kalerkantho


বিশাল বাংলা

পল্লী অ্যাম্বুল্যান্স

গ্রামের মানুষ টাকার অভাবে অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে পারে না। তাই কেউ অসুস্থ হলে ঝুঁকি নিয়েই তাঁকে হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যায়। এসব সমস্যা সমাধানে চুয়াডাঙ্গায় ইজিবাইককে অ্যাম্বুল্যান্সের আকার দিয়ে চালু হয়েছে ‘পল্লী অ্যাম্বুল্যান্স’ সেবা। খোঁজ নিয়েছেন মানিক আকবর

১০ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



পল্লী অ্যাম্বুল্যান্স

সদরের দিকে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ সাইরেনের শব্দ। ফিরে দেখি কলাপাতা রঙের একটি গাড়ি। গায়ে লাল কালিতে লেখা ‘পল্লী অ্যাম্বুল্যান্স’। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কোথায় যাচ্ছে?

—কেন? হাসপাতালে রোগী নিয়ে যাচ্ছে।

চুয়াডাঙার কোনো না কোনো গ্রামের রাস্তায় হঠাৎ চোখে পড়তে পারে এ ধরনের অ্যাম্বুল্যান্স। সদর উপজেলায় পল্লী অ্যাম্বুল্যান্স রয়েছে সাতটি। অসুস্থ মানুষ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কিংবা হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ করছে। এরই মধ্যে হাজার হাজার মানুষ সেবা পেয়েছেন। প্রত্যন্ত গ্রামে মানুষের দৌড়গোড়ায় পৌঁছে গেছে এই সেবা।

অ্যাম্বুল্যান্স দেখতে অনেকটা ইজিবাইকের মতো। প্রচলিত অ্যাম্বুল্যান্সের মতো পল্লী অ্যাম্বুল্যান্সেও লাল আলো জ্বলে-নেভে, সাইরেন বাজে। তিন চাকার ব্যাটারিচালিত এ গাড়ির চালকদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহে রাখেন গ্রামবাসী। জরুরি মুহূর্তে অ্যাম্বুল্যান্স চালকের নম্বরে ফোন দিলেই হলো। বাড়িতে পৌঁছে যাবে অ্যাম্বুল্যান্স। তারপর অ্যাম্বুল্যান্সে রোগী এবং রোগীর স্বজনদের নিয়ে যাওয়া হয় তাদের পছন্দের হাসপাতাল কিংবা কাছের সরকারি স্বাস্থ্য ক্লিনিকে। রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা যেকোনো সময় পল্লী অ্যাম্বুল্যান্স প্রস্তুত থাকে অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।

 

যেভাবে শুরু

চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে চলছে পল্লী অ্যাম্বুল্যান্স। উদ্যোগটা নিয়েছেন চুয়াডাঙ্গা সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াশীমুল বারী। এখন চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের প্রত্যেকটিতে আছে একটি করে পল্লী অ্যাম্বুল্যান্স। পরিকল্পনা অনুযায়ী সাতটি ইউনিয়ন পরিষদের জন্য সাতটি পল্লী অ্যাম্বুল্যান্স তৈরি করা হয়। প্রতিটি তৈরিতে খরচ হয়েছে এক লাখ ৬৭ হাজার টাকা। নিজ নিজ ইউনিয়ন পরিষদই খরচ দিয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা নিজ ইউনিয়নের আগ্রহী চালকদের হাতে দিয়ে দেন পল্লী অ্যাম্বুল্যান্স।

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ওয়াশীমুল বারী বলেন, ‘প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসুস্থ মানুষদের কথা ভেবে পল্লী অ্যাম্বুল্যান্সের পরিকল্পনা করা হয়। এখন বেশ সাড়া মিলেছে। আগে গ্রামের রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে আসার ভালো কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এমন অনেক গ্রাম আছে, যেখানে শহর থেকে অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। অ্যাম্বুল্যান্স যেতে সময়ও লাগে বেশি। হাসপাতালে পৌঁছতে দেরি হলে রোগীর ঝুঁকি বেড়ে যায়। তা ছাড়া গ্রামের দরিদ্র মানুষের আর্থিক সংগতিরও একটা ব্যাপার আছে। তাই কম খরচে গ্রামের রোগীদের হাসপাতাল কিংবা নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

 

