kalerkantho


সুখবর বাংলাদেশ

অনেক দরজা খুলবে

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



অনেক দরজা খুলবে

প্রায় একই সময়ে ঢাকা ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই দল বিজ্ঞানী ইলিশের জীবনরহস্য উন্মোচনে সাফল্য দেখিয়েছেন। বাকৃবির দলটির নেতৃত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দলটির নেতৃত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হাসিনা খান। তিনি পাটের জীবনরহস্য উন্মোচকারী দলটিরও অন্যতম সদস্য ছিলেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক 

 

জিনোম সিকোয়েন্সিং বা জিন নকশা

ব্যাপারটি কী?

জিন তৈরি হয় ডিএনএ দিয়ে। ডিএনএর রাসায়নিক যৌগের (কেমিক্যাল কম্পাউন্ড) মধ্যে লুকিয়ে থাকে প্রাণীর জীবনরহস্য বা জিন নকশা। ডিএনএ আবার গঠিত হয় কোটি কোটি জেনেটিক লেটার বা নিউক্লিওটাইড দিয়ে। তবে সুবিধা হলো, মাত্র চারটি ইউনিটে এগুলোকে আলাদা করে ফেলা যায়— অ্যাডেনিন, থাইমিন, গুয়ানিন ও সাইটোসিন। সহজে বোঝার জন্য আমরা প্রথম অক্ষর ধরে A, T, C আর G নামে ডেকে থাকি। এগুলো কিভাবে সাজানো তার ওপর নির্ভর করে প্রাণের বৈশিষ্ট্য। যেমন ধরুন, স্টপ (STOP) একটি শব্দ। একে ঘুরিয়ে টপস (TOPS) বানাতে পারেন, আবার স্পট (SOPT) বানাতে পারেন অথবা পোস্ট (POST)। প্রতিটিরই কিন্তু আলাদা অর্থ। প্রথমটিরই আলাদা পরিচয় রয়েছে। প্রথমটি যেমন পোশাক, দ্বিতীয়টি স্থান নির্দেশ করে। তৃতীয়টি দিয়ে পদ বা কর্মস্থলও বোঝানো হয়। এই এ টি সি আর জি কিভাবে সাজানো আছে তা জানার জন্যই আমরা যে কাজ করি সেটাকেই বলে জিনোম সিকোয়েন্সিং। ইলিশের জীবনে কিন্তু নানা রহস্য আছে। সমুদ্র থেকে নদীতে আসে, নদী থেকে আবার সমুদ্রে যায়। অথচ সমুদ্রের মাছ মিঠা পানির নদীতে অথবা মিঠা পানির মাছ লবণাক্ত সমুদ্রে যেতে পারে না। কিভাবে এই আসা-যাওয়া ইলিশ নিয়ন্ত্রণ করে? তারপর আছে ইলিশের রোগ-বালাই, আছে ভিন্ন স্বাদ ইত্যাদি। জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে এগুলোসহ আরো অনেক কিছুই জানা যাবে।             

 

কিভাবে কাজটা করা হয়?

ডিএনএকে প্রথমে কোষ থেকে বের করে নিতে হয়। প্রাণীভেদে কোষ ভিন্ন ভিন্ন হয়। তবে মানুষ-মাছ যাই হোক, সবার নিউক্লিওটাইড ওই চারটি ইউনিটেই থাকে। প্রথমে বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা ঠিক করি কোষটাকে কিভাবে ভাঙব। পুরো জিনোম সিকোয়েন্সিং করতে ডিএনএ নিতে হয় নিউক্লিয়াস থেকে। তাই সাবধান থাকতে হয় যেন ডিএনএটা অক্ষত থাকে। ডিএনএ সংগ্রহ করার পর কয়েক রকম পদ্ধতিতে সিকোয়েন্সিং করা যায়। আমরা করেছি ইলুমিনা (Ilumina) আর প্যাকবায়ো (PacBio)—এই দুই পদ্ধতিতে। আমরা ৩১ হাজার ২৯৫টি জিন খুঁজে পেয়েছি, তা ইলিশের মোট জিনের ৯২ শতাংশ বলে নিশ্চিত হয়েছি। উল্লেখ্য, ইলিশের ডিএনএর ১০০ কোটি নিউক্লিওটাইডের (ডিএনএর জেনেটিক লেটার) বিন্যাস জানতে পেরেছি। এগুলোকে বিন্যাস করার পর বোঝা যায় ইউনিটগুলোর (A, T, C ও G ) প্যাটার্ন। আর সেটাই জিনোম সিকোয়েন্সিং। তবে কাজটি সময়সাপেক্ষ আর শক্তিশালী কম্পিউটারের সাহায্য নিতে হয়।

