kalerkantho

খুঁজে ফেরা

দিয়াং

চট্টগ্রামের প্রাচীন জনপদ দিয়াং। দিয়াংয়ের গৌরবগাথা এখনো লোকমুখে ফেরে। ১৫১৮ সালে পর্তুগিজ বণিকরা চট্টগ্রামে আসেন। দিয়াংয়ে বসতি গড়েন ১৫৩৭ সালে। এক দিন দেখে এসেছেন মোহাম্মদ রেয়াজুল হক

১৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



দিয়াং

সদরঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত সাম্পানে কর্ণফুলীর পূর্বপাড়ে সকাল সাড়ে ৯টায় পৌঁছে যাই। সিএনজিচালক দিল মোহাম্মদ যাত্রীর অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁর বাড়ি দিয়াংয়ের কাছে বড় উঠান ইউনিয়নে। দেড় শ টাকায় দিয়াং যেতে রাজি হয়ে গেলেন দিল মোহাম্মদ। সড়কটি সরু। কোথাও কোথাও ইট বিছানো। কোরিয়ান ইপিজেডের সামনের সড়ক ধরে কিছু দূর যাওয়ার পর মরিয়ম আশ্রম। দুদিকেই ছোট ছোট পাহাড়। মেহগনি, আকাশমণি, কাজুবাদামসহ আরো গাছগাছালিতে ভরা পাহাড়গুলো। মরিয়ম আশ্রম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ১৯৪৬ সালে। অবহেলিত শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে ব্রাদার ফ্লেভিয়ান লাপ্লান্তে স্কুলটি গড়ে তোলেন। এখানে ছাত্রাবাস, সিস্টারদের আবাসগৃহ, কারিগরি বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রও আছে। স্কুলঘরের পশ্চিম দিকে একটি টিলার ওপর হেডমাস্টার ও শিক্ষকদের ডরমিটরি।

 

শাহামিরপুরে গেলাম

স্কুল গেটের সামনেই মোহাম্মদ সফিউল আলমকে পেলাম। তিনি শাহামিরপুরের লোক। মরিয়ম আশ্রম ও স্কুল দেখাশোনা করেন। শাহামিরপুর পুরনো খ্রিস্টানপাড়া। রাস্তার ধারে একটি মুদি দোকান। দোকানের পেছনে একতলা বাড়ি। বাড়িটি রিচার্ড ডি রোজার। তিনি ১৯৭৩ সালে মরিয়ম আশ্রম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছেন। এরপর ভর্তি হয়েছিলেন চট্টগ্রাম শহরের ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে। পড়াশোনা শেষ করে কিছুদিন চাকরি করেছিলেন। তারপর চলে গিয়েছিলেন দুবাইয়ে। পরে দেশে ফিরে এই মুদি দোকান দিয়েছেন। নিয়ে গিয়ে বসালেন ড্রইংরুমে। দেয়ালে যিশুখ্রিস্ট, ব্রাদার ফ্লেভিয়ান ও পরিবারের সদস্যদের ছবি ঝুলানো। রিচার্ডের বাবার ফুফুর একটি ছবিও আছে এগুলোর মধ্যে। তাঁর জন্ম ১৮৮৪ সালে। দীর্ঘদিন কলকাতায় ছিলেন। ১৯৬২ সালে মৃত্যুবরণ করেন। রিচার্ড জানালেন, শাহামিরপুর ও দৌলতপুরে ৮৮টি খ্রিস্টান ঘর আছে। লোকসংখ্যা হবে প্রায় ৩০০। শাহামিরপুরের খ্রিস্টানরা পর্তুগিজদের বংশধর। রিচার্ডের বাড়ির গেটে পাথরের নামফলকে লেখা আছে—সাহেব ভিলা, ঐতিহাসিক পর্তুগিজ (ফিরিঙ্গি) খ্রিস্টান বাড়ি। রিচার্ডের পিতা ওয়াল্টার ডি রোজাকে লোকে সাহেব বলেই ডাকত। রিচার্ড তাঁর দাদার বাবার নামও বলতে পারলেন—অ্যালেক্স ডি রোজা। রিচার্ডের বাড়ির পূর্ব দিকে পাহাড়ের খাঁজে বড় একটি মাঠ। মাঠের পাশের পাহাড়ের ওপর খ্রিস্টানদের পুরনো কবরস্থান। দেয়ালঘেরা। এটি পর্তুগিজদের আমলের। নতুন কবরস্থানটি গির্জার পাশে। ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত। ব্রাদার ফ্লেভিয়ানকে এখানে সমাহিত করা হয়েছে। রিচার্ডের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আশ্রমে গেলাম।  

