kalerkantho


মশারির কভার আবিষ্কারক বৃষ্টি

২৩ জুন, ২০১৮ ০০:০০



মশারির কভার আবিষ্কারক বৃষ্টি

বাবা যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন বৃষ্টি ক্লাস ফোরের ছাত্রী। মা বাড়ি বাড়ি কাজ করতেন। মায়ের কষ্ট সইতে না পেরে বৃষ্টি তাঁত বোনার কাজে লাগে। তবে পড়াশোনা ছাড়েনি। ভালো ছাত্রী ছিল। রায়হান রাশেদ শুনে এসেছেন আরো অনেক কথা

 

স্কুল শেষ করে এসে তাঁত বুনতে বসত বৃষ্টি। সপ্তাহে পেত ৩০ টাকা। কখনোসখনো ৫০ টাকা। সে ক্লাসে ফার্স্ট, নইলে সেকেন্ড হতো। বাবা খুশি হয়ে দোকান থেকে ১০ টাকা দামের সুপার বিস্কুট এনে দিতেন। বলতেন, ‘মিষ্টি কিন্যা দিতে পারি না রে মা। বিস্কুট খাও।’

 

বৃষ্টি পুলিশ হতে চেয়েছিল

যদিও খেলার সময় যেত কাজের মাঝে। বই কেনারও টাকা বেশি ছিল না। তবু বৃষ্টি স্বপ্ন দেখতে ছাড়েনি। পুলিশ হতে চাইত বৃষ্টি। টিভিতে নারী পুলিশ দেখত আর ভাবত, একদিন আমিও...। কিন্তু অভাব স্বপ্ন কেড়ে নিল। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় মা তাকে বিয়ে দিয়ে দিলেন। স্বামী আবু সালেহ সেন্টু তখন ওয়ার্কশপে কাজ করেন। সপ্তাহে তাঁর মজুরি ৫০০ টাকা। ঘরে তিন ননদ ও দুই দেবর। সবার দায়িত্ব বৃষ্টির স্বামীর। অভাব তাই গেল না। বৃষ্টি কাপড় সেলাইয়ের কাজ নেয়। একসময় স্বামীর ওয়ার্কশপও বন্ধ হয়ে যায়। বৃষ্টির কাঁধে সব দায়িত্ব এসে চাপে। খুব কষ্টে দিন কাটছিল। তিন ননদকেও তড়িঘড়ি বিয়ে দিতে হয়। তবে একসময় দুই দেবর চাকরি জুটিয়ে নিয়েছিল। বৃষ্টি তখন তিন কন্যা সন্তানের জননী। ২০১০ সালে যখন ছোট মেয়ের বয়স দুই বছর তখন বৃষ্টি একটি টেক্সটাইল মিলে কাজ নেন। দুই হাজার টাকা বেতন। বড় মেয়েকে ভর্তি করালেন স্কুলে।

 

এলো ২০১১ সাল

ব্যুরো বাংলাদেশ নামের একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নেন বৃষ্টি। একটি সেলাই মেশিন কেনেন। ১০০ গজ গ্রে কাপড় কেনেন। তারপর বিছানার চাদর তৈরি করেন। রং করান। স্বামীকে নিয়ে রূপগঞ্জ বাজারে যান। ৪০০ টাকা দরে চাদর বিক্রি করেন। এক দোকানি বলেন, ‘এর পর থেকে সব চাদর আমাকে দেবেন।’ সাহসী হন বৃষ্টি। কিছু টাকাও আসে হাতে। একপর্যায়ে দুজন কর্মচারীও নিয়োগ দেন। আরো মেশিন কেনেন। চাদরের সঙ্গে জামাও সেলাই করেন।

 

