kalerkantho


অন্তরালের মানুষ

মানুষের পাশে আরিফ

২৭ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



মানুষের পাশে আরিফ

আরিফের উদ্যোগে ৩৫টি জেলার এরকম ৪০০ পরিবার এখন স্বাবলম্বী

জনসচেতনতা তৈরি, সুবিধাবঞ্চিত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে নিজের ফেসবুক প্রফাইল ব্যবহার করেন আরিফ আর হোসেন। এ জন্য ব্লগিংয়ে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সম্মাননা ডয়েচে ভেলের দ্য ববস জুরি পুরস্কারে মনোনীত হয়েছিলেন কয়েকবার। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন মাহবুবর রহমান সুমন

১৯৭৯ সালে ময়মনসিংহে জন্ম। বাবা প্রকৌশলী এস এম আনোয়ার হোসেন। মায়ের নাম জেবুন্নেসা খাতুন রীনা। আরিফের নানা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন উপাচার্য ছিলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই কেটেছে আরিফের শৈশব। আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও নটর ডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করে পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে। সেখানে অক্সফোর্ড ব্রুকস ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি পেশায় একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। প্রজেক্ট কম্বল, এক টাকার আহার, টেন মিনিট স্কুল, অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশন, আমরাই বাংলাদেশসহ যুক্ত আছেন ৯টি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে। ব্যক্তিজীবনে আরিফ দুই কন্যাসন্তানের জনক।

 

হাসপাতাল থেকে ফেসবুক

ক্লাস ফাইভ থেকে নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন। সেই থেকে লেখালেখির চর্চা। তারপর ২০০৭ সালে ফেসবুকে নিজের আইডি খোলেন। তখন অন্য সবার মতোই স্ট্যাটাস দিতেন; কিন্তু ফেসবুকে যে দীর্ঘ গল্প লেখা যায় সেটা টের পেলেন ২০০৯ সালে। বললেন, ‘২০০৯ সালে প্রথম সন্তানের জন্মের সময় আমি তিন দিনের মতো হাসপাতালে ছিলাম। এই তিন দিন দুই চোখের পাতা এক করতে পারিনি। তখন রাত জেগে থাকার কারণে হাসপাতালের বিভিন্ন ঘটনা চোখে পড়ত। সেগুলো লিখে রাখতাম। এই যেমন ধরুন, দেখলাম হাসপাতালের বিল সেকশনে দুই ভাই বাবার চিকিৎসার খরচ নিয়ে আলোচনা করছেন। সেই ঘটনা উল্লেখ করে লিখে ফেললাম দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিন জায়গা হচ্ছে হাসপাতালের বিল সেকশন। বলতে গেলে সেখান থেকে আমার ফেসবুকে লেখালেখি শুরু।’

 

ফেসবুকার আরিফ আর হোসেন

ফেসবুকে দারুণ জনপ্রিয় আরিফ। ফেসবুকে তাঁকে অনুসরণ করেন পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ। কিন্তু তাঁর প্রফাইলে নিজের কোনো ছবি ব্যবহার করেন না। ফলে ফেসবুকে ফলোয়াররা কখনো তাঁর চেহারা দেখেননি। সমসাময়িক বিভিন্ন ঘটনাকে গল্পচ্ছলে বলে তিনি জনসচেতনতা তৈরি করে থাকেন। যে কেউ কোনো ভালো কাজ করলে বা করতে চাইলে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি তা ফেসবুকে প্রকাশ করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। এসব কাজের জন্য জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলের দ্য ববস জুরি পুরস্কারে পর পর কয়েকবার মনোনীত হয়েছেন। চেহারা না দেখিয়েও যে পর্দার আড়ালে থেকে সোশ্যাল ওয়ার্ক করা যায়, এই ট্রেন্ডটাই তাঁকে বেশি জনপ্রিয় করেছেন বলে মনে করেন তিনি।

 

আরিফের চোখে সেরা তিন অর্জন

২০১৭ সালে রমজানের সময়কার ঘটনা। প্রতিবছর শাড়ি, লুঙ্গি না দিয়ে কিভাবে জাকাত দিলে একটি পরিবার স্বাবলম্বী হয়ে পরের বছর তারাই অন্যদের জাকাত দিতে পারে, সেই কনসেপ্টে একটি স্ট্যাটাস দেন আরিফ। তাঁর সেই স্ট্যাটাসে সে বছর জাকাত ফান্ডে জমা হয় মোট ৪৫ লাখ টাকা। সেই টাকায় কাউকে গরু, কাউকে সেলাই মেশিন, রিকশা বা সবজির দোকান করে দিয়েছেন। দেশের ৩৫টি জেলায় এ রকম  ৪০০ পরিবার এখন স্বাবলম্বী। এই বছরও সেই ফান্ডে জমা হয়েছে ৫৫ লাখ টাকা।

