kalerkantho


লোক নায়ক

শেষ বিদায়ের বন্ধু

১০ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



শেষ বিদায়ের বন্ধু

বেওয়ারিশ লাশের হিসাব লিখছেন জাফর উদ্দিন কচি

বেওয়ারিশ লাশ খুঁজে ফেরেন জাফর উদ্দিন। ২৮ বছর ধরে কাজটি করে চলেছেন। এ পর্যন্ত দেড় হাজার বেওয়ারিশ লাশের দাফন করেছেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন ফখরে আলম

 

একই দিন যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে তিন ভাইয়ের ফাঁসি হয়ে গেল; কিন্তু পরিবারের কোনো সদস্যই লাশ নিতে এলো না। কারাগারেই পড়ে থাকল লাশ। খবর পেয়ে ছুটে গেলেন জাফর উদ্দিন। একটি ভ্যানে তিনটি লাশ তুলে নিয়ে গেলেন যশোর শহরের ঘোপ কবরস্থানে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিন ভাইয়ের ফাঁসির খবর রাষ্ট্র হয়ে যাওয়ায় শত শত উত্সুক জনতা ফাঁসির আসামির লাশ দেখার জন্য ভিড় জমালো; কিন্তু লাশের সৎকারের বিষয়টি না ভেবে লাশ দেখতেই ব্যস্ত ছিল সবাই। এভাবেই দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা; নেমে এলো রাত। জাফর উদ্দিন রাতের অন্ধকারে দুজন কবর খননকারীর সহায়তায় লাশ তিনটির সৎকার করলেন। জাফর উদ্দিনের এমন গল্পের শেষ নেই। তিনি দীর্ঘ ২৮ বছর এভাবেই বেওয়ারিশ লাশ খুঁজে ফিরছেন। এ পর্যন্ত এক হাজার ৫০০টি লাশ দাফন করেছেন। এখন তাঁর বয়স ৭৮ বছর। জীবন সায়াহে এসেও লাঠি ভর দিয়ে হেঁটে হেঁটে জাফর উদ্দিন শুধু লাশ খোঁজেন।

 

যেভাবে শুরু

১৯৯০ সাল। যশোরের ব্যবসায়ী মীর শাহাদাতুর রহমান  এক হাজার টাকা ও ১০০ গজ কাপড় দিলেন জাফর উদ্দিনকে। বললেন, ‘তুমি আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম প্রতিষ্ঠা করো।’ কচি তা নিয়ে যশোরে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের শাখা খোলেন। এর পর থেকেই রাত-দিন হাসপাতাল কিংবা থানায় ঘুরে ঘুরে বেওয়ারিশ লাশের সন্ধান করেছেন। সৎকার করেছেন।

জাফর উদ্দিনের অনুরোধে তাঁর ছাত্র বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. এস এম আশিকুজ্জামান আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের যশোর শাখার জন্য জায়গা কিনে ভবন নির্মাণ করে দেন। এখন রেল রোডের সেই ভবন থেকেই আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কর্মকাণ্ড চলছে। জাফরের তিন ছেলে, এক মেয়ে। সবাই উচ্চ শিক্ষিত। উচ্চপদে কর্মরত। বললেন, ‘আমি মানুষকে কাছ থেকে দেখেছি। তাদের সুখ-দুঃখে সাথি হওয়ার চেষ্টা করেছি। সামর্থ্য অনুযায়ী অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। এই শিক্ষা সন্তানদেরও দিয়েছি।’

 

স্মৃতির ঝাঁপি খুলে দিলেন

বেওয়ারিশ লাশ খুঁজতে গিয়ে বহু ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন। স্মৃতি হাতড়ে কয়েকটির কথা বললেন। মণিরামপুরের এক কিশোর মাদরাসায় পড়ত। তার বাবা ভ্যানচালক। ছেলেটি মাদরাসা থেকে ছুটিতে বাড়ি এলে সে-ও ভ্যান চালাত। দুর্বৃত্তরা ছেলেটিকে নৃশংসভাবে হত্যা করে যশোর সদরের মাহিদিয়া এলাকায় ফেলে রেখে ভ্যানটি নিয়ে যায়। বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে ওই কিশোরকে কোলে করে এনে কবরে শুইয়ে দিই। দুই দিন পরে অবশ্য ছেলেটির বাবা-চাচা এবং এলাকার আরো লোক এসে শোকে মাতম করেছিল। সে দৃশ্য ভোলার নয়।

