kalerkantho


বিকেল বাড়ি

দেয়ালে আঁকা দুনিয়া

দেয়ালজুড়ে পৃথিবীর ছবি। ল্যাটিন আমেরিকার কলম্বিয়া থেকে আফ্রিকার ঘানা, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান—সবই স্থান পেয়েছে। অপেশাদার, ভ্রমণপিপাসু মানুষ কাগুজে নোট, কয়েন ও আঁকিবুঁকি দিয়ে লন্ডনের এক্সমাউথ কফি শপের দেয়ালে এঁকেছেন পৃথিবীর মানচিত্র। তবে সেটা ভৌগোলিক মানচিত্র নয়। এক সন্ধ্যায় সেখানে কফি খেতে গিয়েছিলেন জুয়েল রাজ

৩ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



দেয়ালে আঁকা দুনিয়া

মিনির সঙ্গে লেখক

ওল্ড গেট ইস্ট পাতাল রেলের প্রবেশদ্বারেই একটি কফি শপ। দোকানটির বাইরে কোনো সাইনবোর্ডও নেই। ব্রিটেনে ক্রেতা বা ভোক্তাদের এক ধরনের ব্র্যান্ডপ্রীতি আছে। হয়তো বা সে কারণেই বেনামি সেই কফির দোকানে আগে কখনো ঢু মারা হয়নি। সেদিন ছুটির দিন ছিল। আশপাশের কফি শপগুলো বন্ধ। অনেকটা বাধ্য হয়েই ঢু মারি সেই কফি শপে। ঢুকেই চোখ ছানাবড়া! এ যেন অন্য এক পৃথিবী। কত কী সে শপের দেয়ালজুড়ে—প্রেম, ভালোবাসা, বিরহ, স্মৃতিচিহ্ন সবই আছে। ২০১৭ সালের জুনে একজন যেমন লিখেছেন—‘লাভ ফ্রম কোস্টারিকা’। আরেকটি কাগজে লেখা—রেজিনা অ্যান্ড মার্টিন। শপের দেওয়া টিস্যু পেপার থেকে শুরু করে বিলের কাগজে আঁকা ছবি বা নকশাও সেখানে স্থান পেয়েছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সের মানুষের শৈল্পিক হাতের ছোঁয়া আছে। নানা ভাষার বর্ণে খচিত নোটগুলো। অনেক নোট। কোনো কোনোটার শুধু কোনাটা দেখা যায়। তাই পরিষ্কার জানা গেল না, ঠিক কতটা দেশ ঠাঁই পেয়েছে এই দেয়ালে। সামনে থাকা কফি ঠাণ্ডা হয়ে যায়। আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শুধু কফি শপের দেয়ালে খুঁজি বাংলাদেশ!

এখানকার কর্মচারীদের যেন দম ফেলার ফুসরত নেই। নির্বিঘ্নে কথা বলব সে সুযোগ কই। তাই কফির দাম দিতে দিতেই জানতে চাইলাম—দেয়ালে এত আঁকিবুঁকি কার? কারা লাগিয়েছে এসব?

কাউন্টারের ভদ্রলোক হেসে বললেন, ‘আপনার মতো কাস্টমাররাই এঁকেছেন এই দেয়াল।’

সেদিন কৌতূহল না মিটিয়েই ফিরতে হলো। আরেক দিন গেলাম। সন্ধ্যার দিকে ভিড় একটু কম থাকে। এই সুযোগে কাউন্টারের পাশে দাঁড়িয়েই কথা হয় এখানকার এক পরিচারিকার সঙ্গে। নাম শাহ মিনি। তিনি বললেন, ‘এক্সমাউথ নামের এই কফি শপটির বয়স মাত্র ছয় বছর। দোকানের সামনে সাইনবোর্ড না লাগানোটা মূলত ব্যাবসায়িক পলিসির অংশ। মূলত কৌতূহল জিইয়ে রাখার জন্যই বাইরে কোথাও সাইনবোর্ড লাগানো হয়নি। এ জন্য আপনার মতো নতুন কেউ এলে শুরুতেই এটা জিজ্ঞেস করেন।’

আলজেরীয় নাগরিক শাহ জামি। দীর্ঘদিন বিভিন্ন কফি শপে কাজ করেছেন। ২০১২ সালের দিকে আরো দুই বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করেন এক্সমাউথ কপি শপ। লন্ডনে তাঁদের মোট তিনটি শপ আছে। হোয়াইট চ্যাপেল ব্রাঞ্চ ছাড়া অন্যান্য শপে এ ধরনের আঁকিবুঁকি নেই।

