kalerkantho


ইলিশ ধরার দিনগুলো

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ইলিশ ধরার দিনগুলো

এম এ ফাতিমা ট্রলারের প্রধান মাঝি আবদুল মান্নান। তাঁর কাছ থেকে সোহেল হাফিজ শুনেছেন ইলিশ ধরার দিনগুলোর কথা

 

কমপক্ষে সাত-আট দিনের জন্য যাই গভীর সাগরে। প্রধান মাঝি, দ্বিতীয় মাঝি, বাবুর্চি, ইঞ্জিন মিস্ত্রি এবং সাধারণ শ্রমিক মিলিয়ে একেকটি ট্রলারে ১৮ থেকে ২০ জন জেলে থাকে। চাল-ডাল, মুরগি, আলু, পটোল, শাকসবজি ইত্যাদি বাজার করে নেই ৮-১০ দিনের হিসাব করে। ইঞ্জিনের জন্য তেল নেই প্রায় দেড় হাজার লিটার। বরফও নিতে হয়। কম করেও দেড় শ ক্যান। বিশেষ এই ক্যানগুলো বরফ গলে যাওয়া ঠেকায়। একেকটি ক্যানের ওজন ৩০ থেকে ৪০ কেজি। রান্নাবান্নার জন্য চার থেকে পাঁচ মণ জ্বালানি কাঠও নিতে হয়। পর্যাপ্ত খাবার পানিও নিতে হয়। আরো নেই গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ, ব্যথার ওষুধ ইত্যাদি। এ ছাড়া থাকে জাল, দড়ি, বয়া ইত্যাদি।

 

ট্রলারের কথা  

স্রোতের বিপরীতে ঘণ্টায় ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার বেগে চলতে পারে আমাদের ট্রলার। স্রোতের অনুকূলে চলে ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার। সাধারণত মিত্সুবিশি, সুজুকি, ইসুজু ইত্যাদি কম্পানির রিকন্ডিশন ইঞ্জিন লাগানো হয় ট্রলারে। ইঞ্জিনগুলো ১৪০ থেকে ২৯০ হর্স পাওয়ারের হয়ে থাকে। জাল, দড়িসহ একেকটি ট্রলার তৈরিতে খরচ পড়ে ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা।

 

সাগরে যাই

ইলিশের ঝাঁকের সন্ধানে সাগরের ২০০ কিলোমিটার গভীরেও চলে গেছি কোনো কোনোবার। সাগরের ঠিক কোনখানে মাছ আছে বুঝতে অভিজ্ঞতা লাগে। মূল মাঝিই বুঝতে পারেন বেশি। পানির রং, স্রোত আর ঢেউয়ের গতি দেখে ইলিশের অবস্থান বুঝতে হয়। কখনো মাছগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে দল বেঁধে ওপর দিয়ে যায়, কখনো বা পানির বেশ নিচ দিয়ে। আমি এগুলো বুঝতে শিখেছি বাবার কাছ থেকে।

 

জাল ফেলে বসে থাকি

একেকবার জাল ফেলে অপেক্ষা করতে হয় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। সাগর বেশির ভাগ সময়ই উত্তাল থাকে। তাই ইঞ্জিন চালু রাখতে হয়। নয় তো স্রোতের তোড়ে ট্রলার ঘুরে যায়। জাল ফেলা আর ওঠানোর সময় ট্রলারের সামনেও একটা বিশাল লোহার বৈঠা ফেলে রাখি, যেন পজিশন ঠিক থাকে। এ কাজটা কঠিন। সবাইকে হাত লাগাতে হয়। আসলে গভীর সাগরে ট্রলারের সবাইকেই সব সময় ব্যস্ত থাকতে হয়। বিশাল ওই বৈঠাকে আমরা ‘ফিশ’ বলি। একেকটি ফিশের ওজন হয় দুই থেকে তিন মণ। কোনো কোনো ট্রিপে চার হাজার ইলিশও পাই। ধরার পর আকার ও ওজন অনুযায়ী আলাদা আলাদা ভাগে সাজিয়ে রাখি। দাম নির্ভর করে আকার ও ওজনের ওপর।

 

এমনও হয়

কদাচিৎ হয় এমন। বিশাল ইলিশের ঝাঁক জালে আটকা পড়লে তা আর তোলা সম্ভব হয় না। বাধ্য হয়ে তখন জাল কেটে দিতে হয়। আবার এমনও হয়েছে, এত বেশি মাছ ধরা পড়েছে যে একটি ট্রলারে বহন করা সম্ভব হচ্ছিল না। আমার জীবনে দুবার এমন ঘটনা ঘটেছে। তখন সাগরে ফেলে আসতে হয়েছে। সাধারণত ভাদ্র আর আশ্বিন মাসের ঝিরঝির বৃষ্টিতে ইলিশের দেখা মেলে বেশি। ট্রলার ভরে উঠলে আমরা উপকূলের দিকে রওনা হই। অনেক সময় খাদ্য সংকট আর বৈরী আবহাওয়ার কারণেও তড়িঘড়ি রওনা হতে হয়।

