kalerkantho


ঐতিহ্য বাংলা

সুলতানের ঘানি

ঘানি থেকে ধীরে ধীরে মাটির পাত্রে চুইয়ে পড়ছে সরিষা বা নারকেল তেল। যন্ত্রের দাপটে গ্রামবাংলার এই অতি পরিচিত দৃশ্যটি এখন খুব একটা চোখে পড়ে না; কিন্তু ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঘানি টেনে চলেছেন যশোরের মণিরামপুরের সুলতান মোড়ল। এক দিন দেখতে গিয়েছিলেন বাবুল আকতার

২৭ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



সুলতানের ঘানি

মণিরামপুরের ঝাঁপা গ্রাম। বাঁওড়ের ভাসমান সেতু পার হলেই হাতের বাঁয়ে সুলতান মোড়লের বাড়ি। ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল ৪টার মতো বাজে। বাড়ির দরজায় পা রাখতেই কানে ভেসে এলো ক্যাঁচ ক্যাঁচ...। আরেকটু সামনে যেতেই বুঝলাম এটা আসলে ঘানির শব্দ। উঠানে কাতারির (ঘানির একটা অংশ) ওপর বসে আছেন একজন। চুলে পাক ধরেছে। মুখে সাদা দাড়ি। উদোম গা। পরনে চেকের লুঙ্গি। কোমর, পিঠ বাঁকা হয়ে গেছে। শরীরের কোথাও একটু মেদ নেই। চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে।

বুঝলাম ইনিই সুলতান মোড়ল। ঘানি ঘুরছে। তিনিও ঘুরছেন। তাঁকে সহযোগিতা করছেন সহধর্মিণী আমেনা খাতুন। দেখা মাত্রই কাতারি ছেড়ে এগিয়ে এলেন। হাসিমুখে বসতে দিলেন। ঘানির পাশে বসেই আলাপ শুরু করলাম।

সুলতানের বাবা জব্বার মোড়ল, মা সবুরন বিবি। লেখাপড়া বেশি দূর করতে পারেননি। বয়স কত জিজ্ঞেস করতেই ঘরে গেলেন। ন্যাশনাল আইডি কার্ড নিয়ে ফিরে এলেন। বললেন, ‘কিছুদিন স্কুলে গেছিলাম। জন্মের দিন-তারিখ ঠিক মনে নেই। ভোটার কার্ডে তারিখ দেওয়া আছে।’ ন্যাশনাল আইডি কার্ড হাতে নিয়ে দেখলাম, তাতে লেখা জন্ম ১৯৪৭ সালে। সে হিসাবে সুলতানের বয়স এখন ৭২ বছর।

 

সুলতান বলে চলেন

আমার দাদা সোনাই মোড়ল ঝিকরগাছা থেকে বস্তা ভরে সরিষা কিনে আনতেন। তখন তো আর মোটর ছিল না। ঘানিতেই তেল হতো। বাপের আমলেও এর ব্যবসা ভালো ছিল। ছোট থাকতি বাবাকে সাহায্য করতাম। আমার মনে আছে, ৬৩ টাকা দিয়ে একটি গরু কিনে আমি প্রথম কাজ শুরু করি।

আমাগের উপজেলার ঝাঁপা, খানপুর, কাশিপুর, নেহালপুর, রোহিতা, হরিহরনগর, কাশিমনগর, মোহনপুর, ভোজগাতি, লক্ষণপুর, শ্যামকুড়সহ অন্তত ৩০টি গ্রামে এসব পিশার (পেশার) মানুষ বসবাস করে; কিন্তু এখন মেশিনির যুগি হারায় যাচ্ছি আমরা। হারায় যাচ্ছে বাপ-দাদার এ পিশা। জীবন বাঁচানের জন্যি বাপ-দাদার এ পিশা ছেড়ে অন্য পিশায় যোগ দিয়েছে অনেকেই। হাতে গোনা কয়েকজন ধরে রাখছে বাপ-দাদার এ পিশাকে।

 

সুলতানের কষ্ট

কৃষক, তাঁতি, কামার, কুমার, জেলে, স্বর্ণকার, ধোপা অন্য পিশার মতো আমরাও সুম্মান (সম্মান) নিয়ে সুমাজে (সমাজে) বসবাস করি। আমাগের বংশের উপাধি মোড়ল। তার পরও মানুষ অনেক সময় আমাগের ‘কলু’ বলে। জাত তুলেও কথা বলে। শুনলে কষ্ট লাগে।

 