বাগেরহাটের গৌরম্ভ কলেজের নামকরা শিক্ষক ছিলেন জাফর সাহেব। এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের ভয়ে তিনি খুলনায় পালিয়ে যান। সেখানে তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হলে তিনি ঢাকায় পালিয়ে যান। খুনিরা ঢাকা থেকে জাফর সাহেবকে অপহরণ করে এনে যশোরের সাতমাইলে হত্যা করে। বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে আমি তাঁকে দাফন করি। এ জন্য পরবর্তী সময় জাফর সাহেবের পরিবারের সদস্যরা এসে আমার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। যশোরে বেড়াতে এসে মারা যান ঢাকার মিরপুরের এক ধনাঢ্য ব্যক্তি। বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে তাঁকে দাফন করি। কিছুদিন পর তাঁর ছেলেরা যশোরে বাবার সন্ধানে আসে। পরে ফের কবর থেকে সেই লাশ তুলে ছেলেদের কাছে বুঝিয়ে দিই। এ ছাড়া লাশ নিয়ে আমার অসংখ্য স্মৃতি রয়েছে।

 

রেকর্ড করেছেন

১৯০৫ সালে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম ঢাকায় প্রতিষ্ঠার পর পরই বেওয়ারিশ লাশ দাফনের কাজ শুরু করে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে সেবামূলক এই প্রতিষ্ঠানের ৪৮টি শাখা রয়েছে। শাখাগুলোর প্রধান লায়ন আজিম বক্স জানান, যশোরে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সেবামূলক কাজ জাফর উদ্দিনই প্রথম শুরু করেন।

 

জাফর উদ্দিনের আরেক ইতিহাস

যশোর শহরের ডাল মিল এলাকায় বাড়ি। বাবা শেখ জামাল উদ্দিন রেল বিভাগের কর্মচারী ছিলেন। আট ভাই-বোনের সংসার। অভাবের কারণে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। ১২ বছর বয়সে তিনি জিলা স্কুলের গেটে বাদাম বিক্রি শুরু করেন। সিনেমার পোস্টার আর পত্রিকা দেখে নিজে নিজেই কিছু লেখাপড়া শেখেন। এরপর আইসক্রিম ফেরি করে বিক্রি করতেন।  পরে ভাগ্য বদলের আশায় ঢাকায় গিয়ে আরামবাগ হোটেলে কিছুদিন কাজ করেছেন। বছর দুই পর ১৯৬২ সালের দিকে যশোরে ফিরে আসেন। নিজ বাড়িতে একটি লন্ড্রির দোকান দেন। এর মধ্যে কচির বিয়ের কথাবার্তা হয়; কিন্তু সবাই বলে ম্যাট্রিক পাস হলে বিয়ে হবে। চাকরি হবে। জাফর কমরেড মতিনের শরণাপন্ন হন।  বলেন, ‘যেভাবেই হোক আমি লেখাপড়া শিখব। স্কুলে ভর্তি হব।’ অনেক চেষ্টা-তদবিরের পর ২৬ বছর বয়সে নিউ মডেল টাউন একাডেমি স্কুলে ক্লাস নাইনে ভর্তি হন। একপর্যায়ে ম্যাট্রিকে তিনি কম্পার্টমেন্টাল (এক বিষয়ে ফেল) পান। মন ভেঙে যায়।  কান্নাকাটি শুরু করেন। এ সময় সাংবাদিক আবেদ খান তাঁকে নানাভাবে সান্ত্বনা দেন। আবেদ খান তাঁর ঢাকার নারিন্দার বাসায় নিয়ে যান। এখানে কয়েক দিন থেকে যশোরে এসে নতুন উদ্যমে ফের লেখাপড়া শুরু করেন। অবশেষে ১৯৬৭ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। পাস করার পর তাঁর স্কুলের ছাত্রদের বিনা বেতনে পড়িয়েছেন। আর দীর্ঘ ২৫ বছর তিনি ওই স্কুলের পরিচালনা পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি যে কলেজে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করেছেন, সেই এম এম কলেজে আইএ ভর্তি হন। ১৯৬৯ সালে আইএ পাস করে ওই কলেজেই বিএ ভর্তি হন। কলেজ সংসদে তিনি কমনরুম সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। ১৯৭২ সালে বিএ পাস করেন। ১৯৭৩ সালে প্রথম পৌরসভা নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে কমিশনার নির্বাচিত হন। স্ত্রী ইলিনা বেগম ২০১৫ সালে রত্নগর্ভা মায়ের মুকুট পরেন। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী সারা দিনই বেওয়ারিশ লাশের সন্ধান করেন, সেবামূলক কাজে জড়িত থাকেন। তাতে আমি গর্ববোধ করি।’ জাফর উদ্দিনের ছেলে এস এম শরিফুল ইসলাম বাংলাদেশ পুলিশ কো-অপারেটিভ সোসাইটির সচিব। তিনি বললেন, ‘আমাদের ছিল কষ্টের জীবন; কিন্তু বাবা আদর্শ থেকে বিচ্যুত হতে দেননি।’

                             ছবি : ফিরোজ গাজী



মন্তব্য