 

রেডিও রাখি

সাগরে দিকনির্ণয়ের জন্য ট্রলারে কম্পাস রাখি। থাকে রেডিও। জাল ভাসিয়ে রাখার জন্য ছোট ছোট প্লাস্টিকের বলের মতো যে ফ্লুট বা ভাসা ব্যবহার করি, তা বিপদের সময় লাইফ জ্যাকেটের কাজ দেয়। গভীর সাগরে মোবাইল নেটওয়ার্ক কাজ করে না। তখন রেডিও মারফত আবহাওয়ার খবর জানতে পারি।

 

বছরটা মন্দা যাচ্ছে

পর পর কয়েক ট্রিপে আশানুরূপ মাছ পাইনি। আসলে বৈরী আবহাওয়ার কারণে মাছ ধরতে পারিনি। মালিকের প্রায় চার-পাঁচ লাখ টাকা এরই মধ্যে খরচ হয়ে গেছে। মাছ পাইনি বলে আমাদের ভাগেও বেশি কিছু জোটেনি। বাড়ছে দেনা মালিকের। দেনা বাড়ছে আমাদেরও। ১০ আনি ছয় আনি ভাগে মাছ ধরি  আমরা। মাছ ধরার পর বিক্রি করে সব খরচ মিটিয়ে যে লাভ থাকবে তার ১০ আনি পায় মালিক, আর আমরা সব জেলে পাই ছয় আনি। অর্থাৎ সব খরচ মিটিয়ে এক লাখ টাকা লাভ হলে মালিক পাবে ৬২ হাজার ৫০০ টাকা। আর আমরা স্টাফরা পাব ৩৪ হাজার ৫০০ টাকা। এই ৩৪ হাজার ৫০০ টাকার আবার ভাগ হবে ২১টি। যার তিন ভাগ পাব আমি, কারণ আমি প্রধান মাঝি। দেড় ভাগ পাবে ‘হলা’ মাঝি বা দ্বিতীয় মাঝি। দেড় ভাগ পাবে বাবুর্চি। দেড় ভাগ পাবে ইঞ্জিন মিস্ত্রি। আর বাকি সব সাধারণ শ্রমিকরা পাবে এক ভাগ করে। কোনো কোনোবার ১০ লাখ টাকাও লাভ হয়। তবে সেটা এক-দুবার। সাধারণত দুই-তিন লাখ টাকা লাভ হয়। আমাদের ট্রলারটা মাঝারি মাপের।  

 

দস্যু হানা দেয়

৪২ বছর বয়স আমার। বেশ কয়েকবার জলদস্যুদের খপ্পরে পড়েছি। একবার ছাড়া পেতে এক লাখ টাকা দিতে হয়েছিল। আরেকবার পালিয়ে আসতে পেরেছিলাম। তবে সেবার সুন্দরবনের গভীরে জলদস্যুদের আস্তানায় দিনের পর দিন খেয়ে না খেয়ে থেকেছি। তখন যতবারই নূরজাহানের (আমার স্ত্রী) চেহারাটা ভেসে উঠেছে ততবারই কান্নায় ভেঙে পড়েছি। ভেবেছি, মারা গেলে আমার ছোট দুই ছেলে-মেয়ের কী হবে? ওদিকে আমার বৃদ্ধ মা-বাবাও চিন্তায় নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন। আর ঝড়ের কবলে পড়ে গভীর সাগরে ট্রলার ডুবে দিনের পর দিন ভেসে থাকতে দেখেছি কত জেলেকে। নিজ হাতে উদ্ধার করেছি অনেককে। লাশও ভাসতে দেখেছি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে দরিদ্র জেলে পরিবারটির দশা আরো করুণ হয়। বৃদ্ধ মায়ের চোখ ঘোলা হয়ে আসে। স্ত্রী হয়ে যান দিশাহারা। তার পরও বেঁচে থাকার তাগিদে আবার জাল, দড়ি সাজিয়ে ট্রলারে গিয়ে উঠি। শত শত লিটার তেল ভরে ইঞ্জিন স্টার্ট করি। ট্রলারের খন্দে তুলি বরফ। আবারও যাই সেই গভীর সাগরে। তবে এটা সত্য, চকচকে রুপালি ইলিশের ঝাঁক দেখে আবার সব ভুলে যাই।

