kalerkantho


সৃজনশীল বাংলাদেশ

নতুন দুর্গেশনন্দিনী

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



নতুন দুর্গেশনন্দিনী

উইমেন ইনোভেশন ক্যাম্পে বিজয়ী হয়েছে দুর্গেশনন্দিনী। এখন এটির নির্মাণও শেষ। এটি একটি শিক্ষামূলক গেম। এর মাধ্যমে কিশোরীরা  যৌন, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও নিরাপত্তা বিষয়ে জানতে পারবে। এটি বানিয়েছেন চার তরুণ-তরুণী। উদ্যোক্তা প্রচেতা নাগের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

 

দুই বছর আগের কথা। প্রচেতা নাগ তখন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। পড়ার বিষয় কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল। প্রথম বর্ষ থেকেই স্বেচ্ছাসেবী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস লিডার হিসেবে কাজ করতেন। সাইবার সিকিউরিটি, উদ্যোক্তা হওয়ার উপায়সহ নানা কর্মশালার আয়োজন করেছেন। এসব করতে গিয়ে দেখেছেন নাম লিখিয়েও অনেক ছাত্রী কর্মশালার দিন অনুপস্থিত থাকছে। কারণ খুঁজতে গিয়ে জানলেন পিরিয়ড চলার কারণে তারা ক্যাম্পাসেই আসেনি। দেখা যেত অনেকের পেটে ব্যথা হচ্ছে, কিন্তু ডাক্তারের কাছে যাচ্ছে না; এমনকি দোকান থেকে স্যানিটারি প্যাড কিনতে ‘লোকে কী বলবে’ এই ভয় কাজ করত।

পিরিয়ড চলাকালে নিজেদের অপবিত্রও মনে করত। তখন ফেসবুকে দেখতেন পৃথিবীর অন্যান্য দেশে মেয়েদের ঋতুচক্র বা বয়ঃসন্ধিকালের পরিবর্তন নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে স্বেচ্ছাসেবীরা নানা কার্যক্রম চালায়। বলিউডে এ নিয়ে সিনেমাও হয়েছে। প্রচেতা ইন্টারনেট থেকে জানলেন, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কিশোর বয়সী, যার মধ্যে ১৪ লাখই মেয়ে।  বললেন, ‘বয়ঃসন্ধিকাল নিয়ে এই মেয়েদের রয়েছে অনেক প্রশ্ন ও কৌতূহল; কিন্তু তারা কারো কাছে সেটা খুলে বলতে পারে না, এমনকি মায়ের কাছেও না। নিজেদের মধ্যেও এ নিয়ে আলাপ করতে চায় না তারা। যেন এটা নিষিদ্ধ কোনো বিষয়। ভুল ধারণার কারণে তাদের জীবন বিপর্যস্তও হয়। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; কিন্তু ভালো ফল পাওয়া যায়নি। অনেক কারণের মধ্যে একটি কারণ এগুলোর শিক্ষণ পদ্ধতি একঘেয়ে ও ক্লান্তিকর।’

প্রচেতা ভাবলেন, নতুন কিছু করতে হবে। যেন এই স্পর্শকাতর অথচ দরকারি বিষয়ে মেয়েরা জানতে পারে। ভুল ধারণা ভাঙে। জোর করে চাপিয়ে দিলে হবে না। এমন একটা কিছু করতে হবে, যা থেকে কিশোরীরা আনন্দের সঙ্গে শেখে। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে বান্ধবীদের সঙ্গে ভাবনার বিনিময় করলেন। দেখলেন, অনেকে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে অস্বস্তিবোধ করছেন। এড়িয়ে যেতে চাইছেন। অনেকে বলছেন, এ নিয়ে আমাদের কথা বলতে লজ্জা লাগছে। প্রচেতা ভাবলেন, তাহলে পাবলিক স্পেসে কিভাবে বলা যাবে? হাল ছাড়লেন না প্রচেতা। রাহাতারা ফেরদৌসী ও নিপা খাতুন—দুজনকে পাওয়া গেল, যাঁরা মনে করেন এটা নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা দরকার। 

