kalerkantho


সরেজমিন

বাইশমৌজা বাজার

ব্রাহ্মনবাড়িয়ার নবীনগর থানায় মেঘনাপারের বড় বাজার বাইশমৌজা। নরসিংদীর মাঝের চর থেকেও অনেক লোক হাটবারে বাইশমৌজা যায়। গেল মঙ্গলবারের আগের মঙ্গলবার রায়হান রাশেদও গিয়েছিলেন

২০ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



বাইশমৌজা বাজার

সপ্তাহের মঙ্গলবার বাইশমৌজায় বড় হাট। হাটের দিন আমাদের মাঝের চর থেকে ৮-১০টি নৌকা ছাড়ে। আমি কাশেম উদ্দিন মাঝির নৌকায় উঠি। ২৫ বছর ধরে নৌকা চালান কাশেম উদ্দিন। বড় কোনো রোগে না পড়লে বাইশমৌজা মিস করেন না। সাড়ে ১০টায় নৌকা ছাড়ল। কড়া রোদ। ছইয়ের ভেতরে ঢুকে পড়তে হলো একটা সময়। চারটি গরু, তিনটি ছাগল আর অনেক হাঁস-মুরগি নৌকায় তুলেছেন কাশেম উদ্দিন। ছইয়ের ভেতরে এক ধারে নারীদের, অন্য ধারে পুরুষদের বসার জায়গা। বাইশমৌজা যেতে আধা ঘণ্টাও লাগল না। মেঘনার পারে ঘাট। সারি সারি নৌকা বাঁধা। দুই শ হয়ে যাবে।

 

সবজিবাজার

প্রথমে সবজিবাজার। সব রকম সবজি যেমন—টমেটো, শিম, গোল আলু, মিষ্টি আলু, কাঁচা মরিচ, শুকনা মরিচ, বেগুন, কদু, কুমড়া, ঢেঁড়স, ঝিঙা ইত্যাদি মেলে। খুচরা ও পাইকারি দুই রকমেই বিক্রি হয়। মিলন মিয়া সবজি বিক্রেতা। আলগিবাজার বাড়ি। ২০ বছর ধরে বাইশমৌজায় হাট করেন। যখন যা মেলে, তখন তা বিক্রি করেন। আজ নিয়ে এসেছেন কুমড়া আর কদু। বলেন, ‘প্রথম প্রথম বাবার সঙ্গে আসতাম। আমার দেখা দেশের একটি বড় বাজার এটি। এখানে মাল আটকা পড়ে না। বিক্রি হয়ে যায়। ক্রেতারা তুলনামূলক সস্তায় এখান থেকে জিনিসপত্র কিনতে পারে।’

 

কাঠবাজার

লঞ্চঘাটের উত্তরে লম্বা ইটের বাঁধ। সবজিবাজার থেকে একটু উঁচুতে। সিঁড়ি বেয়ে উঠলাম। এটি কাঠবাজার। মাঝখানে পথ রেখে কাঠের ফালি সাজানো। ঘর তৈরির সব রকমের কাঠ এখানে পাওয়া যায়। কাঠ ব্যাপারী আহসানুল্লাহর সঙ্গে কথা হলো, ‘আমরা বরিশাল থেকে গাছ কিনে আনি। ঘর তৈরি করতে যে রকম কাঠ দরকার, সে রকম কাঠ তুলি এ বাজারে। মেহগনি কাঠ বেশি। অল্প লাভেই বিক্রি করি। বর্ষায় বাজার ভালো জমে।’ শান্তিপুর থেকে কাঠ কিনতে এসেছেন মিনু মেম্বার। ৫৫ বছর বয়স তাঁর। বললেন, ‘ছোটবেলা থেকে বাইশমৌজা বাজারে আসি। একসঙ্গে অনেক বাজার করে নিয়ে যাই। আজ এসেছি কাঠ কিনতে। বড় ঘর তুলব। ফেরার সময় মুরালি (মিষ্টিজাতীয় খাবার) কিনে নিয়ে যাব। বাইশমৌজার মুরালি ছোট মেয়েটা খুব পছন্দ করে।’

 

শুঁটকিবাজার

কাঠবাজারের উত্তর-পূর্ব দিকে শুঁটকিবাজার। ৩০-৩৫টি শুঁটকি ঘর আছে। রায়পুরা, লালপুর, নবীনগরের শুঁটকি ব্যবসায়ী বেশি। কাচকি, হিদল, বাইম, চিংড়ি, ইলিশ ও পুঁটি মাছের শুঁটকি বেশি পাওয়া যায়। গুঁড়াগাড়া শুঁটকিও মেলে। অনেক রকমের মাছ মিলে এই গুঁড়াগাড়া শুঁটকিতে। ব্যবসায়ী অসীম সাহার বাড়ি লালপুর। বললেন, ‘৩০ বছর ধরে এ পেশায় আছি। আমার বড় মেয়ে প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার। ছেলেটা চট্টগ্রাম ভার্সিটিতে মাস্টার্স করছে। তারপরের ছেলেটাও পড়াশোনা করে। সব এই শুঁটকি বেচেই।’

