kalerkantho


আরো জীবন

মুক্তার গানওয়ালা

বরেন্দ্র বা তিতুমীর এক্সপ্রেস ট্রেনে যাঁরা যাতায়াত করেন, তাঁরা তাঁকে ভালো করেই চেনেন। মুখে মুখে তাঁর নাম জঞ্জাল। মা-বাবার রাখা নাম মুক্তার হোসেন। রাজশাহীগামী বরেন্দ্র এক্সপ্রেস ট্রেনেই তাঁর দেখা পেয়েছিলেন মাসুদ রানা আশিক

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



মুক্তার গানওয়ালা

ছবি : লেখক

খুব ভোরে মুক্তার হোসেনের ঘুম ভাঙে। তারপর ভ্যানে চেপে চলে যান নাটোর রেলস্টেশনে। সেখান থেকেই তাঁর যাত্রা শুরু হয়। চড়ে বসেন চিলাহাটিগামী তিতুমীর এক্সপ্রেসে। জয়পুরহাটের আক্কেলপুর পর্যন্ত গিয়ে আবার বরেন্দ্র ট্রেনে চেপে যান রাজশাহী। মুক্তার হোসেন ট্রেনে ট্রেনে গান করেন। যে যা দেন তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেন। সন্ধ্যা হলে বাড়ি ফেরেন। প্রতিদিনই একই রুটিন। ব্যতিক্রম শুধু বুধ আর রবিবার। কারণ বুধবারে তিতুমীর আর রবিবারে বরেন্দ্রর সাপ্তাহিক বন্ধ। এই দুই দিন মুক্তার হোসেন নাটোর সদর বাজারে গান করেন।

 

মুক্তার হোসেনের পরিচয়

নাটোর সদর উপজেলার তেবাড়িয়ার কাছারীগাছায় বাড়ি মুক্তারের। জন্ম ১৯৬২ সালে। চোখে সমস্যা নিয়েই জন্মেছিলেন। অল্প দূরের জিনিসও দেখতে পান না। কাছেও যতটা দেখেন ঝাপসা। দিনমজুর বাবা অনেক ডাক্তার দেখিয়েছিলেন; কিন্তু লাভ হয়নি। ডাক্তারও বলে দিয়েছিলেন, এই চোখ দুটির আশা নেই। তার পর থেকেই সংগ্রাম শুরু তাঁর। তিন ভাই-দুই বোনের মধ্যে মুক্তার হোসেন দ্বিতীয়। বোন দুটির বিয়ে হয়ে গেছে। দুই ভাই থাকেন ঢাকায়। কেউ খবর নেন না মুক্তারের।

মুক্তার হোসেনের সম্পদ বলতে একটি একতারা আর একটি ঢোল। একতারা হাতে থাকে। আর ঢোল রাখেন কাঁধে ঝোলানো একটি ব্যাগে। যখন গান করেন তখন ঢোলটি বের করে একতারা আর ঢোল বাজিয়ে গান করেন। মাথার চুল বড় তাঁর। গায়ে রাখেন একটি সাদা উত্তরীয়। চোখে পরেন রঙিন চশমা। গান করেন মন-প্রাণ ঢেলে।

 

জানতে চাইলাম

গানের সঙ্গে সখ্য হলো কবে, কিভাবে?

সেই ছোটবেলায় একবার গিয়েছিলাম কুষ্টিয়ায়। এলাকার আরো বন্ধুরা ছিল সঙ্গে। লালন উৎসবে পরিচয় হয় মনছুর শাহ নামের একজনের সঙ্গে। কিভাবে কিভাবে যেন মনছুর শাহের ভক্ত হয়ে গেলাম। তিনি খুব ভালো লালনের গান করেন। আদর দিয়ে গান। তারপর থেকে অনেকবারই মনছুর শাহের কাছে গেছি। তাঁর কাছেই গান শিখেছি। এখনো কুষ্টিয়ায়ই থাকেন। কুষ্টিয়ায় গেলে তাঁর সঙ্গে দেখা না করে আসি না।

 

কথাও বলেন মুক্তার

মুক্তার হোসেন ট্রেনে যে শুধু গান করেন তা কিন্তু নয়, অনেক কথাও বলেন; বিশেষ করে লালনকে নিয়ে। লালনের গান নিয়ে। মানুষকে ভালোবাসার কথাও বলেন। মুক্তার বলেন, ‘মানুষ মানুষকে ব্যথা দেয়। কেউ কারোর ভালো দেখতে পারে না। খুন পর্যন্ত করে ফেলে। অথচ মানুষ শ্রেষ্ঠ জীব। আমি সবাইকে বলি মানুষকে ভালোবাসো।’

 

শুরুটা ১৯৮২ সালে

নিজের নামও সই করতে পারেন না মুক্তার হোসেন। ছোটবেলায় পড়াশোনার চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু চোখের কারণে আর পড়তে পারেননি। মুক্তারের বয়স যখন ২০ বছর, তখন তাঁর বাবা মারা যান। তারপরই বিপদে পড়েন। ভাইয়েরা যে যার মতো আলাদা হয়ে যায়। বোনদের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল আগেই। মা ছিলেন সংসারে। মাকে কে দেখবে। তাঁর ভার নেন মুক্তার। সেটা ১৯৮২ সালের ঘটনা। একটি একতারা কিনে নাটোর স্টেশনে আসেন। গাইতে থাকেন লালনের গান। অনেকেই তাঁর গান শুনে দু-চার পয়সা দিতে থাকে। তা দিয়ে সংসার চলতে থাকে। তারপর একসময় ট্রেনে চেপে দূরে দূরে চলে যেতে থাকেন। তখন ছিল আমনুরা এক্সপ্রেস, উত্তরা মেইল, রকেট মেইল ও বেশ কয়েকটি লোকাল ট্রেন। মানুষ বেশি তখন ট্রেনেই চলাচল করত। রোজগারও বেশি ছিল। এখন সারা দিনে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা জমে। ঘরে তাঁর পাঁচটি সন্তান। মা-ও বেঁচে আছেন। 

 

কেন জঞ্জাল ডাকে

কেন আপনাকে সবাই জঞ্জাল বলে ডাকে?

হাশিমুখেই উত্তর দিলেন মুক্তার, প্রথম দিকে গান গাইতে উঠলে লোকে বলত, ‘এই যে জঞ্জাল (ঝামেলা) বাধাইতে আসছে।’ টাকা চাইলেও লোকে বলত, ‘জঞ্জাল বাধাস না তো—যা, সামনে থেকে যা।’ এভাবেই মুখে মুখে নাম জঞ্জাল হয়ে গেছে। আমার প্রথম দিকে খারাপ লাগত। এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি।



মন্তব্য