা। তখন কিছুদিন পালিয়ে ছিলেন রবি। ১৯৭১ সালে রবি ছিলেন বিএ পরীক্ষার্থী। পরীক্ষা না দিয়েই পরিবারের সঙ্গে ভারতে আশ্রয় নেন। তারপর পরিবারের কাউকে না জানিয়েই বড় ভাই হামিদুর রহমানের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। প্রথমে দুই ভাই ভারতের জলপাইগুড়ি এলাকায় মুজিব ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেন। রবি ছিলেন গ্রুপ লিডার। প্রশিক্ষণ শেষে মে মাসের শেষ দিকে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর অধীনে হারুন ও তাঁর বড় ভাই হামিদুর রহমান যুদ্ধে অংশ নেন। তাঁরা ভারতের পশ্চিম দিনাজপুর এলাকার কোটগছ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ক্যাম্প গড়েন। কোটগছ থেকে খুব কাছেই ছিল বাংলাদেশের পঞ্চগড়। তাঁরা হিট অ্যান্ড রান পদ্ধতিতে যুদ্ধ করতেন পঞ্চগড়ের ফকিরগঞ্জ, ফকিরের হাট, আলোয়াখোয়া, ফুটকিবাড়ি, কিসমত, নয়নিবুরুজ এলাকায়। বড় ভাই হামিদুর রহমান ছিলেন কম্পানি কমান্ডার। রবির সহযোদ্ধা নুরুল ইসলাম জানান, হারুন এত সাহসী ছিলেন যে যুদ্ধে কোনো অপারেশনের কথা উঠলেই সবার আগে যেতে চাইতেন। হারুন সব সময় বলতেন, যেভাবেই হোক দেশকে স্বাধীন করতেই হবে।

পঞ্চগড়ে রবির নামে সড়ক

এরপর ভারতীয় মিত্র বাহিনীসহ মুক্তিবাহিনী পঞ্চগড় সুগার মিলের পাকিস্তানি ঘাঁটিতে হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। ২৮ নভেম্বর রাত। সুগার মিল ক্যাম্পে আক্রমণ করে মুক্তিবাহিনী। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে টিকে থাকতে না পেরে পাকিস্তানি সেনারা ঠাকুরগাঁওয়ের দিকে পালিয়ে যেতে থাকে। ২৯ নভেম্বর সকালে পাকিস্তানিদের আর সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না। মুক্তিযোদ্ধারা বেরিয়ে আসেন দলে দলে আর জয় বাংলা ধ্বনি দিতে শুরু করেন। রবি দেখলেন তখনো পাকিস্তানি পতাকা উড়ছিল সুগার মিল এলাকায়। দৌড়ে গিয়ে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশি পতাকা উড়িয়ে দিচ্ছিলেন রবি। এমন সময় গুলিবিদ্ধ পাকিস্তানি সেনার গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে যায় রবির বুক। রবির রক্তে লাল হয়ে যায় বাংলাদেশের পতাকা।

 

রবি মুক্তিযোদ্ধা

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতের পশ্চিম দিনাজপুর এলাকার কোটগছ থেকে ছোট ভাই মাহবুব আলম প্রধানের মাধ্যমে চিঠিটি প্রেরণ করেন রবি। চিঠির তারিখ ৮ আগস্ট ১৯৭১। চিঠিটি আজও তাঁর ভাতিজা (মাহবুব আলমের ছেলে) রায়হানুজ্জামান প্রধান জীবনের সংগ্রহে রয়েছে।

রবিকে ভারতের পশ্চিম দিনাজপুরের কোটগছ বিএসএফ ক্যাম্পের সামনে দাফন করা হয় (রবির মৃত্যুতে সহযোদ্ধাদের মাঝে শোকে ছায়া নেমে আসে। ভারতীয় বাহিনীর নেতৃত্বদানকারী মেজর শেরকি বলেছিলেন, হারুন আমার দলের সবচেয়ে সাহসী যোদ্ধা। তাঁর দাফন আমিই সম্পন্ন করব। পরে কোটগছ বিএসএফ ক্যাম্পের সামনে তাঁকে দাফন করা হয়। )। রবির বাবা ফজলুল করিম প্রধান দেশ ভাগের সময় পাকিস্তানপন্থী ছিলেন। পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করেছেন। অথচ মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের অত্যাচারে তিনি তাঁর পরিবার-পরিজন নিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। রবির বড় ভাই হামিদুর রহমান একাত্তরে চাকরিরত ছিলেন। পরে ভাইয়ের সঙ্গে রবি পরিবারের কাউকে না জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। রবিকে দাফন করানোর সময় বড় ভাই হামিদও উপস্থিত ছিলেন। পরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হন হারুন অর রশিদ রবি। তাঁর নামে পঞ্চগড় সুগার মিল সড়ক ও হাড়িভাসার ঢাঙ্গীপুকুর থেকে বাঙ্গালপাড়া সড়কের নামকরণ হয়। 

