kalerkantho

ছবিতলা

ইয়াদুল মমিন ►

২৭ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



ছবিতলা

মেহেরপুর শহর থেকে মুজিবনগর যাওয়ার পথে মোনাখালী ব্রিজ পার হলে দারিয়াপুর বাজার। আর বাজারের প্রবেশমুখে বাঁ দিকেই ফিরোজা বারী কমপ্লেক্স। ঢোকার পর দেখা যায় লিচুবাগান। বাগানের ভেতরে তিনটি টিনশেড ঘর। ওই ঘরগুলোয়ই ছবিতলা। রাজীবের পুরো নাম জাহিদ হাসান। তিনি শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া আর রাজনীতিতে আগ্রহী।

 

ছবিতলা যেমন

প্রথম ঘরটির আয়তন এক হাজার ৬০০ বর্গফুট। তার পরের ঘর দুটি ৬০০ বর্গফুট করে। পাকা ভিটির ওপর টিনের চালাঘর। প্রথম ঘরটিতে ঢুকেই অবাক হতে হয়। হাজার হাজার বরেণ্য ব্যক্তির ছবি। একসঙ্গে অনেক কথা, অনেক স্মৃতির গুঞ্জন। ইতিহাস এখানে কথা কয়ে যাচ্ছে। একাত্তর, বায়ান্ন, উনসত্তর, পঁচাত্তর ফিরে ফিরে আসছে। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনও কথা বলল। রাজীব বললেন, ‘আমরা নাকি ইতিহাস ভুলে যাই। আমি চাই, আমার সীমিত সামর্থ্য দিয়ে ইতিহাস ধরে রাখতে।’

ছবিতলার বাইরের অংশ

আরো আছেন

সাহিত্যিক, সাংবাদিকদের ছবিও আছে, বিশেষ করে যেসব সাংবাদিক আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রেখেছেন তাঁদের ছবি। ছবিগুলো বিভিন্ন বিভাগে ভাগ করে সাজানো। প্রথম দিকের ছবিগুলো কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা হয়েছে। প্রায় হাজারখানেক ফ্রেমবন্দি ছবি আছে। পরে সংগৃহীত ছবিগুলো প্লাইউডে বাঁধাই করা। এতে খরচ কম পড়ছে। ছবিতলায় আছেন মাদার তেরেসা, নেলসন ম্যান্ডেলা, কাঙাল হরিনাথ, আব্রাহাম লিংকন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধীসহ আরো অনেকে।

 

তিন হাজারেরও বেশি ছবি

আছে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারদের ছবি। মুজিবনগর সরকারকে গার্ড অব অনার প্রদানকারী আনসার সদস্যদের ছবিও আছে। অধ্যাপক ইউসুফ আলী মুজিবনগর সরকারকে শপথবাক্য পাঠ করিয়েছিলেন। তাঁকেও ভোলেননি রাজীব। যেসব বিদেশি সাংবাদিক মুজিবনগর সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন, আছে তাঁদের ছবিও। বর্তমানে প্রায় তিন হাজারেরও বেশি ছবি আছে ছবিতলায়। রাজীব বললেন, ‘বেশির ভাগ ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করেছি। কিছু ছবি জোগাড় করেছি পরিচিতজনদের কাছ থেকে। ছবিগুলো সবই একই আকারে প্রিন্ট করিয়ে নিয়েছি। সাজাতে সুবিধা হয়েছে এতে। প্রতিটি ছবি লেমিনেট করিয়ে নিয়েছি। ছবিতলার নিজস্ব কম্পিউটার, প্রিন্টার ও লেমিনেটিং মেশিন আছে।’

 

