kalerkantho


উদ্যমী বাংলাদেশ

জানালা খুলে দিই

সাদিয়া জাফরিন আর আমিনা আজাদ এডুকেশনাল ডেভলপমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান টিচ ফর বাংলাদেশের হয়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের একটি স্কুলে পড়াচ্ছিলেন। গ্রো ইউর রিডারের ভাবনাটা সেখান থেকেই পেয়েছিলেন। তাঁরা শিশুদের নিয়ে যাচ্ছেন পাঠ্য বইয়ের বাইরে আরো বড় বইয়ের দুনিয়ায়। সাদিয়া জাফরিন পুরোটা বললেন পিন্টু রঞ্জন অর্ককে

২১ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



জানালা খুলে দিই

গ্রো ইউর রিডারের দুই উদ্যোক্তা আমিনা আজাদ ও সাদিয়া জাফরিন

একদিন টিফিনের সময় চা খাচ্ছিলাম। একটু দূরে একটা ছেলেকে দেখলাম গল্পের বই পড়ছে। এগিয়ে গিয়ে জানতে চাইলাম, কী বই পড়ছ? উত্তর দিল, ‘ম্যাডাম, কৃষক ও রাজার গল্প পড়ছি।’ আমার মনে পড়ল, মাসখানেক আগেও তার হাতে এই বইটাই দেখেছি। বললাম, ‘তুমি তো আগেও এই বই পড়েছ।’ তখন সে মন খারাপ করে বলল, ‘ম্যাডাম, আমার কাছে তো আর কোনো গল্পের বই নাই!’ ভাবিয়ে তুলল ব্যাপারটা। ক্লাসে গিয়ে আরো শিশুদের সঙ্গে কথা বললাম। জানলাম, পাঠ্য বইয়ের বাইরে আর বেশি বই তাদের কারোর কাছেই নেই।

 

সমাধান খুঁজলাম

আমরা ভেবেছিলাম সরকারের কাছে আবেদন করব। কিন্তু সেখানে নানা জটিলতা। তা ছাড়া কোনো সংগঠন তো নেই আমাদের। খোঁজ নিলাম আরো কয়েকটি স্কুলে। দেখলাম সেখানকার অবস্থাও কিছু আলাদা নয়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগ দরিদ্র পরিবার থেকেই আসে। এদের কিনে বই পড়ার সামর্থ্য নেই। তাই আমাদেরই কিছু একটা করতে হবে।

 

শুরুতে ২১৬টি বই

২০১৬ সালের মে মাস। উত্তরার দক্ষিণখানে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াচ্ছিলাম। সিনিয়র কয়েকজন শিক্ষকের কাছে ব্যাপারটি খুলে বললাম। বন্ধুবান্ধবকে বললাম বই দিতে। প্রথম দফায় ২১৬টি বই পেলাম। স্কুলে পুরনো একটা আলমিরা ছিল। হেড স্যার সেটা ব্যবহারের অনুমতি দিলেন। বই দেওয়া-নেওয়ার দায়িত্ব নিলেন একজন শিক্ষক। কিছুদিন পর দেখলাম পাঠক বাড়ছে। এবার বই চেয়ে একটা পোস্ট দিলাম ফেসবুকে। ভালো সাড়া পেলাম। এর পর আমরা ফেসবুকে একটা পেজ খুললাম। নাম দিলাম গ্রো ইউর রিডার। আমরা ভাবলাম, সবার মধ্যেই একটা পাঠক মানুষ আছে। শিশুদের মধ্যে আরো বেশি আছে। আমরা চাই সে মানুষটাকে জাগিয়ে তুলতে। তাই নাম গ্রো ইউর রিডার।

যেভাবে পরিচালিত হয়

স্কুলের শিক্ষার্থীরাই আমাদের পাঠক। স্কুলে একজন শিক্ষকের দায়িত্বে থাকে বইগুলো। যেখানে থাকে সেটাকে লাইব্রেরি স্টেশন বলি আমরা। দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক একটা রেজিস্ট্রার খাতায় বইয়ের এবং বাচ্চাদের নাম ও ঠিকানা টুকে রাখেন। বাড়িতে নিয়ে বই রাখা যায় পাঁচ দিন। কাউকে সদস্য হতে হয় না। কোনো টাকা-পয়সাও দেওয়া লাগে না। আমরা নিয়মিত স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখি।