মশারির কভার

এক রাতে মশারি টাঙানোর পর গুঁজতে গিয়ে বৃষ্টি দেখেন একটি কেঁচো হাঁটছে ভেতরে। ভাবলেন, মশারি ঠিকমতো না রাখলে তো বিপদ। সকালে ঘুম থেকে উঠেই সেলাই মেশিন নিয়ে বসে গেলেন। বালিশের কাভারের মতো করে মশারির কাভার তৈরি করলেন। চেইন লাগিয়ে দিলেন একধারে। মশারি ঢুকিয়ে দেখেন বেশ সুন্দর লাগছে। একপর্যায়ে কয়েকটি বানিয়ে বাজারেও নিয়ে গেলেন। দোকানি প্রথমে বোকা বনল—মশারির কভার হতে পারে, ধারণাই ছিল না তাঁর। তিনি চারটি কভার নেন ৫০০ টাকায়। পরের দিন দোকানি ফোন করে বলেন, ৫০টি কভার দেন। দোকানি আরো বলেন, ‘আপনি তো আবিষ্কর্তা। মশারির কভার বানায়া ফেলছেন। সারা বাজারে হৈচৈ পড়ে গেছে।’ বৃষ্টির চোখে পানি চলে আসে। নতুন করে স্বপ্ন দেখতে থাকেন।

 

অর্ডার আসে ঢাকা থেকে

প্রতিদিন ঢাকার বিভিন্ন দোকান থেকে অর্ডার আসে, মশারির কভার লাগবে। রাত-দিন কাজ করেন বৃষ্টি। চারজন সহকারীকে শিখিয়েও নেন। তৈরি হতে থাকে গোল কভার, ফোম কভার, শরমিলি কভার ইত্যাদি। শরমিলি কভার সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, ‘শরমিলি কভারটা খুব সুন্দর। অনেকগুলো গোল ফুল বসিয়ে তৈরি হয়। শরমিলি নামের এক মেয়ে আছে। সে এটা বেশি বানায়। বিক্রিও হয় বেশ। তার নামেই এ নাম।’

 

বিছানার চাদর ও নকশি কাঁথা

নতুন নকশার চাদরও বানান বৃষ্টি। একটি চাদরের নাম যেমন শততালি বেডশিট। ৮০০ তালি দিয়ে এ চাদর বানিয়েছেন তিনি। এর দামও বেশি। নকশি কাঁথাও বোনেন বৃষ্টি। নকশি কাঁথার বেডশিটও তাঁর আগে আর কেউ তৈরি করেননি। বললেন, ‘আমি যে কাজই করি মন দিয়ে করি।’ উল্লেখ্য, বৃষ্টি এ বছর প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে জয়িতা পুরস্কার পেয়েছেন।

 

বৃষ্টির কারখানা

তিনটি কারখানা আছে বৃষ্টির। নরসিংদীর দাসপাড়ার কারখানাটি নিজের জায়গাতেই। এখানে মশারির কভার বানানো হয়। শ্রমিক ৪০ জনের বেশি। বেশির ভাগ নারী, পুরুষ মোটে কয়েকজন। শিবপুরের ঘাগটিয়ায় আছে আরেকটি কারখানা। শ্রমিক আছে ১২-১৫ জন। বাপের বাড়ি রায়পুরার গোবিন্দপুরেও আছে একটি। বাটিকের কাপড় তৈরি হয়। ২০ জন নারী শ্রমিক আছে সেখানে। বৃষ্টির নকশি কাঁথাও যায় বিভিন্ন জায়গায়। ১০০ জন আছে বৃষ্টির সঙ্গে নকশি কাঁথা বোনার কাজে।

 

সুদিন আসছে

এখনো ভাড়া বাসাতেই থাকেন। সামনে একটা মনের মতো পাকা বাড়ি করার ইচ্ছা আছে। সন্তানদের একজনকে ডাক্তার বানানোর ইচ্ছা। চান নারীরা স্বাবলম্বী হোক। বললেন, ‘আমাকে মাঝেমধ্যে দূর থেকে মেয়েরা দেখতে আসে। বলে, আপনার কথা অনেক শুনছি। আমরাও আপনার মতো হতে চাই।’ বৃষ্টি হাজার শ্রমিক কাজ করতে পারে—এমন একটা কারখানা বানাতে চান। চান সব মেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াক।  

 



মন্তব্য