অল্প পরেই হাতের বাঁয়ে জালের বাজার। মাছ ধরার জাল বিক্রি হয় এখানে। নতুন ও পুরনো। রায়পুরা সদরের মনির মিয়া এসেছেন বাজারে। শুক্রবার শ্যালিকার বিয়ে। গরু কিনতে এসেছিলেন। শখ করে একটা জালও নিয়ে যাচ্ছেন। বিলে পাতবেন। বললেন, ‘নিজে মাছ ধরার মজাই আলাদা। আর টাটকা মাছের স্বাদ তো জানেনই।’ জাল বাজারের পাশে বড় টিনশেডে মাছ ধরার পলো, মাছ রাখার ডুলা, খাঁচাসহ কৃষিকাজের নানা উপকরণ বিক্রি হচ্ছে।

 

গরুবাজার

বাইশমৌজা গরুর জন্যও বিখ্যাত। ছাগল আর মহিষও ওঠে। বাজারের ঠিক মাঝখানে বসে বলদ গরুর হাট। ষাঁড় গরুর জন্যও আলাদা জায়গা আছে। গাভি আর ছোট বাছুর ওঠে ষাঁড় বাজারের পূর্ব দিকে। ছাগলের জন্য আছে দক্ষিণ দিকে কড়ইতলা। রায়পুরা, আশুগঞ্জ, ভৈরব, নবীনগর থানার বেশির ভাগ মানুষ গরু-ছাগল কেনে এখান থেকে। বেশি দাম ওঠে মাঝের চর আর চানপুরের গরুর। কোরবানির ঈদে বিরাট পশুর হাট হয়ে যায় বাইশমৌজা। রাজশাহী, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ বা সিলেট থেকেও ক্রেতা-বিক্রেতা আসে। এখানে তাদের থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা আছে।

 

বাজারের ইতিহাস    

বাজার মসজিদে জোহর নামাজ পড়ার পর ইমাম সাহেবের মারফত একজন স্থানীয় প্রবীণ লোকের সাক্ষাৎ পাই। নাম হাজি আব্দুল আওয়াল। বললেন, ‘আমি তখন ছোট। বাজারে দুটি ঘর ছিল। একটি ঘর ছিল দর্জির। হিন্দু ভদ্রলোক। কাপড় সেলাই করতেন। আরেকটি ঘর ছিল মেরুদ্দিনের। শনিবারে বাজার জমত। ঘর দুটির আশপাশে লোকেরা শাকসবজি, চাল-ডাল নিয়ে বসত। তখন কাবুলিওয়ালাদের দেখতাম এই বাজারে। বড় পাঞ্জাবি আর পাগড়ি পরত। তারা ওষুধ আর পুরনো কাপড় বিক্রি করত। ওষুধ দিত মানুষের সমস্যা জেনে। বলত, ‘ভালো হলে টাকা দিবেন। না থাকলে পরে দিবেন।’ তারা নাম লিখে নিয়ে যেত। পরেরবার যখন আসত, তখন টাকা বুঝে নিত। থাকত ওই মেরুদ্দিনের ঘরে। আমার মনে আছে জিন্নাহর (মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ) নামে মিছিল-মিটিং করতাম। জিন্নাহর বোন ফাতেমার নামেও আওয়াজ তুলেছি। বাবার কাছে শুনেছি, বাজারটা দাদার আমলের। তবে গরুর বাজার হয়েছে অনেক পরে। তখন গরুর বাজার হতো লালপুরে। একবার লালপুরের লোকদের সঙ্গে আমাদের ঝগড়া হয়। চাঁনপুরসহ আশপাশের তেত্রিশ গ্রামের মানুষ একসঙ্গে মিটিং করে। নেতৃত্ব দেন বীরগাঁওয়ের আব্দুল হক চেয়ারম্যান ও কৃষ্ণনগরের ইদ্রিস চেয়ারম্যান। সবাই মিলে বাইশমৌজায় একটা গরুর বাজার দেওয়া স্থির করে। লালপুরের লোক বাধা দিয়েছিল। চেয়ারম্যান বলেছিলেন, ‘আমাদের মেরে ফেললেও এখানে বাজার হবে।’ তার পর থেকে মঙ্গলবারে বাজার হলো। এখন বাইশমৌজার গরুর বাজারের কথা সবাই জানে। বাজারটি ২০ একর জমির ওপর। ঘর আছে দুই শর বেশি। বাজারের পশ্চিমে মেঘনা নদী। উত্তরে তিতাস নদের শাখা পাগলা নদী। পাগলা নদীর ওপারে লালপুর। দক্ষিণে শিবপুর। পূর্বে আমতলী গ্রাম। নৌকা করে বাজারে আসতে হয় সবখান থেকে। বাইশমৌজা নাম হয়েছে বীরগাঁও ও কৃষ্ণনগরের বাইশটি গ্রাম মিলে। এটি আলাদা কোনো গ্রামের নাম নয়।

 

 

 



মন্তব্য