 

এ রকম অনেক বই

ছড়া, কবিতা, জীবনীসহ অনেক রকম বই রাখি। কিছু বইয়ের নাম—ঠাকুরমার ঝুলি, ভিন দেশের রূপকথা, ঝরনা ও অরণ্যের গল্প, খোকা-খুকুর বঙ্গবন্ধু, বিজ্ঞানের এক শ মজার খেলা, বাঘবাহাদুর, বোকা রাজার সোনার সিংহাসন, শিয়াল ও খরগোশ, বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে, ছোটদের রবীন্দ্রনাথ, সুকুমার রায়ের মজার ছড়া বা গোপাল ভাঁড়ের সেরা গল্প।

 

অনেকে যোগাযোগ করেছেন

বই চেয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার পর থেকে অনেকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। বই দিতে কিংবা বই কেনার জন্য অনুদান দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তখন ভাবলাম অন্যান্য স্কুলেও লাইব্রেরি করা যায় কি না। ২০১৬ সালের আগস্টে তিন শর মতো বই নিয়ে মহাখালীর আমতলী স্টাফ ওয়েলফেয়ার স্কুলে লাইব্রেরি স্টেশন শুরু করি। এভাবে একে একে মিরপুরের ওয়াকফ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ধানমণ্ডির রাজমুসুরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মনেশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্ব জুরাইনের মহড়া স্কুল অব পারফরম্যান্স অ্যান্ড ক্রিয়েটিভ আর্ট, বাড্ডার নূরেরচালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গাবতলীর মেঘ স্কুলে শুরু হয় গ্রো ইউর রিডারের কার্যক্রম।

এখন আমরা

এ বছর থেকে গ্রো ইউর রিডারকে ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে দিচ্ছি। এখন আমাদের ১২টি লাইব্রেরি স্টেশন আছে। এর মধ্যে ঢাকায় ৯টি। বাকি তিনটি খুলনা ও পঞ্চগড়ে। আগামী মাস, মানে আগস্ট থেকে আরো তিনটি স্কুলে কার্যক্রম চালু হবে। এখন ছয় হাজারেরও বেশি বই আছে আমাদের সংগ্রহে। দেশের সব স্কুলে আমরা গ্রো ইউর রিডারকে ছড়িয়ে দিতে চাই।

 

আমাদের কিছু অর্জন

টিচ ফর বাংলাদেশ থাকার সময় আমেরিকার বাসিন্দা গ্লোবাল এডুকেটর জেসমিন রিদের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। এ বছরের শুরুতে তিনি একদিন ই-মেইলে জানালেন, ‘নিউ ইয়র্কের নিনা ডে ফাউন্ডেশন সারা বিশ্বের তরুণদের নিয়ে হোপ ফর ২০১৮ নামে একটি ক্যাম্পেইন করছে। তোমরা অ্যাপ্লাই করতে পারো।’ আবেদন করলাম। বাংলাদেশ থেকে নির্বাচিতও হলাম। আমরা তিন হাজার ডলার প্রাইজমানি জিতেছি। ২০১৭ সালের অক্টোবরে গ্রো ইউর রিডারের উদ্যোক্তা হিসেবে আমি ঢাকার সিটিজেন ওপেন ফোরাম থেকে ক্রিয়েটিভ এডুকেশনাল লার্নিং বিভাগে ইন্সপিরেশন অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছি।

 

আমরা দুজন

আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসিতে অনার্স করেছি। সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে মাস্টার্স। আর আমিনা অর্থনীতিতে পড়েছে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে। এর পর আমরা দুজনেই ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্ট বিষয়ে মাস্টার্স করেছি। সেখানেই আমিনার সঙ্গে পরিচয়। এখন দুজনেই বাংলাদেশ পেট্রোকেমিক্যাল কম্পানিতে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছি।

 

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ



মন্তব্য