দেয়ালে টাকার পৃথিবী

শাহ জামি জানালেন, শুরুর দিকে দেয়ালে কাস্টমারদের ফেলনা কাগজ লাগানো হতো। একসময় সেখানে নোট লাগানো শুরু হয়। কাস্টমারদের মধ্যে কে প্রথম দেয়ালে টাকা সেঁটে দিয়েছিলেন, সেটা অবশ্য মনে করতে পারলেন না তিনি। যখন দেখলেন বেশ কয়েকটি নোট জমে গেছে, তখন ভাবনাটা এলো। কাস্টমারদের রেখে যাওয়া টাকা বা আঁকিবুঁকি সেঁটে দিতে শুরু করলেন দেয়ালে। সেই থেকে দীর্ঘ ছয় বছর ধরে তাঁরা দেয়ালটা কাস্টমারদের জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছেন। মা-বাবার সঙ্গে আসা ছোট্ট শিশুরাও সেখানে তাদের আঁকা সেঁটে দিয়ে যাচ্ছে। কফি শপের আশপাশে অনেক ছাত্রাবাস। সেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা থাকেন। তাঁদের অনেকে নিজ নিজ ঐতিহ্য বা পরিচয় তুলে ধরতে হয়তো নিজ নিজ দেশের মুদ্রা সেঁটে দিয়েছেন। তবে মিমি জানালেন, ট্যুরিস্টরাই বেশি আসেন। মূলত তাঁরাই স্মৃতি হিসেবে সঙ্গে থাকা নোট বা কাগজে আঁকিবুঁকি করে রেখে যান। পরে শপের কর্মীরা সেটা দেয়ালে সেঁটে দেন। 

 

এখন ছবিও রাখছেন

মনিকা নামে কফি শপের আরেক পরিচারিকা জানালেন, লন্ডনে আসা অনেকেই এখন বেড়াতে এলে কফি শপে নিজের স্মৃতিচিহ্নটুকু খুঁজে ফেরেন। শুধু কার্টুন বা স্কেচই নয়, অনেকেই লিখে রেখে গেছেন প্রিয়জনকে উৎসর্গ করে লেখা নানা পঙিক্ত। এখন এক ধরনের ক্যামেরা আছে, যেগুলো থেকে ইনস্ট্যান্ট ছবি প্রিন্ট দেওয়া যায়। সেই সুবাদে সম্প্রতি অনেকেই নিজেদের ছোট ছোট ছবিও রেখে যাওয়া শুরু করেছেন। এসবের মধ্যে প্রেমিকযুগল থেকে শুরু করে ছোট শিশুর ছবিও আছে।

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

দেয়াল ঘুরে ঘুরে দেখি ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর ছবিসংবলিত একটি নোটও রাখা আছে। খুঁজতে খুঁজতে বাংলাদেশের শহীদ মিনারের ছবিসংবলিত দুই টাকার নোটও খুঁজে পেলাম। নানা ভাষায় নানা রঙের টাকার নোট, বেশ কিছু কয়েনও আছে; কিন্তু কোথাও বঙ্গবন্ধুকে খুঁজে পেলাম না। পকেটে বাংলাদেশি টাকা নেই। পরিচিত কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করলাম, বঙ্গবন্ধুর ছবিসংবলিত নোট আছে কি না। সবাই বাসায় খুঁজে দেখবেন বলে জানালেন। এর মাঝে এক ছোট ভাই রবিউলের ওয়ালেটে পাওয়া গেল ২০ টাকার একটি নোট। সেই নোটটি নিয়ে পরের দিন সকালে আবার গেলাম কফি শপে; কিন্তু নোটটি লাগাতে গিয়ে আরেক বিপত্তির মধ্যে পড়লাম। তিল পরিমাণ জায়গা খালি নেই। ভেবেছিলাম মহাত্মা গান্ধীর পাশেই বঙ্গবন্ধুকে রেখে আসব; কিন্তু সেখানে ফাঁকা নেই। হঠাৎ চোখে পড়ল পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি। ঠিক মাথার ওপরে রেখে এলাম বঙ্গবন্ধুর ছবিসংবলিত নোটটি। মনে হলো পৃথিবীর মানচিত্র পূর্ণতা পেল এবার।

 



মন্তব্য