যেভাবে চলছে

কিছু নীতিমালার অধীনে চলছে পল্লী অ্যাম্বুল্যান্স। ২৪ ঘণ্টা রোগীর সেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। কেউ ফোন করলেই  অ্যাম্বুল্যান্স পৌঁছে যাবে রোগীর দুয়ারে। চালকের নম্বর যদি না থাকে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ সচিবের কাছেও ফোন করে অ্যাম্বুল্যান্সের সেবা নেওয়া যাবে। সাধারণ ইজিবাইকে নির্দিষ্ট দূরত্বে যাত্রী বহনে যে ভাড়া দিতে হয়, এখানেও সেই ভাড়াই প্রযোজ্য হবে। অন্য সময় পল্লী অ্যাম্বুল্যান্সগুলো সাধারণ যাত্রীও বহন করতে পারবে। অ্যাম্বুল্যান্সগুলো দেখভাল করে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ। আলোকদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইসলাম উদ্দিন বলেন, হাসপাতালে পৌঁছার জন্য গ্রামের মানুষ হাতের কাছে পাচ্ছে পল্লী অ্যাম্বুল্যান্সের সেবা। এতে খুশি গ্রামবাসী। আগে ভ্যানে শুইয়ে গ্রাম থেকে রোগী শহরে নিতে দেখেছি। মহিলা রোগী হলে তাদের বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হতো। এখন পল্লী অ্যাম্বুল্যান্সের কারণে তা আর হয় না। শংকরচন্দ্র ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান বলেন, পল্লী অ্যাম্বুল্যান্সের অনেক গরিব মানুষ উপকার পাচ্ছেন।

 

এক চালকের অভিজ্ঞতা

আলোকদিয়া ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের নয়ন আলী। আগে মাঠে দিনমজুরের কাজ করতেন। এখন পল্লী অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে আলোকদিয়া ইউনিয়নের গ্রামে গ্রামে ঘোরেন। খবর পেলে ছুটে যান রোগীর বাড়ি। নয়ন বললেন, ‘ইজিবাইকের যে ভাড়া সেই ভাড়ায়ই রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছে দিই আমরা। অনেকে খুশি হয়ে কিছু বকশিশও দেন। আবার কারো ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য না থাকলে অসুবিধা নেই, আমরা হাসপাতালে পৌঁছে দিই। কত অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিয়েছি, বলে শেষ করা যাবে না। একবার একজনের শরীরের কিছু পরীক্ষার দরকার ছিল, যা চুয়াডাঙ্গায় হয় না। নিয়ে গেলাম ঝিনাইদহে।’

 

উপকারভোগীরা বললেন

আলোকদিয়া ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের গৃহবধূ সোনিয়া খাতুন। গর্ভবতী ছিলেন তিনি। এক দিন বিকেলে প্রসব বেদনায় কাতর ছিলেন তিনি। স্বামী দিনমজুর মহিনউদ্দিন পল্লী অ্যাম্বুল্যান্সের চালকের নম্বরে ফোন করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর বাড়ির দরজায় এসে হাজির হয় পল্লী অ্যাম্বুল্যান্স। অ্যাম্বুল্যান্সে করে সোনিয়াকে নিয়ে যাওয়া হয় চুয়াডাঙ্গা শহরের একটি ক্লিনিকে। সেখানে সোনিয়ার কোল আলো করে আসে এক কন্যাসন্তান। মহিনউদ্দিন বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গা শহর থেকে অ্যাম্বুল্যান্স আসলে অনেক টাকা এবং সময় লাগত। পল্লী অ্যাম্বুল্যান্সে বলতে গেলে আমার কোনো খরচই হয়নি। সেইবার বড় বাচা বেচে গেছি।’

একই গ্রামের শাহাদত আলী বলেন, ‘আমার মা নূরজাহান বেগমের বয়স ৬০ বছর। প্যারালিসিসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। পল্লী অ্যাম্বুল্যান্স ডেকে মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। চালককে খুশি হয়ে ১০০ টাকা দিয়েছিলাম।’ শংকরচন্দ্র ইউনিয়নের জালশুকা গ্রামের হারেজ আলী বলেন, ‘হঠাৎ খুব অসুুস্থ হয়ে গিয়েলাম (গিয়েছিলাম)। সেবার পল্লী অ্যাম্বুল্যান্সে করে শহরের হাসপাতালে নিয়ে গেল। আমি কয়েক দিন পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলাম।’

                                              ছবি: লেখক



মন্তব্য