যেভাবে গড়ে উঠল ছবিতলা

২০১১ সাল। রাজীব নিজেদের লিচুবাগানে একটি কাঠের ঘর তৈরি করান। প্রথমে ভাবলেন, বঙ্গবন্ধুর একটি ছবি ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখবেন। তিনি নিজে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক। তারপর মনে এলো মরহুম দাদা হাজের উদ্দীন বিশ্বাসের কথা। তাঁরই জমি এটা। তাই তাঁর ছবিও রাখবেন ভাবলেন। এরপর বাবাসহ পরিবারের সবার ছবি বাঁধিয়ে নিলেন। ১২-১৩টি ছবিতে ঘরটি অন্য চেহারা পেল। একদিন মুজিবনগর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান কামরুল হাসান চাঁদু এলেন লিচুবাগানে। তিনি বললেন, ‘এখানে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের ছবি টাঙিয়ে রাখতে পারো, জাতীয় চার নেতার ছবিও লাগাতে পারো।’ তাঁর কথায় রাজীব মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক প্রমুখের ছবি ফ্রেমে বাঁধালেন। যত ছবি টাঙালেন, ততই ঘরটি সুন্দর দেখাল। কয়েক দিন পরে ঘরে আড্ডা দিতে এসেছিলেন মেহেরপুর সরকারি কলেজের সাবেক জিএস ওয়াসিম সাজ্জাদ লিখন। তিনি ছবিগুলো দেখে বললেন, ‘বেশ দেখাচ্ছে। আরো ছবি রাখলে তো আরো ভালো লাগবে।’ তখন রাজীব ভাবতে থাকলেন, কাদের ছবি লাগাবেন? তাঁর মনে হলো সেসব মানুষের কথা, যাঁরা মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। তাই মাদার তেরেসা, ম্যান্ডেলার ছবি বাঁধাই করলেন। এক দিন তৎকালীন মুজিবনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ড. আযাদুর রহমানও এসেছিলেন। আযাদুর রহমান নিজে লেখক মানুষ। তিনি সাহিত্যিকদের ছবি রাখার প্রসঙ্গ তুললেন। আরেক দিন এসেছিলেন সাংস্কৃতিক সংগঠক নিশান সাবের। তিনি বললেন, ‘সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের ছবি কেন রাখেন না? যেমন—জর্জ হ্যারিসন।’ এরপর সত্যি সত্যি উঠেপড়ে লাগলেন রাজীব। কম্পিউটারে ছবি খুঁজতে লাগলেন। পরিচিতজনদের বললেন ছবি দিতে। দিন দিন ভরে উঠল ছবিতলা। ইউএনও আবার এলেন। নাম রেখে গেলেন, ছবিতলা। রাজীব বলছিলেন, ‘লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিকরা আমাদের অনেক কিছু জানার সুযোগ করে দেন। ভাষাশহীদ রফিক-জব্বার আমাদের এনে দিয়েছেন মায়ের ভাষা। ক্রিকেট খেলে আমাদের সম্মানিত করেছেন মুশফিক, মাশরাফি বা সাকিব আল হাসান। মহাত্মা গান্ধী, মাদার তেরেসা, নেলসন ম্যান্ডেলা মানুষের কষ্ট দূর করতে জীবনবাজি রেখেছিলেন। দেশ-বিদেশে এ রকম মানুষ কম নয়। আমরা তাঁদের কাছে ঋণী।’

 

বিখ্যাতজনরাও এসেছিলেন

গেল বছর ছবিতলায় গিয়েছিলেন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকি প্রমুখ। মেহেরপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম রসুল, সাবেক এমপি জয়নাল আবেদীন, মেহেরপুর পৌরসভার মেয়র মাহফুজুর রহমান রিটনসহ অনেকেই ঘুরে গেছেন ছবিতলা। অভিনেতা ও আবৃত্তিকার জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় ছবিতলা দেখে গেছেন বেশ আগে। তিনি একটি নতুন ধারণা দিয়ে গিয়েছিলেন, ‘এমন কিছু ছবি জোগাড় করতে পারেন, যাঁদের ছবি সহজে মেলে না। সেই ছবিগুলো হবে এই সংগ্রহশালার বিশেষ কিছু।’ সে থেকেই রাজীব মেহেরপুরের কৃতী সন্তানদের ছবি সংগ্রহ শুরু করেন। তাঁদের মধ্যে আছেন ফুটবলার, স্থানীয় সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা আর রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও।

 

অর্থসংস্থান

লিচুতলার সামনের কয়েকটি দোকান থেকে ভাড়া পাওয়া যায়। একটি স’ মিল থেকেও কিছু আয় হয়। প্রতি মাসে রাজীব পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা বরাদ্দ রাখেন ছবিতলার জন্য। এ ছাড়া বন্ধু ও বড় ভাইদের মধ্যে সহায়তা দিয়ে থাকেন কামরুল হাসান চাঁদু, তৌফিকুল বারী বকুল, শাহিনুর রহমান মানিক, আজিমুল বারী মুকুল, ফজলুল হক, আমিনুল ইসলাম, আবুল কালাম প্রমুখ। রাজীব বলেন, ‘এখানে নটরাজ গ্রুপ থিয়েটার নামের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন কাজ করে। ব্যাডমিন্টন খেলারও ব্যবস্থা রয়েছে।’