ছোট ভাই মাহবুব আলম প্রধান বলেন, ‘আমার বড় দুই ভাই আমাদের কাউকে না বলেই যুদ্ধে যান। আমি অনেক খোঁজ করে জানতে পারি, তাঁরা কোটগছে আছেন। পরে আমি সেখানে গিয়ে দুই ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করি। আসার সময় হারুন ভাই আমাকে বাবার জন্য একটা চিঠি লিখে দেন। কয়েক মাস পরই জানতে পারলাম ভাই শহীদ হয়েছেন। আগে কয়েকবার ভারতে গিয়ে কবর জিয়ারত করার সুযোগ হলেও এখন বেশি পারি না।’ আরেক ছোট ভাই হাবিবুর রহমান প্রধান বলেন, ‘আমার ভাইয়ের বীরত্বের ইতিহাস নতুন প্রজন্ম জানে না। আমরা চাই তাঁর একটি স্মৃতিচিহ্ন স্থাপন করা হোক। তাঁর বীরত্বের ইতিহাস লেখা হোক।’

হারুন অর রশিদের ভাতিজা রায়হানুজ্জামান প্রধান বলেন, ‘আমার চাচা দেশের জন্য যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছেন। তাই তাঁর শেষ চিঠিটি যত্ন করে রেখে দিয়েছি। আমরা চাই তাঁর বীরত্বের কথা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হোক।’ 

হারুন অর রশিদের সহযোদ্ধা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘হারুন অর রশিদ বাংলাদেশের পতাকা তুলতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন। আমি তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করেছি। অনেক সাহসী ছিলেন হারুন। ২৯ নভেম্বর পঞ্চগড়কে মুক্ত করতে গিয়ে আমরা হারুনসহ অনেককে হারিয়েছি। তাই এই দিনটি আমাদের কাছে কোনো দিন ভোলার নয়। আমাদের দাবি, তাঁকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রশাসন যেন স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে।’

পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন জানান, মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি শিশু শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে জেলার প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মুক্তিযোদ্ধা কর্নার স্থাপন করা হয়েছে। হারুন অর রশিদের নামে স্থানীয় দুটি সড়কের নামকরণ হয়েছে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

 

বাবার কাছে রবির চিঠি (হুবহু)

৮.৮.৭১

আব্বা,

আচ্ছালামো আলায়কুম। আশা করি বাড়ীর সকলে মঙ্গল মতে আছেন। আপনাদের দোয়ায় আমরা ভাল আছি। এত দিন ধরে খুব ব্যস্ত ছিলাম বলে চিঠি লিখতে পারিনি। অবশ্য এখন আমরা সৈনিক। তাই সৈনিকের ফুরসত কোন দিন হয় না। তবুও হাতে যতটুকু সময় মেলে তার ভিতর দিয়ে আপনাদের খোঁজ করব। আম্মা কিরূপ আছে। বুজান, দুলাভাই, ডলী বুজান কেমন আছে। আপনারা বর্তমানে কোথায় আছেন। চিন্তা করার কিছু নাই। সময় হলেই বাড়ীতে ফিরব। মরতে একদিন হবেই। মরার আগে যেন ১০/২০টা পশ্চিমা জানোয়ারকে খতম করতে পারি এই দোয়াই করবেন। আমাদের মত কত ভাই প্রাণ দিল এবং এখনও দিচ্ছে। আমরা বর্তমানে পচাগড়ের পিছনে আছি। বাড়ীর সবাইকে দোয়া করতে বলবেন। আমাদের এ লড়াই সত্যের, ন্যায়ের কাজেই জয় আমাদের হবেই। সেদিন বেশি দূরে নয়। দৈনিক ২/৪ জন পাক ফৌজ মরতে আছে। বিশেষ আর কি—

ভাইজিও অপর পৃষ্ঠায় লিখবে। খোদা হাফেজ।

ইতি

রবি

 

ছবি : লেখক



মন্তব্য