এক দিন বন্ধুদের এক আড্ডায় আরিফ জানতে পারলেন এক বন্ধু তাঁর দুই মেয়ের বিয়ের জন্য দুই রকম বাজেটের টাকা জমিয়েছেন। যে কন্যাটি ফরসা তার জন্য পাঁচ লাখ আর যে কালো তার জন্য ১০ লাখ! সেই বন্ধুর ধারণা, কালো মেয়ে বিয়ের জন্য টাকা বেশি লাগবে। এ ঘটনা আরিফকে খুব ব্যথিত করে। তারপর সাদা-কালো নিয়ে ফেসবুকে একটি লেখা লেখেন। এরপর স্কয়ার টয়লেট্রিজ কর্তৃপক্ষ যোগাযোগ করেন আরিফের সঙ্গে। ‘সৌন্দর্য গায়ের রঙে নয়, ফ্রেশ মানেই সুন্দর’ শিরোনামের বিজ্ঞাপন ও বিলবোর্ডের পাশাপাশি সে সময় একটি ক্যাম্পেইনও করেছিল মেরিল। এ ছাড়া আরিফের এই স্ট্যাটাস দেখে সেইবার আড়ং, সাদাকালোসহ দেশের কয়েকটি ফ্যাশন হাউস তাদের মডেল হিসেবে কালো মেয়ে ব্যবহারের আগ্রহ দেখিয়েছিল।

কনসার্ট ফর কম্বলে টিকেটের বদলে কম্বল নিয়ে হাজির হয়েছিল অনেকে

২০১৪ সালের ঘটনা। সে সময় প্রচণ্ড শীতে ধুঁকছিল উত্তরবঙ্গের মানুষ। তখন আরিফ তাঁর ফেসবুকে কনসার্ট ফর কম্বলের ডাক দেন। তিনি লেখেন, এ কনসার্টে আসতে গেলে কোনো টিকিট ফি লাগাবে না, তবে হাতে করে দুটি কম্বল নিয়ে আসতে হবে। সেইবার জনপ্রিয় ব্যান্ডদলগুলোর অংশগ্রহণে করা কনসার্ট থেকে এক দিনেই প্রায় ৩৫ হাজার কম্বল জোগাড় হয়েছিল। ২০১৭ সালের শীতে কনসার্ট ফর কম্বলের আইডিয়ায় কিছুটা পরিবর্তন আনেন। আরিফ ফেসবুকে বলেন, আপনি সারা দিন অনন্ত জলিলের সঙ্গে কাটানোর সুযোগ পাবেন—বিনিময়ে কয়টি কম্বল দিতে আগ্রহী? কিংবা সাকিব আল হাসান দুপুরে আপনার বাসায় ভাত খাবেন—তাঁর জন্য কয়টি কম্বল দিতে আগ্রহী? এমন সব আয়োজনের এক অনুষ্ঠানেই সেইবার কম্বল উঠেছিল প্রায় ৬০ হাজার। সম্প্রতি হেলমেট না থাকলে তেল বিক্রি নিষেধ বলে পেট্রলপাম্প মালিকদের নির্দেশনা দেয় ডিএমপি। এই ‘নো হেলমেট নো তেল’—আইডিয়াও আরিফের দেওয়া।

 

সুবিধাবঞ্চিতদের মুখে হাসি

টাকার অভাবে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে পারছেন না এমন অনেকেই যোগাযোগ করেন আরিফের সঙ্গে। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে সেই টাকা জোগাড়ে সাহায্য করেন তিনি। এভাবে প্রায় ৩৫ জনের মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছেন বলে জানালেন আরিফ। এ ছাড়া রানা প্লাজার ভবন ধসের ঘটনায় কয়েকজন বন্ধু মিলে একটি ফান্ডে আরিফ প্রায় তিন কোটি টাকা তুলে সিআরপিকে দিয়েছিলেন। বেদনার গল্পও কম নেই। এই যেমন কয়েক দিন আগে আরিফ স্ট্যাটাস দেন, একটি ছেলের চিকিৎসার জন্য তিন লাখ টাকা প্রয়োজন। পা কাটতে না পারলে ছেলেটির সারা শরীরে ক্যান্সার ছড়িবে পড়বে। স্ট্যাটাস দেওয়ার মিনিট বিশেকের মাথায় প্রয়োজনীয় টাকা জোগাড় হয়ে গেছে; কিন্তু সেই ছেলেটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি!

বছর চারেক আগে তিনি শুরু করেন ফুড ব্যাংকিং। বিয়েশাদি বা জন্মদিনসহ যেকোনো অনুষ্ঠানে বেঁচে যাওয়া খাবার ফুড ব্যাংকিং টিম কালেক্ট করে তা অনাহারী মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেয়। এই উদ্যোগের মাধ্যমে এ পর্যন্ত প্রায় তিন লাখ মানুষের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়া গেছে বলে জানান তিনি।

 

অদেখা আরিফ

ফেসবুকে আপনার কোনো ছবি নেই? এমন প্রশ্নের জবাবে আরিফ বললেন, ব্যাপারটা আমি উপভোগ করি। যেমন ধরুন, বিয়ের দাওয়াতে গেছি, সেখানে আমারই দেওয়া স্ট্যাটাস নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, অথচ তারা জানে না স্ট্যাটাস দেওয়া মানুষটা পাশে বসে আছে। আমি বিশ্বাস করি, নিয়ত যদি সৎ থাকে তাহলে তুমি ভালো কাজ করতে পারবে। তোমার অবয়ব থাকতে হবে ব্যাপারটা তেমন নয়। তোমার নামটাই যেন ব্র্যান্ড হয়ে ওঠে, চেহারা না। আরিফকে তো কেউ চেনে না, শুধু নামের ওপর বিশ্বাস করে। তেমনি ভালো কাজের মাধ্যমে যে কেউ আরিফ হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে ফেসবুকে কাউকে চেহারা দেখাই না। দিনশেষে আমরা যেন একটা ভালো কাজে ফেসবুককে ব্যবহার করি—এটাই চান আরিফ।



মন্তব্য