kalerkantho


বাঙালির বিশ্বদর্শন

পবিত্র বন মাউফলাং

সৈয়দ আখতারুজ্জামান   

২৭ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



পবিত্র বন মাউফলাং

গাইড বলল, ‘আজকে আমরা পবিত্র বন (সেক্রেড ফরেস্ট) দেখতে যাব।’ শুনেই কান খাড়া হয়ে গেল। গাইড আরো বলল, ‘এর নাম মাউফলাং।’ আগে কখনো শুনিনি। আমরা আছি ভারতের শিলংয়ে। শহর থেকে বেশি দূরেও নয় বনটি। ২৫ কিলোমিটার হবে। আমাদের গাইড মিচেল খুবই রসিক লোক। সারাক্ষণ পান খায়। মাথা ন্যাড়া। এক কানে দুল। খাসি জনগোষ্ঠীর সদস্য।  চেরাপুঞ্জি বাড়ি। বলল, ‘না দেখলে বুঝবে না কেন এটা পবিত্র। বলেটলে হবে না ভাই।’ 

 

গ্রামের নামে নাম

সকাল ৮টায় নাশতা সারলাম। বেরিয়ে পড়তে দেরি করলাম না। মিচেল পান খেতে খেতে গাড়ি চালাচ্ছে। আকাশ মেঘলা। পাহাড়ি রাস্তা। পথের ধারে ঝরনা দেখতে পাচ্ছি, মাঝেমধ্যে গুহাও।  তারপর পৌঁছলাম গ্রামটিতে। বনের নামেই গ্রামের নাম অথবা গ্রামের নামে হয়েছে বনের নাম। মাউফলাং। সূর্য তখন মাথায় চড়তে বসেছে। দূর থেকেই সবুজ বন ডাকছিল। খোলা একটা মাঠের মাঝখানে গাড়ি রেখে আমরা হাঁটতে শুরু করি। এর মধ্যে কয়েকজন কিশোর এসে গাইড হতে চাইল। আমরা ভাবি, মিচেল থাকতে আবার বাড়তি খরচ কেন। তবে মিচেল বলল, ‘বনের মধ্যে অনেক পথঘাট। আমি সবটা ভালোমতো চিনি না।’ তাই একজন গাইড নিয়ে নিলাম।

 

বনের ভেতর

নয়া গাইড দাবি করল, বনটির বয়স হাজার ছাড়াবে। আমার মনে হলো, হাজার না হলেও কয়েক শ বছর তো হবেই এর বয়স। বিশাল উঁচু উঁচু বৃক্ষ। গায়ে ভারী শ্যাওলার জামা পরে আছে। পর্যটকরা যত দূর যান, তত দূর পথের চিহ্ন দেখা যায়। তার পর থেকে অরণ্য গভীর। গাঢ় ছায়ার অন্ধকার আমাদের ডাকে। মাঝে মাঝে পাখির ডাক শুনি। আকাশ আবার মেঘ জড়ো করছে। বনের ভেতর অনেক ঝরাপাতা। কালো, হলুদ, ধূসর—নানা রঙের। বনে মানুষের বেশি বসতি নেই। কিন্তু প্রশ্নটা ঘুরছেই মাথায়, বনটা পবিত্র কেন? আমরা বনের অনেকটা গভীরে চলে এসেছি। গাইডকে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়াই। সে বলতে থাকে, নিষেধ থাকা সত্ত্বেও এক দিন এই জঙ্গলে এক কাঠুরে কাঠ কাটতে এসেছিল। আরেক দিন এক শিকারি এসেছিল বন্দুক নিয়ে পাখি শিকার করতে। আরো এক দিন একদল ছেলে-মেয়ে জঙ্গলে এসে ঝোপ থেকে ফুল তুলেছিল, গাছের ডাল ভেঙেছিল। তাদের কেউ আর সুস্থ জীবনে ফিরে যেতে পারেনি। কেউ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে মারা গেছে,  কারোর জবান বন্ধ হয়ে গেছে। দিনে দিনে গ্রামে গ্রামে এই খবর রটে গেল। কেউ বিশ্বাস করেছিল, কেউ করেনি। যারা করেনি তারা আবারও কাঠ কেটেছিল, প্রাণী হত্যা করেছিল। তাদের ওপরও অভিশাপ নেমে এসেছিল। তাই আর কেউ সাহস করে না, আসেও না বেশি কেউ। যারা আসে তারা মূলত প্রার্থনা করতেই আসে। বছরে একবার গোত্রপ্রধানের নেতৃত্বের বার্ষিক প্রার্থনা হয়। গাইড আরেকটু এগিয়ে নিয়ে গেল আমাদের। দেখালো, ওই যে পাথরখণ্ড ওখানেই প্রার্থনা হয়। বলি দেওয়ারও চল ছিল।

আমি ভাবলাম, গল্প সত্যি হোক বা না হোক, মন্দ তো নয়। বনটা যদি এভাবে টিকে যায় তো ভালো কথা। শহরের এত কাছে বন, টিকে থাকা তার জন্য কঠিন বটে। আমি গাইডের কাছে অনুমতি চাইলাম, একটা বৃক্ষ কি জড়িয়ে ধরতে পারি? গাইড অনুমতি দিল। একটা বিশাল সবুজ বৃক্ষ জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ চোখ বুজে থাকলাম। প্রশান্তি পেলাম। বনটায় অনেক অর্কিড দেখলাম, ফার্নও দেখলাম। কাছেই কোথাও ঝরনাধারা ছুটে চলেছে, টের পেলাম। পুরো বনজুড়ে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। অনেক জীবজন্তু আর পশু-পাখির নিরাপদ আশ্রয় এই বন।

 

ফিরতে থাকি

ফিরতে ফিরতে বারবার মনে হচ্ছিল এই বনের গাছগুলো অন্যদের চেয়ে আলাদা। এরা চেয়ে আছে, আমাদের দেখছে। এরা কথাও বলছে। আমাদের তেমন কান থাকলে হয়তো শুনতে পেতাম।

 



মন্তব্য