kalerkantho


তোমায় সালাম

মা-ই এখন সিদ্দিকুরের আলো

সরকারি তিতুমীর কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র সিদ্দিকুর রহমান। শাহবাগে পুলিশের টিয়ারশেলে চোখের আলো হারিয়েছেন বছরখানেক হলো। তাঁর মা এখন আলো হয়ে সিদ্দিকুরকে পথ দেখাচ্ছেন। দেখে এসেছেন শাখাওয়াত উল্লাহ

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



মা-ই এখন সিদ্দিকুরের আলো

সুলেমা খাতুন এখন সিদ্দিকুরকে পথ দেখান

সন্ধ্যা নামতে বেশি দেরি নেই। প্রচণ্ড ব্যস্ত তেজগাঁও সাতরাস্তার মোড়। আশপাশে জেব্রা ক্রসিং কিংবা ফুট ওভারব্রিজও নেই। একটু ফাঁক পেলেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে মানুষজন। কিন্তু এক তরুণ আর এক বয়স্ক মহিলা রাস্তার কিনারে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে, দেখছি বেশ কিছুক্ষণ ধরে। তরুণের পরনে সাদা রঙের পায়জামা আর প্রিন্টের পাঞ্জাবি। চোখে কালো চশমা। মহিলার পরনে বোরকা, মাথা ওড়নায় প্যাঁচানো। একটু পরে ট্রাফিক পুলিশের বাঁশি। এদিক থেকে গাড়ি বন্ধ হলে রাস্তা পার হলেন তাঁরা। রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলেন—

—সিদ্দিক মাস্টারের ঢাল যাইবেন?

—যামু?

—কত?

—২০ টাকা।

—চলেন। ওই মহিলা প্রথমে রিকশায় উঠলেন। তারপর তরুণের হাত ধরে বললেন, সিদ্দিক, আস্তে বাবা, আস্তে। সিদ্দিক উঠলেন। মা-ছেলেকে নিয়ে রিকশা চলতে শুরু করল। সিদ্দিক মাস্টারের ঢালে রিকশা থামল। সেখান থেকে পূর্বদিকে সরু একটা গলি চলে গেছে। সেই গলি ধরে কিছুদূর এগোলে হাতের ডানে পুরনো একটা বাড়ি। অনেকটা গুদামঘরের মতো, অন্ধকার। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলাম। সেখানে ছোট ছোট খুপরির মতো চারটি ঘর। ডানপাশের প্রথম ঘরটিতেই সিদ্দিক মাকে নিয়ে থাকেন। অন্য তিন ঘরে তিন পরিবার।

গত বছরের অক্টোবরে এসেনশিয়াল ড্রাগস কম্পানিতে টেলিফোন অপারেটর পদে যোগ দেন সিদ্দিকুর। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অফিস। সকাল সাড়ে ৭টায় সিদ্দিককে অফিসে দিয়ে এসেছিলেন মা সুলেমা খাতুন। এখন ফিরলেন। দরজা খুলে আমাকে বসতে বললেন। একটামাত্র খাট। সেখানে বসলাম। মা সিদ্দিকুরের হাতে টাওয়েল ধরিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকিয়ে দিলেন। ওয়াশরুমের বাতিটা জ্বালিয়ে দিলেন। যদিও এই বাতি এখন সিদ্দিকুরের জন্য নিষ্প্রয়োজন। আলো তো এখন শুধু মা। ওয়াশরুম থেকে বের হলে সিদ্দিকুরের হাতড়ানো হাতকে ধরে এনে খাটে বসালেন। লুঙ্গি দিলেন। পায়জামা পাল্টাতে বললেন। কিছুক্ষণ পর সিদ্দিকুরের ইচ্ছা হলো একটু পড়ার টেবিলে বসার। মা ধরে এনে বসিয়ে দিলেন।

তেজগাঁওয়ের ছোট্ট কুঠুরিতে মা-ছেলের সংসার। ছোট্ট রান্নাঘরে অন্য তিন পরিবারের সঙ্গে রান্না করতে হয়। থাকার ঘরের এক পাশে খাবারের ব্যবস্থা, একপাশে একটি খাট, একটি টেবিল, একটি কাঠের আলমারি। এই হলো সিদ্দিকুরের সহায়-সম্পত্তি।  প্রতিদিন ভোরে উঠেই নাশতা-পানির আয়োজন সেরে ছেলেকে নিয়ে ছুটতে হয় অফিস পানে। তারপর এসে বাজার, রান্না, দিনশেষে আবার সিদ্দিকুরকে নিয়ে আসা। ছেলেকে পরীক্ষার হলে নিয়ে যাওয়া, ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া—কত কাজ সুলেমা খাতুনের। অচেনা শহরের অলিগলি সব পথে ছুটতে হয় তাঁকে।

