kalerkantho


লোকনায়ক

গরিবের ডাক্তারনী

লিপা খানম কোনো টাকা-পয়সা নেন না। গরিবের ডাক্তারনী বলে তাঁকে ডাকে সবাই। মৌলভীবাজারের জুড়ি উপজেলার ভোগতেরা কমিউনিটি ক্লিনিকের তিনি প্রসবকর্মী। দেখা করেছেন লিটন শরীফ

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



গরিবের ডাক্তারনী

ক্লিনিকটি জয়ফরনগরে। লিপার বাড়ির পাশেই। ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠা। ২০১২ সাল থেকে এখানে প্রসব করানোর কাজ শুরু হয়। এখানে এখন পর্যন্ত কোনো প্রসূতি বা নবজাতকের মৃত্যু ঘটেনি। দিনকয়েক আগে ৫০১তম শিশুর স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে। এর মধ্যে লিপার মাধ্যমে হয়েছে ২৪৯টি। জুড়ি উপজেলার মানুষের চিন্তা অনেকটাই দূর করতে পেরেছে ভোগতেরা কমিউনিটি ক্লিনিক। গরিবের হাসপাতাল নামে পরিচিত হয়েছে।

 

৫০১তম শিশুটি

৪ সেপ্টেম্বর ছিল মঙ্গলবার। লিপার হাতে ৫০১তম শিশুটির স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে। লিপার আগে জুলেখা বেগম ছিলেন এখানকার প্রসবকর্মী। তিনি আরেক জায়গায় চলে যাওয়ার পর লিপা দায়িত্ব নেন। বিনা পারিশ্রমিকে কাজটি করেন লিপা। খুশি হয়েই করেন। বললেন, ‘সংকটকালে মানুষের পাশে থাকতে পারি, এটাই বড় কথা।’ লিপার বয়স এখন ৩২। যত দিন বেঁচে থাকবেন এ কাজ করে যেতে চান লিপা।

 

বলছিলেন লিপা

আমার নিজের প্রথম বাচ্চা হয় ২০০৮ সালে। ওই দিন আমি বাড়িতে একা ছিলাম। রাত ২টার দিকে আমার মেয়ের জন্ম হয়। তবে একজন ধাই আমাকে সাহায্য করেছেন। প্রসবের সময় যেসব উপকরণ লাগে সেগুলোও কাছেপিঠে ছিল না। ছিল না নাড়ি বাঁধার সুতাও। ডোরা (কাপড় ছিঁড়ে বানানো রশি) দিয়ে ধাই নাড়ি বেঁধেছিলেন। মেয়েটার (বাচ্চার) অনেক ক্ষতি হয়েছিল। ছয় দিন সেভাবে বুকের দুধও খায়নি। রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। কুলাউড়ায় মিশন হাসপাতালে  ভর্তি করিয়েছিলাম মেয়েকে। সাত দিন ইনকিউবেটরে ছিল। তবে ২০১২ সালে আমার দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয় এই ক্লিনিকে (ভোগতেরা) জুলেখা আপার হাতে। আমি তখন থেকে জুলেখা আপার মতো হতে চেয়েছি।

 

প্রশিক্ষণ নিলেন

২০১৪ সালে কমিউনিটি স্কিলড বার্থ অ্যাটেনডেন্ট (সিএসবিএ) হওয়ার প্রশিক্ষণ নেন লিপা হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে। প্রশিক্ষণ শেষে পরীক্ষা হয়। পাসও করেন লিপা। ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ক্লিনিকে কাজ করা শুরু করেন। ৩ সেপ্টেম্বর ৫০০তম শিশুটিরও নিরাপদ প্রসব তাঁর মাধ্যমে হয়েছে। শিশুটির মায়ের নাম লাকি বেগম। বয়স ২৬। বাড়ি বড়লেখার মাধবকুণ্ড খলাগাঁও গ্রামে। লাকি বেগম ভোগতেরা ক্লিনিকের কথা জানতে পারেন বান্ধবী নাজমীন বেগমের কাছে। নাজমীন এ ক্লিনিকের ৪৯৩তম শিশুর মা। তাঁর বাড়ি বড়লেখার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের বিছরাবন্দ গ্রামে। বলছিলেন লিপা, ‘লাকি বেগম দুপুর ১টার দিকে এসে ভর্তি হন। ওই দিন (৩ সেপ্টেম্বর) বিকেল সোয়া ৫টায় তাঁর স্বাভাবিক প্রসব হয়।  খুব আনন্দ পেয়েছিলাম ওই দিন। ৫০০তম শিশুর ডেলিভারি! সবাই আনন্দ পেয়েছে। আমাদের এখানে ফেঞ্চুগঞ্জ থেকেও রোগী আসে। আসে সিলেট থেকেও। সব রোগীর যত্ন নিতে পেরেছি। এটা অনেক আনন্দের। আমি ২৫৩ নম্বর থেকে ডেলিভারি শুরু করেছিলাম। জুলেখা আপা ২৫২ নম্বর পর্যন্ত করে গেছেন।’

এ জীবন যেমন

প্রথম দিকে ক্লিনিকে সরকারি ওষুধ আসত; কিন্তু এখন আসে না। অনেক সময় খুব গরিব রোগী আসে। লিপা নিজের টাকা থেকে ওষুধও কিনে দেন। রাত গভীর হলে স্বামীকে ওষুধ আনতে পাঠান। স্বামী এ কাজে লিপাকে অনেক সাহায্য করেন। স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি বাড়ি গর্ভবতী নারীর খোঁজখবরও নেন। বলছিলেন, ‘কাজটি করতে ভালো লাগে। অনেক গর্ভবতী খাওয়া, বিশ্রাম ইত্যাদি কোনো কিছুতেই সচেতন থাকেন না। তাঁদের বাড়ি গিয়ে পরামর্শ দিই। আমার শাশুড়িও এ কাজে সমর্থন দিচ্ছেন। কোনো পারিশ্রমিক পাই না, তাতে মন খারাপ করি না, তবে ওষুধ জরুরি। সরকারের কাছ থেকে এ ব্যাপারে সহযোগিতা চাই। এখানে যারা আসে বেশির ভাগই গরিব মানুষ। কোনো কোনো রোগীর ৫০০ থেকে ৭০০ টাকারও ওষুধ লাগে। ক্লিনিক থেকে বাজার আড়াই কিলোমিটার দূরে। রাত-বিরাতে সবাই টেনশনে থাকি। সিজার করতে হবে এমন রোগীকেও নরমাল ডেলিভারি করিয়েছি। কেউ কেউ খুশি হয়ে আমাকে অনেক বকশিশ দিয়েছেন। আমি বলি, দোয়া করবেন যেন সেবা করে যেতে পারি।’



মন্তব্য