দিয়াংয়ের রানি মা মারিয়া

রাস্তার দক্ষিণ ধারে মরিয়ম আশ্রম আর মা মারিয়ার গ্রোটো (কৃত্রিমভাবে নির্মিত গুহা)। সরু ইট বিছানো পথ। একটি বেশ বড় ক্রুশ মাটিতে পোঁতা। ছোট লোহার গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকতে হয়। মাঝখানে বড় একটি মাঠ রেখে তিন দিকেই পাহাড়। মাঠের বাঁ দিকে আশ্রম। আশ্রমটি তৈরি হয় ১৬০০ সালে। সবুজ টিনের ছাউনি দেওয়া কয়েকটি ঘর দেখলাম। এগুলো প্রার্থনাগৃহ। মা মারিয়ার গ্রোটোটি পাহাড়ের ওপর। কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। কংক্রিট ঢালাই দিয়ে তৈরি গ্রোটোর ভেতরে প্রার্থনারত মা মারিয়ার মূর্তি। তাঁর গলায় জপমালা। দুই পাশে দানবাক্সও আছে। ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতি ও শুক্রবার এখানে তীর্থ দর্শনে আসে সারা দেশের মানুষ। আশ্রম প্রাঙ্গণ তখন লোকারণ্য।

 

পেছন ফিরে দেখা

আরাকান রাজাদের রাজধানী ছিল দিয়াং। কবি আলাওল সতীময়না কাব্যে দিয়াংয়ের কথা বলেছেন এভাবে—

কর্ণফুলী নদী পূর্বে আছে এক পুরী।

রোসাঙ্গ নগর নাম স্বর্গাবতারি।

আরাকানিদের চাটিগাঁ দুর্গ আর দিয়াং কারাগার ছিল এখানে। কবি আলাওল এই কারাগারে বন্দিও ছিলেন। অনেক গবেষকের মতে, চট্টগ্রামের প্রাচীন পণ্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয় এই দিয়াং পাহাড়েই ছিল। দিয়াং একসময় ত্রিপুরা রাজাদের অধীনেও ছিল। ইতিহাস বলে, সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ সামরিক সাহায্যের বিনিময়ে ১৫৩৭ সালে পর্তুগিজ বণিকদের কুঠি ও গির্জা নির্মাণের অনুমতি দেন।

মোগল আমলে আরাকানি সৈন্যরা ফিরিঙ্গি বন্দর ও ফিরিঙ্গি পল্লীর কাছে তিনটি ঘর তৈরি করে। মোগল সেনারা আরাকানিদের পরাজিত করে  দিয়াংয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। বলা হয়, পণ্ডিত বিহারটিও তখনই ধ্বংস হয়। মোগলদের ইতিহাসবিদ শিহাব উদ্দিন তালিশ তাঁর ফাতিয়া-ই-ইব্রিয়ায় আরাকানিদের চাটিগাঁ দুর্গ, মগঘাট, মগবাজার ও সেনাছাউনির বিশদ বিবরণ লিখে গেছেন। সম্রাট আকবরের মন্ত্রী আবুল ফজল আইন-ই-আকবরীতে লিখেছেন, চট্টগ্রাম সমুদ্র তীরবর্তী এবং পর্বত মধ্যস্থিত একটি বৃহৎ বন্দর। এটা খ্রিস্টান ও অন্য বৈদেশিক বণিকদের একটি প্রধান বাণিজ্য স্থান। এই বন্দর মগরাজাদের অধিকারভুক্ত।



মন্তব্য