kalerkantho


বিশাল বাংলা

ফিশিং বোটের কারখানা

জেলেরা ট্রলারে চড়ে সাগরে মাছ ধরতে যায়। বৈরী আবহাওয়ায় ঝড়-তুফানের মধ্যেও দিনের পর দিন টিকে থাকে যে ট্রলার, সেই ট্রলার কোথায় কিভাবে বানানো হয়? মেরামতই হয় কোথায়? খোঁজ নিয়েছেন সোহেল হাফিজ

৩ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ফিশিং বোটের কারখানা

বরগুনা সদর উপজেলার পোটকাখালী ডক ইয়ার্ড। স্থানীয়ভাবে মিলন মেম্বারের ডক বলেই চেনে সবাই। পুরো ডক ইয়ার্ডে চলছে ফিশিং বোট তৈরি ও মেরামতের কাজ। উপকূলীয় জেলা বরগুনার বিভিন্ন উপজেলায় এ রকম ১০ থেকে ১৫টি ডক ইয়ার্ড রয়েছে। যেখানে চলে গভীর সমুদ্রগামী ফিশিং বোট তৈরি ও মেরামতের কাজ। একেকটি ফিশিং বোটের দৈর্ঘ্য হয় ৪০ থেকে ৬০ ফুট। প্রস্থে ১৪ থেকে ১৫ ফুট। একেকটি খালি ট্রলারের ওজনই দুই থেকে তিন শ মণ। এই ট্রলার বানানোর কাজটি হয় স্থানীয় ডক ইয়ার্ডে।

পোটকাখালী মিল মেম্বারের ডক ইয়ার্ডের প্রধান মিস্ত্রির নাম তৈয়ব মিস্ত্রি। ৪৭ বছর বয়স। তিনিই মূলত এই ডক ইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনায় রয়েছেন। তাঁর সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল, প্রথমে ট্রলার বানানোর কাজ শুরু করেন কাঠিন মিস্ত্রি, যিনি প্রথমে একটি ট্রলারের কঙ্কাল বানান। কঙ্কাল মানে ফ্রেম বা স্ট্রাকচার। তারপর একের পর এক কাঠ জুড়ে ট্রলারের আকৃতি বানান। বানান গলুই, চান্দিনা, ছই, রান্নাঘর, লেট্রিন ইত্যাদি। এ কাজ করতে একজন কাঠিন মিস্ত্রি আর ১০ জন শ্রমিকের ন্যূনতম মাসখানেক সময় লাগে। এরপর বেশ কয়েক দিন ধরে চলে গাইনির কাজ। তিন থেকে পাঁচ ইঞ্চি প্রস্থের লম্বা লম্বা কাঠের জোড়ায় জোড়ায় সুতার সলতে ঢুকানোর কাজকে বলা হয় গাইনি। এক ধরনের চিকন লোহা আর হাতুড়ি দিয়ে এ কাজ করা হয় অতি সূক্ষ্মভাবে। গাইনির কাজ শেষে চলে পুটিংয়ের কাজ। কেরোসিন, ধূপ আর পানির সংমিশ্রণে আঠালো এক ধরনের তরল পদার্থ ওই সব সলতের ওপর দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। যাকে বলা হয় পুটিং। এ কাজটিও চলে বেশ কয়েক দিন ধরে। এরপর চলে মারামত (মেরামত নয়)। পুরো ট্রলারটির নিচের অংশে আলকাতরা লাগানো হয়। দু-তিন দিন ধরে আলকাতরা লাগানোর পর তার ওপর কাদার প্রলেপ দেওয়া হয়। কাদা শুকিয়ে গেলে দীর্ঘ সময় ধরে আগুনে পুড়িয়ে আলকাতরাকে ট্রলারের নিচের অংশের কাঠের সঙ্গে টেকসই করা হয়। এ কাজটিকেই ডক ইয়ার্ডের শ্রমিকরা মারামত বলে থাকে। মারামত হয়ে গেলে চলে ইঞ্জিন বসানোর কাজ। ইঞ্জিনের সঙ্গে লাগাতে হয় পেছনের পাখা। পাখা লাগানোর মিস্ত্রি ভিন্ন। তাদের বলা হয় বুশ মিস্ত্রি।

বছরের যে সময়গুলোতে ইলিশ থাকে না, অথবা ইলিশ ধরা থাকে নিষিদ্ধ, সেই সময়টায়ই ডক ইয়ার্ডে কাজের চাপ বাড়ে। এ সময়েই বেশির ভাগ বোট মালিক তাঁদের বোটগুলো মেরামত করিয়ে নেন। কেউ কেউ বানান নতুন বোটও।

একেকটি ট্রলার মেরামতের জন্য প্রতিদিন ডক ইয়ার্ডের ভাড়া দিতে হয় এক হাজার টাকা করে। কোনো ট্রলার সাত দিন থাকলে সাত হাজার টাকা শুধু ডক চার্জ দিতে হয়। কাঠিন মিস্ত্রির দিনপ্রতি মজুরি এক হাজার টাকা। এ ছাড়া গাইনি, পুটিং ও মারামতের জন্য ভিন্ন ভিন্ন মিস্ত্রি রয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকের দিনপ্রতি মজুরি সাত শ থেকে আট শ টাকা। বুশ মিস্ত্রি কাজ করেন ঠিকা। অর্থাৎ একটি ট্রলারের বুশ (মেশিনের সঙ্গে পাখার সেটিং) সেট করে দিতে একজন বুশ মিস্ত্রি ছোট-বড় ট্রলারভেদে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০, এমনকি দুই হাজার টাকাও নিয়ে থাকেন। তৈয়ব মিস্ত্রি আরো জানালেন, একটি ফিশিং বোট বানাতে সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা খরচ হয়। জাল-দড়ি সবসহ প্রায় কোটি টাকা পড়ে যায় একটি ভালো মানের ফিশিং বোট বানাতে। এসব বোট বানাতে গর্জন, চাম্বল, ত্রিশূল ইত্যাদি কাঠ ব্যবহার করা হয়। কোনো ফিশিং বোট যখন মেরামত করা হয়, তখন সেই ট্রলারের ভেতরেই চলে জেলেদের রান্নাবান্না, চলে রাত যাপনও।

ছবি : লেখক



মন্তব্য