kalerkantho


আনন্দ বাংলা

দ্য বিল্লাল শো

খেলা দেখিয়ে দিন পার করেন বিল্লাল। আয়-রোজগারও ওই খেলা দেখিয়েই। খেলা শিখতে কলকাতায়ও গিয়েছিলেন। ফখরে আলমের সঙ্গে দেখা হয়েছিল

২০ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



দ্য বিল্লাল শো

নসিমন চালিয়ে স্কুল মাঠে এসে নামলেন বিল্লাল হোসেন। পরনে রংচটা জিন্সের প্যান্ট, আর নীল টি-শার্ট। বয়স তাঁর ৩৫। উচ্চতায় তিন ফুট তিন ইঞ্চি। মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিলেন। এরপর তাঁর চেয়ে বড় একটি বাঁশদণ্ড পুঁতে সেটিতে ভর দিয়ে মাইক চালিয়ে দিলেন। মাইকটি নসিমনে রাখা। গান বাজল, ‘কোন বাড়ির মেয়েরে তুই রূপে আমার মনটা ভুলাইয়া, কোথায় যাস কোমর দুলাইয়া।’ নাচ ধরলেন বিল্লাল গানের তালে তালে। শত শত দর্শক তালি দিয়ে উঠল। নাচ শেষ করে ভাষণ দেওয়া শুরু করলেন, ‘আমি টাটা বিড়লার প্রতিনিধি হয়ে ভারত থেকে আপনাদের আনন্দ দেওয়ার জন্য এসেছি। আমার মা নেই। ছোটবেলায় মা হরিয়েছি। আমি ধুনফুন বুঝি না। ধুনফুন করিও না। জীবন-মৃত্যু নিয়ে খেলা করি। আগুন খেয়ে, কাচ খেয়ে আমি বেঁচে আছি। আমারে পাঁচ টাকা, দশ টাকা দিন। আমার বউ, ছেলে-মেয়েদের বাঁচান।’ মজমা জমিয়ে ফেললেন বিল্লাল। দেখাতে থাকলেন চমকপ্রদ সব খেলা। বিল্লাল সার্কাসওয়ালা।

ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়েছেন বিল্লাল। তাঁর গ্রামের নাম ঝিকড়া। উপজেলা কলারোয়া, জেলা সাতক্ষীরা। বর্তমান ঠিকানা পথঘাট। খেলা দেখানো শুরু করেছেন সেই ১০ বছর বয়সে। মানে ২৫ বছর ধরে। ভারতেও খেলা দেখাতে যান।

 

শুরুর দিনগুলো

অনেক অনেক দিন আগে কলারোয়া স্কুল মাঠে সার্কাস খেলা এসেছিল। দেখতে গিয়েছিলেন বিল্লাল। বিল্লালের শারীরিক গঠন দেখে সার্কাসের ম্যানেজার জোকার হিসেবে তাঁকে দলে নিয়ে নেন। সেই থেকে শুরু। তবে বিল্লাল শুধু জোকার হয়ে বসে থাকেননি, নিজের উৎসাহেই সার্কাসের প্রায় সব খেলা শিখে নিয়েছেন। সুন্দরবন এলাকার দক্ষিণ বাংলা সার্কাস, লাকি সেভেন সার্কাসসহ আরো কয়েকটি সার্কাস দলের সঙ্গে বেশ কয়েক বছর কাটিয়ে ২০১০ সালে কলকাতা চলে গিয়েছিলেন। সেখানে মেটিয়াবুরুজ এলাকায় ওস্তাদ আকতার আলীর কাছে দুই বছর নতুন নতুন খেলা শিখেছেন। এরপর দেশে ফিরে নিজেই গড়েছেন বিল্লাল সার্কাস। এখন দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে বিল্লাল সার্কাস একটি পরিচিত নাম।

 

বিল্লালের খেলা

গানের তালে তালে কপালে বাড়ি দিয়ে কয়েকটি টিউবলাইট ভেঙে মাটির ওপর বিছিয়ে দিলেন। এরপর সেই লাইট ভাঙা কাচের টুকরার ওপর বুক ও পিঠ দিয়ে গড়াতে থাকলেন। কিন্তু শরীর ফুঁড়ে রক্ত বের হলো না। বিল্লাল বললেন, ‘এটি খুব কঠিন খেলা। এর জন্য তাঁকে ২৫ বছর কসরত করতে হয়েছে।’ কাচ খেতেও পারেন বিল্লাল। প্রথমে দুই হাতে দুটি টিউবলাইট নিয়ে নাচতে থাকলেন। তারপর কুড়মুড়িয়ে আস্ত দুটি টিউবলাইট খেয়ে ফেললেন। একপর্যায়ে কয়েক গ্লাস পানি খেয়ে হজম করে নিলেন কাচের টিউব। জিবে বড় সুঁই ফোটানোর খেলাটিও বিস্ময়কর। নেচে নেচে প্রায় আট ইঞ্চি মাপের একটি সুঁই জিবের এপাশ-ওপাশ করে দেন বিল্লাল। আগুন খাওয়া খেলাটি আরো চাঞ্চল্যকর। দুটি লোহার কাঠিতে আগুন নিয়ে বিল্লাল হালুম-হুলুম করে খেয়ে ফেললেন। মনে হলো, এর চেয়ে পছন্দের খাবার তাঁর আর নেই। এ ছাড়া তিনি দাঁতের সাহায্যে বাইসাইকেল ঘোরাতে পারেন, পেটের ভেতর থেকে শত শত ফুট ফিতা বের করতে পারেন ইত্যাদি।

 

নসিমনেই সংসার

কাপড় দিয়ে ঘেরা একটি ভাঙাচোরা নসিমনই বিল্লালের সংসার। পাঁচ বছর আগে তিনি ২৫ হাজার টাকা দিয়ে নসিমনটি কেনেন। এর মধ্যেই সংসার সাজিয়েছেন। সার্কাস খেলার সব সরঞ্জাম, নিজের পোশাক-আশাক, থালা-বাটিসহ আর সব কিছু আছে এতে। মাইক তো আছেই। বিল্লালের হাত-পা ছোট বলে নসিমন চালাতে বেগ পেতে হতো। ব্রেকে পা যেত না। পরে মিস্ত্রির কাছ থেকে সিস্টেম করে নিয়েছেন। বিল্লাল নসিমন চালিয়ে মাইক বাজাতে বাজাতে সাতক্ষীরা, যশোর, খুলনা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়ার গ্রামগঞ্জ ঘুরে বেড়ান। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে সার্কাসের মজমা বসান। বিল্লাল বললেন, ‘কোনো দিন হাজার টাকা, কোনো দিন দুই হাজার টাকা আয় হয়। আবার কোনো দিন হয়ও না। ১৫-২০ দিন পর বাড়ি যাই। দু-এক দিন থেকে ফের নসিমন নিয়ে বের হই।’  বিল্লাল আরো বললেন, ‘কয়েকটি খেলা আছে খুব ভয়ংকর। এসব খেলায় অনেক কষ্ট। বুক কাচের টুকরার আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে যায়। দম বন্ধ হয়ে আসে। তার পরও আমি ভাতের জন্য, দুটি বাচ্চার জন্য, মানুষকে আনন্দ দেওয়ার জন্য কাচের ওপর নাচি, আগুন খেয়ে আগুন হজম করি।’

                                              ছবি : নাজফা আলম

 



মন্তব্য