সে সময় দেশব্যাপী শুরু হয়েছিল উইমেন ইনোভেশন ক্যাম্প ২০১৬। সেখানে ‘কিশোরীদের সমস্যার ক্ষেত্র’ ক্যাটাগরিতে কিশোরীদের বয়ঃসন্ধিকালীন সমস্যার সমাধান বিষয়ে আইডিয়াটা জমা দিলেন প্রচেতারা। নির্বাচকদের আইডিয়াটা পছন্দ হলো। বিভিন্ন ধাপ উতরে চলে গেলেন ফাইনালে। সেখানে কিশোরীদের বয়ঃসন্ধিকালীন সমস্যা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে একটা গেমের কথা বললেন তাঁরা। নাম  রাখলেন দুর্গেশনন্দিনী। প্রচেতা জানালেন, দুর্গেশনন্দিনী কিশোরীদের খেলায় খেলায় বয়ঃসন্ধিকালীন প্রয়োজনীয় তথ্য জানাবে।

ফাইনালের আগে কক্সবাজারের বিয়াম ফাউন্ডেশনে ছিল বুট ক্যাম্প। সেখানে প্রতিযোগী দলগুলো নিয়ে দুদিনের গ্রুমিং সেশনের আয়োজন করা হয়। দলগুলোর জমা দেওয়া প্রস্তাবনার খুঁটিনাটি দিক নিয়ে আলোচনা করেন বিশেষজ্ঞরা। শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত হয় দুর্গেশনন্দিনী। গত বছরের জুনে এ টু আইয়ের সার্ভিস ইনোভেশন ফান্ড ৯-এ অর্থায়নে নির্বাচিত হয় প্রকল্পটি। মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের অধীনে আট লাখ টাকা মঞ্জুর হয় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য। প্রচেতাসহ চার সদস্যের দল বছরখানেক ধরে খেটে কাজটি শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। প্রচেতা ছাড়া বাকি তিনজন হলেন রাহাতারা ফেরদৌসী, নিপা খাতুন ও শুভ্র সরকার। সার্বিক তত্ত্বাবধান করেছেন এ টু আই ইনোভেশন টিমের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার তাসলিমা ইয়াসমিন জেনি। প্রচেতা বলেন, ‘আমরা এমন একটি গেম ডেভেলপ করতে চেয়েছি, যেটি দিয়ে কিশোরীরা খেলতে খেলতে শিখবে।’

 

যেভাবে কাজ করবে

গেমটিতে মোট আটটি লেভেল। প্রতিটি লেভেলে তিনটি করে ধাপ থাকবে। প্রথম ধাপে ঋতুকালীন স্বাস্থ্য সচেতনতা, বয়ঃসন্ধিকালীন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন বা বাল্যবিয়ের কুফলকে গ্রাফিকসের মাধ্যমে গল্প আকারে তুলে ধরা হচ্ছে। পরের ধাপে থাকছে ওই গল্পের ওপর ভিত্তি করে পাজল, ইমেজ ম্যাচিংয়ের মতো খেলা। তৃতীয় বা শেষ ধাপে থাকছে গল্পসংক্রান্ত কুইজ। একটি লেভেলের সব ধাপ সম্পন্ন করতে পারলে পরের লেভেলে পৌঁছানো যাবে। প্রতিটি লেভেলেই তুলে ধরা হবে কিশোরীদের বয়ঃসন্ধিকালীন যৌন ও স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক নানা বিষয়। এভাবে গেইম খেলতে খেলতে সব বিষয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবে তারা। মোবাইলে খেলার উপযোগী গেমটি গুগল প্লেস্টোর থেকে বিনা মূল্যে ডাউনলোড করে খেলা যাবে। ইন্টারনেট না থাকলেও খেলতে অসুবিধা হবে না। আগামী মাসে গেমটি গুগল প্লেস্টোরে ছাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রচেতা জানালেন, মহিলা অধিদপ্তরের সহায়তায় গেমটি নিয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে তাঁদের।

 

এখন প্রচেতা

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। এখন নিজেই একটি স্টার্টআপ কম্পানি খুলেছেন। নাম জয়স্টিক ল্যাব। এখন সেখানেই সময় দিচ্ছেন। উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি নিয়ে বিদেশে যেতে চান তিনি।

 



মন্তব্য