kalerkantho


প্লাস্টিক থেকে তুলা

খাওয়া হয়ে গেলে পরে পানি বা কোমল পানীয়ের প্লাস্টিক বোতলগুলোর কথা কজনই মনে রাখে। আবুল কালাম মোহাম্মদ মূসা কিন্তু সেগুলো কাজে লাগান। তৈরি করেন তুলা। রপ্তানি করেন বিদেশে। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

২৭ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



প্লাস্টিক থেকে তুলা

সুপ্রভাত বাংলাদেশ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন মূসা। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি নিলেন সোনালী ব্যাংকে। দুই বছর পর পদোন্নতি পেলেন। ধানমণ্ডি শাখায় যোগ দিলেন ফিন্যানশিয়াল অ্যানালিস্ট হিসেবে। মূসার শ্বশুর ব্যবসায়ী। মাঝেমধ্যে তাঁকেও পরামর্শ দিতেন। শ্বশুর তাঁকে বলতেন, ‘তোমার বুদ্ধি ভালো। চাকরির দরকার নেই। ব্যবসায় আসো।’ ২০০৬ সাল তখন। মূসা পোস্টিং পেলেন বাহরাইনে। সব কিছু ঠিকঠাক। চলেও যাবেন। কিন্তু শ্বশুর বললেন, ‘যে-ও না। তোমার ব্যবসার সেন্স ভালো। এখানেই ভালো করবে।’ মূসা দ্বিধায় পড়ে গেলেন। কয়েক রাত নির্ঘুম চলে গেল। শেষে চাকরিটা ছেড়েই দিলেন। শ্বশুরের সঙ্গে মিলে একটি স্পিনিং মিল করলেন। শ্বশুরই টাকা দিলেন। মূসা দেখভাল করতেন। কারখানা ছিল সিরাজগঞ্জের বিসিকে। নিয়মিত যাতায়াত করতেন। এর মধ্যে এক দিন ডিসকভারি চ্যানেলে দেখলেন প্লাস্টিকের বোতল থেকে ফাইবার তৈরি করা হচ্ছে। মূসার মনে ধরে বিষয়টি। ভাবলেন, বোতলগুলো কাজে লাগালে তো পরিবেশেরও উপকার হয়। চীনে তাঁর কয়েকজন বন্ধু ছিল। যোগাযোগ করলেন তাঁদের সঙ্গে। তাঁরা বলল, ‘এখানে এসে সরেজমিনে দেখে যাও।’ ২০১৪ সালে চীনের উদ্দেশে বিমানে চড়লেন। কয়েকটি কারখানা ঘুরে ঘুরে দেখলেন; কিন্তু এ ব্যবসায় খরচ অনেক। তবে চীনা বন্ধুরা খুব উৎসাহ দিলেন। দেশে ফিরে মূসা একটি প্রস্তাবনাপত্র তৈরি করে ব্যাংকে গেলেন। কিন্তু ধারণাটি এতই নতুন ছিল যে লোকে ভাবছিল পাগলামি। বন্ধুস্থানীয় এক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেই বসলেন, ‘ভাই, আপনার কি মাথা ঠিক আছে? বোতল থেকে তুলা! কিভাবে সম্ভব?’

 

মূসা থেমে গেলেন না

একটু মন খারাপ হলো; কিন্তু দমে যাওয়ার মানুষ নন মূসা। আবার চীনা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। তাঁদের জানালেন, ব্যাংকের লোকজন তো বিশ্বাসই করতে পারছে না যে প্লাস্টিক থেকে তুলা হয়। বন্ধুরা উত্তরে বললেন, ‘ঠিক আছে, আমরা এসে ব্যাংক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলব।’ ২০১৫ সালে মূসার চার চীনা বন্ধু বাংলাদেশে এলেন। সঙ্গে আনলেন কাঁচামাল এবং তৈরি পণ্য। মূসা তাঁদের নিয়ে এনসিসি ব্যাংকে গেলেন। উৎপাদন প্রক্রিয়াটাও ভিডিওতে দেখালেন ব্যাংকের এমডিকে। একসময় নানা হিসাব-নিকাশ শেষে ৮৬ কোটি টাকা ঋণ মঞ্জুর করল ব্যাংক। মূসা পাঁচ একর জায়গা কিনলেন মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের পানিশাইল গ্রামে। যন্ত্রপাতি আনালেন চীন থেকে। শুরু হলো মূমানু পলিয়েস্টার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড কারখানার নির্মাণকাজ।