ভিটেটুকুই সম্বল

আমার চার ছেলে, এক মেয়ে। ওদের বড় করেছি অনেক কষ্টে। মেয়ে ফেরদৌসীকে উপজেলার হেলাঞ্চি গ্রামে বিয়ে দিয়েছি। ছেলেদের বেশি দূর লিখাপড়া শিখাতি পারিনি। ওরা সবাই পরের ক্ষেত-খামারে কাজ করে। সবাই যার যার মতো সংসারধর্ম করছে। আমরা দুজন বড় অসহায়। জমিজমা বলতে কিছুই নেই। ভিটেটুকুই সম্বল। জীবনে সরকারি কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাইনি। চেয়ারম্যান-মেম্বরের কাছে ধন্না দিয়েও একটা বয়স্ক কার্ড বা গরীবির চাল তা-ও ভাগ্যে জুটিনি। আমি ও আমার স্ত্রী সেই ঘাঁন (ঘানি) নিয়েই পড়ে আছি। ঘাঁন টেনে জীবনের এতগুলো বছর পার করেছি। বাপ-দাদার পিশা ছাড়িনি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এ পিশায় থাকতে চাই, এ পিশাই আমার জীবন।

 

অন্যরা বললেন

সুলতান মোড়লের সহধর্মিণী আমেনা খাতুন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, ‘কী হবে বাবা পিপারে দিয়ে। আমাগোরে কে দেখবে?’ সুলতানের বাড়ি ফেরার পথে দেখা হয় স্থানীয় বাসিন্দা যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি  ড. মো. আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, বাঙালির আদি ঐতিহ্যের নানা পেশার মধ্যে ঘাঁন গাছ একটি ঐতিহ্যবাহী পেশা। সুলতান মোড়ল এ পেশাকে ধরে রেখেছেন। বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধরে রাখা বর্তমান প্রজন্মের দায়িত্ব ও কর্তব্য। হারিয়ে যেতে বসা এ পেশাকে বাঁচিয়ে রাখতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

 

ছবি : লেখক

যেভাবে ঘানি থেকে তেল হয়

সরিষা, বাদাম, তিসিসহ বিভিন্ন শস্যদানা থেকে তেল যে যন্ত্রের মাধ্যমে পেষাই করা হয় তাই ঘানি। যশোরের স্থানীয় ভাষায় একে বলে ঘাঁনগাছ। ঘানি সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি। এর প্রধান অংশকে বলে ‘গাছ’। ছয় থেকে আট ফুট লম্বা গাছের অর্ধেকই মাটিতে পোঁতা থাকে। গাছের ওপরে বেড় দেওয়া একটি অংশ থাকে, তাকে ‘ওড়া’ বলে। এই ওড়ায়ই সরিষা বা বাদাম ঢালা হয়। পেষার জন্য এর মধ্যে মুগুরের মতো একটি দণ্ড দেওয়া হয়, একে বলে ‘জাইট’। জাইটের ওপরের খোলা অংশ একটি বাঁকানো কাঠ দিয়ে টুপির মতো আটকিয়ে দেওয়া হয়। তাকে বলে ‘ডেকা’। ডেকার বাঁকানো নিম্নাংশ বড় একটি তক্তার সঙ্গে আটকানো। তাকে বলা হয় ‘কাতারি’। কাতারির যে প্রান্ত গাছের সঙ্গে যুক্ত করা হয় তা অর্ধচন্দ্রাকারে কাটা হয়। এরপর গাছের কোমর বরাবর চারপাশ ঘিরে একটা খাঁজ কাটা হয়। যাতে কাতারিটি পড়ে না যায়। কাতারিটি ঘোরানোর জন্য অপরপ্রান্তে জুড়ে দেওয়া হয় গরু। কাতারির ওপর রাখা হয় পাথর কিংবা অন্য কোনো ভারী বস্তু। গাছের নিম্ন অংশে একটি ছিদ্র থাকে। এই ছিদ্রের মাথায় একটি সরু কাঠ দেওয়া থাকে, যাকে বলা হয় পাতারি। গরু চলতে শুরু করলে ডেকা জাইটটিকে ঘোরায়। আর সেখানে সরিষা কিংবা অন্য কোনো শস্যদানা পিষে তেল বের হয়ে আসে। সেই তেল পাতারি বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় পাত্রে গিয়ে পড়ে। একজন কারিগর ও একজন সহকারী দিনে ২০ কেজি সরিষা ভাঙিয়ে ৮ থেকে ৯ কেজির মতো তেল উত্পাদন করতে পারেন। ভাঙানো বাবদ ঘানি মালিক ২০০ টাকার মতো পেয়ে থাকেন।



মন্তব্য