 

পদ্মার ইলিশ আর মেঘনার ইলিশ কি আলাদা?

দেখুন, ইলিশ সমুদ্রে বাস করে। সমুদ্র থেকে নদীতে আসে প্রজনন করতে। নদী থেকে মা ও শিশু ইলিশ (জাটকা) আবার ফিরছে সমুদ্রে। সব প্রাণীর  ডিএনএ আমৃত্যু একই থাকে। ডিএনএর কোড পরিবর্তনের সুযোগ প্রকৃতি রাখেনি। তাহলে বোঝা যাচ্ছে ইলিশের জীবনরহস্য জটিল। আমাদেরও প্রশ্ন, প্রজনন করতে আসা কিছু ইলিশ কি পদ্মায় বা হাওরে থেকে যায়? সমুদ্র থেকে মেঘনার ইলিশ কি আবার মেঘনায় ফিরে যায় না? কিংবা পদ্মার ইলিশ পদ্মায়? না গেলে কেন যাচ্ছে না? যেগুলো যায় সেগুলো কেন যায়? জিন নকশা আমাদের এর উত্তর পাইয়ে দেবে। তবে এর উত্তর পেতে হলে আরো কিছুকাল অপেক্ষা করতে হবে।     

 

ইলিশ কি তবে সত্যি বদ্ধ জলাশয়ে চাষ করা যাবে?

ইলিশ চাষ করতে কোন জায়গা (নদী না সমুদ্র) উপযুক্ত, আগে তা বের করতে হবে। সেই পরিবেশে কোন কোন বিষয় কার্যকর তা জানতে হবে। তবে এ প্রশ্নের উত্তর দিতে আরো সময় লাগবে।

 

এমন কাজের জন্য আমাদের এখানে পর্যাপ্ত সুযোগ কি আছে?     

প্রথম ব্যাপার হলো, আমরা কোনো ফান্ড ছাড়াই কাজ করেছি। সবাই বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেছে। আমাদের দেশে কোনো সুপার

কম্পিউটারও নেই। বড় বড় জিনোমকে অ্যাসেম্বল করার সুযোগ দেশে নেই। জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের কাজ করতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে ড. মং সানু মারমা ও তাঁর বন্ধু পিটারের মাধ্যমে এবং জিনোম অ্যাসেম্বল করার কাজটি করতে হয়েছে অস্ট্রেলিয়ায় ড. বাতেনের মাধ্যমে। দেশে এমন অনেক উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে, যার জিনোম সিকোয়েন্স জানতে এবং কাজে লাগাতে দেশেই এই কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

 

 

দুই দল গবেষক

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

অধ্যাপক সামছুল আলমের নেতৃত্বে এই দলে আরো ছিলেন পোল্ট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক বজলুর রহমান মোল্লা, বায়োটেকনোলজির অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম ও ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক গোলাম কাদের।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন অধ্যাপক হাসিনা খান। এই দলের দুজন প্রবাসে থাকেন। তাঁরা হলেন ড. মং সানু মারমা ও ড. এ কে এম আবদুল বাতেন। দেশে কাজ করেছেন প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ইলিশ-গবেষক অধ্যাপক এম নিয়ামুল নাসের এবং প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম, প্রভাষক ফারহানা তাসনিম চৌধুরী, গবেষক অভিজিৎ দাস, অলি আহমেদ, জুলিয়া নাসরিন, তাসনিম এহসান ও রিফাত নেহলিন।



মন্তব্য