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে উত্পাদনে গেলেন। ৪০ টন উৎপাদনক্ষমতা থাকলেও প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৩৬ টন করে তুলা উত্পাদিত হতো। দেশে পেট বোতল থেকে তুলা উত্পাদনের এটাই প্রথম কারখানা। তাই আশায় বুক বেঁধেছিলেন মূসা। ভেবেছিলেন, লোকাল মার্কেট ধরা সহজ হবে; কিন্তু বিধিবাম! ক্রেতাদের কাছে নিয়ে গেলে শুরুতেই তাঁরা প্রশ্ন করেন—কোথায় তৈরি হয়েছে? ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ বললেই মুখ ফিরিয়ে নিতেন সবাই! এভাবে প্রায় দেড় মাস চলে গেল। এক ছটাক তুলাও বিক্রি করতে পারেননি। তত দিনে তুলায় কারখানা ভরে গেছে। বেচতে পারছেন না দেখে একপর্যায়ে উত্পাদন বন্ধও করে দিলেন! শ্রমিকদের বেতন, ব্যাংক লোনের কিস্তি পরিশোধসহ আনুষঙ্গিক খরচ—মূসার চোখে-মুখে তখন রাজ্যের হতাশা। তা দেখে তাঁর স্ত্রী নুসরাত জাহান বললেন, ‘এখানে কেউ যেহেতু নিচ্ছে না, তুমি একবার চীনাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখো না।’

 

আচ্ছা পাঁচ কেজি পাঠাও

চীনা বন্ধুরা স্যাম্পল পাঠাতে বললেন। স্যাম্পল দেখে বললেন, ‘মাল তো ঠিক আছে। আচ্ছা, এবার পাঁচ কেজি পাঠাও। আর তুমিও সময় করে একবার চীনে আসো।’ মূসা ৬০ কেজি তুলা নিয়ে চীনে গেলেন। একজন ক্রেতার সঙ্গে বনিবনা হলো। প্রথমবারেই ২০০ টনের অর্ডার পেলেন! কেজিপ্রতি এক ডলার করে দাম। জাহাজে করে সাংহাইতে তুলা পাঠালেন; কিন্তু দুর্ভাগ্য যেন পিছু ছাড়ে না। মাল পেয়ে সেখানকার ক্রেতা ছবি পাঠালেন। দেখা গেল যেভাবে পাঠিয়েছেন, ঠিক সেভাবে চীনে পৌঁছায়নি। বস্তায় কাঁদা মাখা, কালি লাগানো। দেখে আবারও হতাশ মূসা। বললেন, ‘যেটুকু পারেন ব্যবহার করেন। বাকিটার দায় আমার।’ মূসার এই সরল স্বীকারোক্তি দেখে মুগ্ধ হলেন ক্রেতা। শেষ পর্যন্ত আর ক্ষতিপূরণ দিতে হয়নি। এরই মধ্যে মূসার তুলা চীনে বিক্রির খবর চাউর হয়ে যায়। লোকাল মার্কেটের ক্রেতারাও তখন মূসার সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। এখন মূসার কারখানায় প্রতি মাসে এক হাজার ৮০ টনের মতো তুলা উত্পাদিত হয়। বড় একটা অংশ রপ্তানি হয় চীনে। বাকিটা দিয়ে দেশের চাহিদা মেটে। দেশে স্কয়ার স্পিনিং মিল, বেক্সিমকো সিনথেটিক, এম আই গ্রিন লুন, আশিক কম্পোজিট, এল কে কটন ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান মূসার ক্রেতা। মানিকগঞ্জে কারখানায় প্রায় ২০০ শ্রমিক কাজ করেন। এ ছাড়া ৯ জন আছেন চীনের। মূসা বললেন, ‘শুরু থেকেই কোয়ালিটির ব্যাপারে আমি কোনো আপস করিনি। আমার পণ্যই আমার ব্র্যান্ডিংয়ে সাহায্য করেছে। তুলা তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ফেলনা প্লাস্টিকের বোতল ব্যবহার করায় পরিবেশ দূষণের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে। কারণ তুলা বানাতে যে ধরনের বোতল ব্যবহৃত হয় তা মাটির সঙ্গে মেশে না।’ তবে কারখানায় গ্যাসের সংযোগ না থাকা এবং লোডশেডিংয়ের সমস্যাটাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানান মূসা।

