kalerkantho


যেখানে ভোর হলো

শূন্য দিল গোয়ালিয়র

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



শূন্য দিল গোয়ালিয়র

ভারতবাসী শূন্যের সন্ধান করে চলেছে সুপ্রাচীনকাল থেকে। গোয়ালিয়রের মন্দিরে তার প্রকাশও দেখা গেছে। বিবিসির প্রতিবেদনে নজর রেখেছিলেন বুশরা নাজরীন

 

গ্রিক বীর আলেকজান্ডার শুধালেন, মহর্ষি আপনি এখানে (মন্দিরে) কী করছেন?

মহর্ষি (সাধুপুরুষ) বললেন, শূন্য খুঁজছি।

এবার মহর্ষির প্রশ্ন—আপনি কী করছেন ভাই?

আলেকজান্ডার উত্তর দিলেন, আমি পৃথিবী জয় করছি।

দুজনেই দুজনের উত্তরে হেসে উঠেছিলেন বলে ধারণা করছেন পুরাণকাহিনি বিশারদ দেবদূত পট্টনায়েক। দেবদূত আরো জানিয়েছেন, দুজনের কাছেই বুঝি দুজনের কাজ নিরর্থক মনে হয়েছিল। এই নিরর্থক ব্যাপারটিই কিন্তু শূন্য, মানে অর্থহীন, মানে কিছুই না, মানে শূন্য। আর এই শূন্যের সন্ধান ভারতবাসী করছে সুপ্রাচীনকাল থেকে।

 

গোয়ালিয়রের মন্দিরে লাল চিহ্নিত শূন্য

গোয়ালিয়রে আসি

মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়র। অষ্টম শতকে একটি মালভূমির মতো জায়গায় একটি দুর্গ গড়ে উঠেছিল। এটি ভারতের অন্যতম বড় দুর্গ। দুর্গেরই এক জায়গায় পাথর দিয়ে তৈরি সুন্দর ছোট একটি মন্দির দেখতে পাবেন। নাম চতুর্ভুজ মন্দির। এই মন্দিরটি জিরো মানে শূন্যের বাড়ি।  এই মন্দিরে এখনো জিরো বা শূন্য বা ০ লেখা দেখতে পাওয়া যায় পরিষ্কার। বলা হয় লেখাটি নবম শতকের। গণিতশাস্ত্রে শূন্যের তাৎপর্য নতুন করে বলার কি আছে? সবাই জানে পদার্থবিজ্ঞান, কম্পিউটার বিজ্ঞান বা প্রকৌশলবিদ্যার বিকাশ সম্ভব হয়েছে শূন্যের কারণেই। আলেকজান্ডার ভারত জয় করতে এসেছিলেন গোয়ালিয়র মন্দির প্রতিষ্ঠার অনেক আগে। এ কারণে গবেষকরা বলছেন, শূন্যের খোঁজ এখানকার মানুষ আগে থেকেই করছিল। যেমন ধ্যানের কথা ধরুন। এর উদ্দেশ্য তো মনকে খালি করা। বৌদ্ধ আর হিন্দু ধর্মের লোকেরা ধ্যান করাকে ধর্মাচারের অংশ করে নিয়েছিল।

নেদারল্যান্ডসের জিরোঅরিজিনইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনের সচিব ড. পিটার গোবেটস বলছেন, শূন্যতার চর্চা বৌদ্ধরাই বেশি করে। তারা জাগতিক চাপ, তাপ, পাপ থেকে আলাদা হতে চেয়ে শূন্যের মাঝে ডুব দেয়।  

 

আর্যভট্ট

আর্যভট্টের কথাও আসে

বলা হয়ে থাকে, জ্যোতির্বিদ ও গণিতজ্ঞ আর্যভট্ট (জন্ম ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দ) ডেসিমালের (দশমিক ভগ্নাংশ) ধারণা দিয়েছিলেন প্রথম। পাটলিপুত্রে তিনি পড়াশোনা করেছেন। পাটলিপুত্রেই একটি মানমন্দির ছিল। তিনি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন বলেও অনেকে মনে করেন। বিহারের সূর্যমন্দিরেও তিনি একটি মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেকালে যে শূন্যের ধারণা ছিল, তার সাক্ষ্য দেয় বাখশালি পাণ্ডুলিপিও। এটি তৃতীয় বা চতুর্থ শতকের। তাতেও শূন্যের (ডটের মতো দেখতে) ব্যবহার দেখা যায়। ১৮৮১ সালে  পাণ্ডুলিপিটি পাওয়া গেছে পেশোয়ারের বাখশালি থেকে। এটি সংস্কৃতে লেখা গণিতশাস্ত্রেরই পাণ্ডুলিপি।  বীজগণিত ও পাটিগণিতের অনেক সূত্র এতে উল্লেখিত। জ্যামিতির কথাও আছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক মার্কাস দ্যু সাউটয় বলছেন, ‘বাখশালি পাণ্ডুলিপি গণিতের ইতিহাসকে বড় করেছে।  পৃথিবীকে শূন্য দিয়ে ভারত আধুনিক করেছে।’

 

পিঙ্গলা যুগ্ম সংখ্যার ধারণা দিয়েছিলেন

একটা প্রশ্ন আছে

পৃথিবীর অন্য কোথাও শূন্যতার চর্চা কেন হয়নি? গবেষকরা বলেন, ইউরোপে একসময় শূন্যের চর্চা নিষিদ্ধ ছিল। বিশেষত খ্রিস্টধর্ম প্রসারের শুরুর দিকে। মনে করা হতো, শূন্য হচ্ছে শয়তানের প্রতীক। অন্যদিকে ভারত শূন্যেরই খোঁজ করেছে, সাধনা ছিল মহাশূন্যে বিলীন হওয়ার।

 

লালবাগ উদ্যান

কম্পিউটার চলে বাইনারি (যুগ্ম) সংখ্যা দিয়ে। বাইনারি সংখ্যা গঠনে শূন্য অপরিহার্য। ভারতের বেঙ্গালুরু তো এক নয়া সিলিকন ভ্যালি। ইনটেল, গুগল, অ্যাপল, ওরাকল, মাইক্রোসফট, আমাজন, স্যামসাং ইত্যাদি সবারই অফিস আছে বেঙ্গালুরুতে। একসময় বেঙ্গালুরু ছিল বাগানের শহর। লালবাগ বোটানিক্যাল গার্ডেনের কথা যেমন বলা যায় এখানে। ১৭৬০ সালে এটি তৈরি হয়েছে। ১৭৬০ সালেই এটি নকশা করা হয়েছে। ১৫০ রকমের বাগান আছে এতে। যাহোক এখন এটি ভারতের সিলিকন ভ্যালি। পণ্ডিতরা মনে করেন, বাইনারি নাম্বার সিস্টেমের উদ্ভাবকও ভারত। ওকলাহোমা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুভাষ কাক বলছেন, পিঙ্গলা নামের এক গণিতজ্ঞ যুগ্ম সংখ্যার ধারণা দেন। তিনি দ্বিতীয় বা তৃতীয় শতকের মানুষ ছিলেন। তিনি লিখেছিলেন ছন্দশাস্ত্র। তিনি শূন্য, এক নয় লঘু, গুরু ইত্যাদি ব্যবহারের মধ্য দিয়ে বাইনারি ধারণার সূচনা করেন।



মন্তব্য