সুলেমা খাতুন এর আগে কখনো ঢাকায় আসেননি। যেদিন সিদ্দিকুরের অ্যাক্সিডেন্ট হয় তার পরদিন সন্ধ্যায় সুলেমা খাতুনকে খবর দেওয়া হয়। সেই তারাকান্দা থেকে ছুটে আসেন তিনি। ছেলের অবস্থা দেখে মূর্ছা গিয়েছিলেন। ‘জ্ঞান ফিরলে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে থাকেন। পরে তিনিই আবার সিদ্দিকুরকে সান্ত্বনা দেন। নীরবে কাঁদতেন কিন্তু ছেলেকে বুঝতে দিতেন না। ছেলেকে বোঝাতেন যে আমি মা হয়ে শক্ত আছি, তুমিও শক্ত হও বাবা। কিন্তু আমরা দেখতাম তিনি অনেক কেঁদেছেন। তাঁর বয়স এখন ষাটের ঘরে। এই বয়সে ছেলেকে নিয়ে ছুটতে হয় শহরের পথে-প্রান্তরে। যেখানে নিজে রাস্তা পার হতেই কষ্ট সেখানে একদিন বাস থেকে দেখলাম তিনি বহু কষ্টে ব্যস্ত সড়ক পার হচ্ছেন—বলছিলেন সিদ্দিকুরের বন্ধু ফরিদ।

সুলেমা খাতুন কখনো স্কুলে পড়ার সুযোগ পাননি। ছেলের রেজাল্টে দারুণ খুশি তিনি। মাসখানেক হলো সিদ্দিকুরের তৃতীয় বর্ষের ফল বেরিয়েছে। বললেন, ‘আমার ছেলে ফার্স্ট কেলাস পাইছে (সিজিপিএ ৪-এর মধ্যে ৩.০৬)।’

‘আমার বয়স যখন তিন বছর তখন বাবা মারা যান। বড় বোনের তখন বিয়ে হয়ে গেছে, আর বড় ভাই ক্লাস সেভেনে পড়েন। বাবা তো কৃষিকাজ করতেন। পারিবারিক অবস্থা খুব বাজে ছিল। মা-ই সংসার পরিচালনা করতেন। স্বভাবতই তিনি একটু এলোমেলো অগোছালো থাকতেন। একটা ইচ্ছা ছিল মাকে একটু সুন্দর রাখি, পরিপাটি রাখি। এখন চেষ্টা করি কিন্তু মা কেমন থাকে তা তো আর দেখতে পারি না। সেই ছোটবেলার মতো মা আগলে রাখছেন। তখন বুঝতে পারতাম না, আর এখন দেখি না, এই তফাত।’ বলতে বলতে সিদ্দিকুরের দীর্ঘশ্বাস আরো বড় হয়।

মাঝেমধ্যে হয়তো ময়মনসিংহ গিয়েছিলেন কিন্তু আগে কখনো যান্ত্রিক ঢাকায় আসা হয়নি সুলেমা খাতুনের। বললেন, ‘ময়মনসিংহ শহরে মইধ্যে-মইধ্যে আইছি, একলা চিনছি না। অহন একলা যাইতে পারি, যাইতে অয়। ছেলেরে লইয়া দ্যাশে গেছি। গেছি তিতুমীর কলেজে, ঢাকা ভার্সিটি গেছি। আদাবরে ছয় মাস কম্পিউটার শিখছে। গাড়ি দিয়ে নিয়ে গেছি। আল্লাই তো চিনায়। কেমনে চিনি আমি তো আর চিনি না। সিদ্দিকে বলে দেয় ইয়ানে যাইয়াম। আমি গাড়ি দেইক্কা উডি। গাড়িয়লায় নামায় দেয়। রিশকা দিয়া যাই এভাবে।’

স্বামীহারা সুলেমার যখন সুখের সময় দোরগোড়ায়, তখন শুরু হয় ঢাকায় টিকে থাকার নতুন যুদ্ধ। তাঁর শরীরেও রোগ দানা বাঁধছে। গলব্ল্যাডারে পাথরের অপারেশন করার কথা ছিল। করা হয়নি। এখন ওষুধ খেয়ে কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন।

রোগ-শোক-দুঃখ সুলেমা খাতুনকে এই বৃদ্ধ বয়সে কাবু করার চেষ্টা করছে। আর তিনি আপ্রাণ চেষ্টায় আছেন সিদ্দিকুরকে আগলে রাখতে। এরই মধ্যে রাত হয়ে গেল। মা ছেলেকে রেখে গলিতে বের হতে না-হতেই বিদ্যুৎ চলে গেল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ভয় পেয়ে গেলাম। সিদ্দিকুরের কথা মনে হতে ভয় কেটে গেল। মা তো আছেন। সিদ্দিকুরের এখন আর আলোর অভাব নেই।

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ



মন্তব্য