 

ভালো লাগে জোছনা রাত

ইলিশের ঝাঁকে আমাদের চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক ওঠে। ভালো লেগে যায় সীমাহীন সাগর, নীল আকাশ, জোছনা রাত। বনটাকে ভালো লাগে। তার প্রাণীগুলোকে ভালো লাগে। আসলে সাগরের মন ভালো থাকলে ভালো থাকে আমাদের মনও। তখন গান গাই। চা খাই। মন চাইলে তাজা ইলিশ ভেজে খাই মুড়ি দিয়ে। গল্প করি। গল্প শুনি। আমাদের ট্রলারে আমিসহ ১৮ জন শ্রমিক রয়েছি। আমাদের মধ্যে ৬০ বছরের বৃদ্ধও আছেন। সবার বাড়িই বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে। আমাদের ট্রলারে জসীম নামে একটি ছেলে আছে। ওকে দেখলে বাবার কথা মনে পড়ে। সেই প্রথম যখন বাবার সঙ্গে ট্রলারে উঠেছিলাম, তখন আমি ওর চেয়েও ছোট ছিলাম। দরিদ্র মা-বাবার বড় ছেলে জসীম। স্কুলবেলার এই বয়সে জীবন বাজি রেখে গভীর সাগরে ভাসছে। সাধারণ শ্রমিক থেকে হলা মাঝি, তারপর একদিন সে প্রধান মাঝি হয়ে হয়তো ট্রলারের চুকান (হাল) ধরবে।

 

মান্নানের কথা কিছু

আমার নামেই নাম। আ. মান্নান। সাধারণ শ্রমিক। বয়স ৬০ বছর। বাবুর্চির সহকারী। সবাই মজা করে সিনিয়র স্টাফ বলে ডাকে। তিনিও তাতে আনন্দ পান। আবার নিজেই বলেন, ‘কাম করি লেবারি, হ্যার আবার সিনিয়র, জুনিয়র কী? আমরা সবাই সমান। দ্যাও একটা বিড়ি খাই।’ আমাদের ট্রলারের বাবুর্চির নাম বাদল মিয়া (৪৩)। অনেক ভালো রান্না করে। তার হাতের ইলিশ ভাজা যে একবার খেয়েছে সে অবশ্যই মনে রাখবে। তিন বেলায়ই ভাত খাই আমরা। সকালে বেশির ভাগ সময় খাই পান্তা ভাত। সঙ্গে থাকে ইলিশ। কখনো বা অন্য সামুদ্রিক মাছ। সাগরে যাওয়ার সময় কিছু মুরগিও সঙ্গে নিই। আমাদের বোটের দ্বিতীয় প্রধান মাঝির নাম রুস্তম আলী। আমি যখন বিশ্রামে থাকি কিংবা ক্লান্ত হয়ে পড়ি, তখন সে ট্রলারের দায়িত্ব্ব নেয়। সাত-আট দিন ধরে একেকটি ট্রিপ চলে। বেশির ভাগ সময়েই জাল ফেলা, জাল তোলা, জাল মেরামত, মাছ তোলা, বরফের খন্দে মাছ সংরক্ষণ ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়।

 

এ বড় আজব জীবন

একবার যারা ইলিশ ধরার কাজে লেগেছে, তারা আর বের হতে পারেনি। আমিও অনেকবার চেয়েছি অন্য পেশায় চলে যাব। কিন্তু পারিনি। আসলে তো অন্য কাজ জানিও না। তা ছাড়া সব সময়ই মালিকের কাছে দেনা থাকে। এটা কখনো শোধ হয় না। এখানকার অভিজ্ঞতা অন্য কোথাও লাগানোর সুযোগ নেই। প্রধান মাঝি বলে সম্মানও পাই ভালো। যারা সাধারণ শ্রমিক তাদের অবস্থা আরো করুণ। রোগ-শোক আর বালা-মসিবতে ভরপুর জেলে জীবন। যে দুই পয়সা রোজগার তার দ্বিগুণ খরচ ওষুধ-বড়িতে। এরই মধ্যে আসে ঈদ। প্রতিবারই বাবার জন্য একটি লুঙ্গি, বৃদ্ধ মা অথবা স্ত্রীর জন্য একটি নতুন শাড়ি আর ছোট ছেলে-মেয়েদের জন্য সামান্য জামা-কাপড়। ইলিশের আকালে অনেক সময় সেগুলো স্বপ্নই থেকে যায়।         

 

ছবি : লেখক

 



মন্তব্য