kalerkantho

ঐতিহ্য

বাবুদের বাড়ি

নরসিংদী সদরের পাইকারচরে বালাপুর জমিদার বাড়ি। মেঘনা নদীর তীরে ৩২০ বিঘা জমির ওপর। বাড়িটি এখন পরিত্যক্ত। পলেস্তারা খসে পড়েছে। ধসে গেছে ছাদ। মায়া লেগেছে রায়হান রাশেদের

২১ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



বাবুদের বাড়ি

বাবু নবীনচন্দ্র সাহা বানিয়েছিলেন এই বাড়ি। ৩২০ একর চৌহদ্দির প্রথম তিনতলা ভবনটি থাকার জন্য গড়েছিলেন নবীনচন্দ্র। এর উত্তর দিকে একটি একতলা ভবন, দক্ষিণে কারুকাজ করা একটি দোতলা ভবন। দোতলা ভবনের পশ্চিমে শ্রীশ্রী মদনমোহন জিউ ঠাকুরের মন্দির, আর পূর্ব-দক্ষিণ কোণে দুর্গা পূজার মণ্ডপ। পশ্চিমে একটি পুকুর খোঁড়া হয়েছিল ৯২ শতক জমির ওপর। পুকুরে নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা ঘাট। তখন খাবার পানির সংকট ছিল বলে পুকুর থেকেই খাবার পানি সংগ্রহ করা হতো। তাই গোসল করা ছিল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। বউ-ঝিদের স্নানের জন্য তিনতলা ভবনের সামনে একটি খালমতো খনন করা হয়েছিল। নবীনবাবু কবে যে বাড়িটি বানিয়েছিলেন তা অনেক খুঁজেও কোথাও খোদাই করা দেখলাম না। বলতে পারলেন না স্থানীয় বয়স্করাও। তবে বালাপুর স্কুল প্রতিষ্ঠা হয় ১৯১৯ সালে। বাড়িটি স্কুল প্রতিষ্ঠার অনেক আগেই প্রতিষ্ঠিত বলে মত দিলেন কেউ কেউ। 

 

বাড়িটিতে একচক্কর

প্রতিটি ভবনের ছাদেই আছে কুঁড়েঘর আকারের চিলেকোঠা। পুরো গ্রাম দেখা যায় তিনতলা ভবনের চিলেকোঠা থেকে। তিনতলা ভবনের কক্ষ সংখ্যা ১০৩টি। দুটি বৃহদাকার স্তম্ভ আছে এ ভবনের সদর দরজায়। তাতে চুন, সুরকির নানা নকশা। টেরাকোটায় গড়া ফুল ও লতাপাতার নকশাও চোখে পড়ে। বাড়ির সামনের দেয়ালে শ্বেতপাথর ব্যবহার করা হয়েছে। শ্বেতপাথরের ব্যবহার আছে দুর্গা মণ্ডপেও। সূর্যের আলোয় পাথরগুলো চমকায়। লোকে বলে, বাবুদের বাড়িতে এমন পাথরের অনেক ব্যবহার ছিল। তাঁরা চলে যাওয়ার পর লোকজন খুলে নিয়ে গেছে। দরজা আর জানালাগুলোতেও বাহারি ফুলের নকশা।

 

বাবুরা সংস্কৃতিমনা ছিলেন

প্রতি সন্ধ্যায় বাবুদের বাড়িতে ঢাকঢোল বাজত। শাঁখের আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ত দূরে। দুর্গা মণ্ডপের সামনের মাঠে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। পার্বণে কলকাতা থেকে নাটকের দল আসত। বাউলদের আসরও বসত কোনো কোনো দিন। আরো হতো যাত্রা বা পালাগান। জমিদারবাবু নিজে গভীর রাত অবধি আনন্দ অনুষ্ঠান উপভোগ করতেন। 

জনদরদি ছিলেন

স্কুলের জন্য নবীনচন্দ্র পৌনে দুই শতক জমি দিয়েছিলেন। বাজার বসিয়েছিলেন। সেটিই আজকের বালাপুর বাজার। এখনকার নরসিংদীর যে দেশখ্যাত বাবুরহাট, সেটিও নবীনচন্দ্রের নামেই। বাবুর জমিতেই সরকারি অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে বালাপুর প্রাথমিক সরকারি হাসপাতাল।

 

চলে গেলেন দেশ ছেড়ে

সাতচল্লিশের দেশ ভাগের পর পরই জমিদাররা কলকাতা চলে গিয়েছিলেন। বালাপুরের শিবপদ ভূঁইয়া ও সহদেব সূত্রধরের কাছে জানলাম, দেশ ছাড়ার আগে বাবুরা পুরো ৩২০ বিঘা জমি শ্রীশ্রী মদনমোহন মন্দিরের নামে উইল করে যান।  মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণকারীদের বাড়িটি ভোগের অধিকার দিয়ে যান, কিন্তু বিক্রির অধিকার দিয়ে যাননি। কাঁসার থালার মধ্যেও উইলের কথা খোদাই আছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাবুদের দু-একজন এক-দুবার এসেছেন।

    ছবি : ইসমাইল রাজা



মন্তব্য