kalerkantho


সেদিন এলি ছোট্ট ছিল

আজও এলি চোখ বন্ধ করলে ওই দিনটাকে দেখতে পান। সেদিন বঙ্গবন্ধু রংপুরে ছিলেন। ১৯৭২ সালের মে মাস ছিল। জেনিফার এলি ছোট্ট তখন। বঙ্গবন্ধু তাঁর মাথায় হাত রেখেছিলেন। বলতে বলতে এলির কান্না পেয়ে যায়। বিনয় দত্ত আরো কিছুটা জানতে পেরেছেন

১১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



সেদিন এলি ছোট্ট ছিল

স্বাধীন দেশের উন্নয়নের জন্য বঙ্গবন্ধু দিন-রাত ছুটে বেড়াচ্ছেন। যাচ্ছেন জেলায় জেলায়। এসেছেন রংপুরেও। তাঁর ভাষণ শুনতে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ জড়ো হয়েছিল। বান্ধবী ইয়াসমিনের সঙ্গে গিয়েছিল এলিও। ভাষণ শুনে এলি মুগ্ধ। ভাবছিল, একবার যদি কাছ থেকে দেখতে পারতাম! পরদিন ছিল তাদের মর্নিং স্কুল। স্কুলে গিয়ে এলি জানল, বঙ্গবন্ধু রংপুরেই আছেন। সার্কিট হাউসে থাকছেন। ক্লাসে আর মন ছিল না তাঁর। ক্লাস শেষ হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। রাকা আপা, মিনা আপা আর সাহানাকে সঙ্গে নিয়ে এলি গেল সার্কিট হাউসে। সবার মধ্যেই ভয়—বকা না দেয়। ভয় পেতে পেতেই সার্কিট হাউসে হাজির হলো দলটি। গেটে পুলিশ দিল বাধা। এত কষ্ট করে এসে ফিরে যেতে হবে! শেষে দেয়াল টপকানোর সিদ্ধান্ত হলো। এলি ও তার দল পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে সত্যি দেয়াল টপকাল। ঢুকে গেল ভেতরে। একজন এসে জিজ্ঞেস করল, এই, তোমরা এখানে কী করছ?

এলি বলল, বঙ্গবন্ধুকে দেখতে চাই।

বঙ্গবন্ধু ভেতর থেকে কথাটি শুনতে পেয়েছিলেন। তিনি সবাইকে ডেকে পাঠালেন। রুমে তখন অনেক লোক। বঙ্গবন্ধু জানতে চাইলেন, কী চাও তোমরা?

এলি বলল, বঙ্গবন্ধুকে দেখতে চাই।

বঙ্গবন্ধু মজা করে বললেন, বঙ্গবন্ধু! কে বঙ্গবন্ধু?

এলি বলল, আপনিই তো বঙ্গবন্ধু। আমি আপনার অটোগ্রাফ নেব।

কিন্তু এলির কাছে কোনো কাগজ ছিল না। অটোগ্রাফ কোথায় নেবে? বঙ্গবন্ধু শেষে এলির ডান হাতটা টান দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান লিখে দিলেন। তারপর এলির মাথায় হাত বুলিয়ে আদরও করেছিলেন।

একটি ছবি ছাপা হলো

বঙ্গবন্ধু ঢাকা চলে যাবেন। নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সার্কিট হাউসের করিডর দিয়ে হেঁটে বের হচ্ছেন। এলি দৌড়ে ইটের খোপ বেয়ে দেয়ালের ওপরে উঠে গেল। স্লোগান দিল,

 

‘জয় বাংলা,

জয় বঙ্গবন্ধু।’

‘আমার নেতা, তোমার নেতা,

শেখ মুজিব, শেখ মুজিব।’

এলির সঙ্গে অন্যরাও স্লোগানে তাল মেলাল। এলি স্লোগান দিতে দিতে ঘেমে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু করিডরে দাঁড়িয়ে হাত উঁচু করে সবাইকে থামালেন। হাতে থাকা ফুলের তোড়া থেকে একটি ফুল এলিকে দিলেন। এলির মাথায় হাত রেখে আদর দিয়ে বললেন, ‘তুই ঘেমে গেছিস তো, এইবার থাম। হয়েছে, হয়েছে।’ কাছে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেদের বললেন, ‘তোরা তো পারলি না, ওর (এলি) সঙ্গে তোরা পারলি না।’

ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘পড়াশোনা ভালো করে করবে। পড়াশোনা ভালো চাই। তোমরা সবাই ভালো থাকো। জয় বাংলা।’

এলি তখনো পর্যন্ত জানে না, তার ছবিটি তোলা হয়েছে। পরদিন ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা ইত্যাদি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল ছবিটি।

 

সারা দিন হাত ধোয়নি

বঙ্গবন্ধুর অটোগ্রাফ সারা দিনই দেখতে চেয়েছে কেউ না কেউ। এলিও দেখিয়েছে সানন্দে। সন্ধ্যায় গৃহশিক্ষক বাসায় পড়াতে এসেও বলেছেন, কই অটোগ্রাফ দেখি। এলি সারা দিনে আর হাত ধোয়নি। পানি লাগলেই যে উঠে যাবে বঙ্গবন্ধুর অটোগ্রাফ। রাতে নিজ হাতে ভাতও খায়নি। পরদিন দুপুর পর্যন্ত ছিল অটোগ্রাফটি। গোসলের পরে মুছে যায়।

 

ছবিটি জোগাড় করতে

অটোগ্রাফ মুছে গেলেও ছবিটি (বঙ্গবন্ধু হাত রেখেছেন এলির মাথায়) জোগাড় করে সযত্নে রেখেছেন এলি। ছবিটি জোগাড় করতেও অনেক বেগ পেতে হয়েছে। শেষে ফটোসাংবাদিক পাভেল রহমানের মাধ্যমে সুরাহা করা গেছে। এলির স্বামী আলী আশরাফের ভালো বন্ধু পাভেল রহমান। তাঁর বাড়িও রংপুর। পাভেল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সেই ছবির কপি সংগ্রহ করে দিয়েছেন। ছবিটি এলির বড় সম্পদ। ঢাকায় এলে ৩২ নম্বর জাদুঘরে প্রতিবারই যান। ছবিটি সেখানে ঝোলানো আছে।



মন্তব্য