 

সহযোগীরা বললেন

শাহিনুর রহমান মানিক বলেন, ‘ছবিতলাকে আমরা বলি সৃষ্টির কারখানা। আর রাজীব সেই সৃষ্টির কারিগর। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়ার মতো গঠনমূলক কাজে যেন তরুণরা মেতে থাকে তাঁর জন্য রাজীবের এই প্রয়াস। মাদক বা সন্ত্রাসীকাজে আমাদের তরুণরা জড়িয়ে গেলে ক্ষতি বিরাট।’ প্রতিবছর এই ছবিতলায় মঞ্চনাটকের আসর হয়। ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতা হয়। কামরুল হাসান চাঁদু বলেন, ‘রাজীবকে সহায়তা দিতে পারলে আনন্দ লাগে।’

 

উঠব উঠব করছিলাম

বিদায় নেওয়ার বেলায়ই প্রশ্নটা করে ফেললাম—এত সব মনীষীর মধ্যে নায়িকা আর বিশ্বসুন্দরীদের ছবি কেন? প্রথমে হেসে ফেললেন রাজীব। বললেন, সময়ের চাহিদা। আরো খোলাসা করে বললেন, ‘তরুণদের টানতেই এ ফন্দি। তাঁরা নায়িকার টানেও যদি আসে, তবু তো মহৎ ব্যক্তিদের দেখে ফেলতে পারছে।’ আমিও হেসে বললাম, ‘হ্যাঁ, সুন্দরের পূজারি তো সবাই।’ শেষে আরেক দফা শুভেচ্ছা বিনিময় ও শুভ রাত্রি।

            

তরুণরা বললেন 

মুজিবনগর সরকারি ডিগ্রি কলেজের ডিগ্রি পরীক্ষার্থী উম্মে হাবিবা ছবিতলায় গেছেন কয়েকবারই। বললেন, ‘এখানকার ছবিগুলো ইতিহাস বলে। অনেক বরেণ্য ব্যক্তির নাম শুনেছি, কিন্তু দেখা হয়নি। এখানে দেখেছি। ভালো লেগেছে।’

মোনাখালী গ্রামের এইচএসসি পরীক্ষার্থী আল ইকরাম সোহাগ বলে, ‘অনেক আগেই শুনেছিলাম ছবিতলার কথা; কিন্তু যাওয়া হয়নি। শেষে মাসখানেক আগে গিয়েছিলাম। যা শুনেছিলাম তার চেয়েও বেশি আছে ছবিতলায়। বরেণ্য ব্যক্তিদের ছবির সঙ্গে সংক্ষিপ্ত পরিচয়ও আছে। আমার বেশি ভালো লেগেছে—মুজিবনগর সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে কারা ছিলেন, কে শপথ পাঠ করান, কোন কোন সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন—তাঁদের ছবি দেখে।’

সবুজ হোসেন পড়ে মুজিবনগর ডিগ্রি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষে। প্রায় বিকেলেই সবুজ ছবিতলায় ব্যাডমিন্টন খেলে। সে বলে, এলাকার অনেক তরুণ এখানে ব্যাডমিন্টন খেলে সময় কাটায়, অনেকে গান শেখে, ছবিতলার ছবিগুলোও দেখতে আসে অনেকে। তরুণদের জন্য ছবিতলা একটা দারুণ সময় কাটানোর জায়গা হয়ে গেছে।

 

একজন রাজীব

মুজিবনগর উপজেলার দারিয়াপুর গ্রামের মৃত আব্দুল বারী বিশ্বাসের একমাত্র ছেলে জাহিদ হাসান রাজীব। দুই ভাই-বোনের মধ্যে রাজীব বড়। বাবা সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন। ১৯৯৩ সালে এসএসসি পাস করেন। পরে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইসিটি বিষয়ে মাস্টার্স করেন। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে। মুজিবনগর উপজেলা পরিষদে আইসিটি টেকনিশিয়ান হিসেবে কর্মরত আছেন তিনি।

 

 



মন্তব্য