 

এবার ইউরোপ যাবে

সম্প্রতি মূমানু পলিয়েস্টার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড রিসাইকেল ক্লেইম স্ট্যান্ডার্ড (আরসিএস) সনদ পেয়েছে। দিন কয়েক আগে স্পেনে স্যাম্পল পাঠিয়েছেন। ভারতের ক্রেতারাও যোগাযোগ করেছেন। সব কিছু ঠিক থাকলে অচিরেই চীনের পাশাপাশি এ দুটি দেশেও রপ্তানি শুরু হবে।

যেভাবে প্লাস্টিক থেকে তুলা

রাস্তাঘাট, নর্দমা কিংবা আবর্জনার স্তূপ থেকে বোতল কুড়ায় টোকাইরা। সেটা তারা ভাঙ্গারির দোকানে বিক্রি করে। ভাঙ্গারি দোকানদাররা আবার একটু বড় দোকানে সেসব বোতল বিক্রি করে। কোনো কোনো দোকানি সরাসরি কারখানায় বোতল সরবরাহ করে। কারখানায় আসা বোতলগুলো থেকে প্রথমে প্লাস্টিকের ক্যাপ সরানো হয়। এরপর সাদা আর সবুজ বোতল আলাদা করা হয়। পরে বোতলের গায়ের লেবেল তুলে ফেলে পুরো বোতলটি পরিষ্কার করা হয়। এরপর যন্ত্রের মাধ্যমে বোতলগুলো কেটে ও ধুয়ে শুকানো হয়। এসব বোতলের টুকরা থেকে তৈরি হয় পলিস্টার স্টেপল ফাইবার বা পিএসএফ। এই পিএসএফ দিয়ে সুতাকলগুলো সুতা (পলিস্টার ইয়ার্ন) তৈরি করে। যেটা জার্সি, গরম কাপড়, ব্লেজার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এর বাইরে তৈরি হয় পাপোশ, পর্দা, কার্পেটসহ নানা পণ্য। 

মূমানু পলিয়েস্টার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের এজিএম (অ্যাডমিন) আমিনুজ্জামান লিটন জানালেন, ফ্লেক্সগুলো (পেট বোতলের টুকরা) গরম পানি দিয়ে ধোয়া হয়। ৯০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় সেই ফ্লেক্স আট ঘণ্টা বায়ুনিরোধক ড্রামে রাখা হয়। ভ্যাকুয়াম ড্রামে তাপ দেওয়ার পর তৈরি হয় পেস্ট। সেই পেস্ট স্পিনারেট দিয়ে স্লাইবার করা হয়। এরপর তা বিভিন্ন আকারে কাটিং করে মেশিনে ঢোকানোর পর পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার (পিএসএফ) হিসেবে সাদা তুলা বেরিয়ে আসে। ক্রেতার চাহিদামতো তা ৩২, ৩৮ কিংবা ৫১ মিলিমিটার দৈর্ঘ্যের হয়ে থাকে। উৎপাদিত তুলা কার্পাস তুলার মতোই নরম ও মসৃণ। রপ্তানির উদ্দেশ্যে মেশিনেই তা প্যাকেজিং করা হয়। এ থেকে সুতার মতো যে বর্জ্য বের হয় সেটিও আবার রিসাইকেল পদ্ধতিতে তুলা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।



মন্তব্য