kalerkantho

এই ছবিটা লড়ছে

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



এই ছবিটা লড়ছে

ছবিটা তুলেছেন মাসফিকুর আখতার সোহান। রোহিঙ্গাদের লেদা ক্যাম্প থেকে তোলা ছবিটা এবারের ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো কন্টেস্টে লড়ছে। জেনারেল নিউজ বিভাগে সেরা তিনের একটি এটি। সোহানের সঙ্গে গল্প জুড়েছিলেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

 

বগুড়ার ছেলে। দুই ভাই-বোনের মধ্যে বড়। বন্ধুরা সোহান বলেই ডাকে। দুষ্টু খুব, নাছোড়বান্দাও। যে কাজ করবেন বলে জেদ ধরেন, সেটা করেই ছাড়েন। সোহানের এক মামা, নাম ফজলে খোদা লিটন। তিনি ভালো পোর্ট্রেট তুলতেন। মামাকে দেখেই ছবি তোলার ব্যাপারটা মনে লাগে সোহানের।

 

এসএসসির পর

পকেট খরচ জমিয়ে সনির একটি ছোট ক্যামেরা কিনেছিলেন। তত দিনে এসএসসি দেওয়া হয়ে গেছে। মা-বাবা, ঘরবাড়ি, প্রতিবেশীদের ছবি তুলে দুই বছর গেল। ঢাকায় এলেন এইচএসসির পর। ভর্তি হলেন আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। সেটা ২০১২ সাল। তত দিনে সোহানের হাতে একটা ডিএসএলআর ক্যামেরা। এবার নেশা ধরে গেল। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে সুযোগ পেলেই ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন।

 

কখনো রেললাইন, কখনো সার্কাস

বড় ভাইদের কাছ থেকে অনেক শিখেছেন সোহান। ওই যে সুযোগ পেলেই চলে যেতেন রেললাইন বা বস্তিতে। ভিড়ে যেতেন সার্কাস দলেও। সখ্য গড়ে ওঠে ফ্রিল্যান্স (মুক্তজীবী) অনেক আলোকচিত্রীর সঙ্গে। ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফির প্রাথমিক পাঠ পেয়ে যান। তারপর দূরে দূরেও যেতে থাকেন। কখনো একা, কখনো দলে। পরিকল্পনা করে বা হঠাৎ করেই। হয়তো আড্ডা দিচ্ছেন স্টেশনে বসে। এমন সময় কিশোরগঞ্জগামী ট্রেন এলো। চেপে বসলেন। মাঝের কোনো স্টেশনে নেমে পড়লেন। ছবিটবি তুলে পর দিন ঢাকায় ফিরলেন। এমন অনেকবারই ঘটেছে। ২০১২ সালে গিয়েছিলেন পঞ্চগড়। সেখানে পেয়ে গিয়েছিলেন লায়ন সার্কাস দলটিকে। পরিচয় হয় রেহেনা নামে সার্কাসের এক ক্লাউনের সঙ্গে। বয়স তাঁর ২৪। বিয়েও হয়েছে দলেরই একজনের সঙ্গে। সন্তানকে বাড়িতে রেখে এসে দলের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে হয় রেহেনাকে। মনে কষ্ট রেখে লোক হাসান। ওই রেহেনাকে নিয়েই ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি করলেন সোহান। তিনি ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি করেছেন রেললাইনের জীবন, বন্যার্ত মানুষ, রোহিঙ্গাসহ আরো কিছু বিষয়ে। এ রকম ছবি তোলায় অর্থ বড় ব্যাপার হয়ে যায়। কারণ দীর্ঘ দিন পেছনে লেগে থাকতে হয়। প্রথম প্রথম পকেট খরচের টাকা বাঁচিয়ে ছবি তুলতেন। একসময় আর কুলাচ্ছিল না। ভাবলেন, তোলা ছবিগুলো ব্যবহার করা যায় কি না। পরামর্শ চাইলেন আলোকচিত্র-সাংবাদিক রেহমান আসাদের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘এজেন্সিতে ছবি দিতে পারো। ওরা টাকা-পয়সাও দেয় মোটামুটি।’ তো সোহান ইতালিভিত্তিক নূর ফটো এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। সোহানের ছবি পছন্দ হলো তাদের। ওদের জন্য ছবি তুলতে থাকলেন। এখন তুরস্কের আনাডোলু ফটো এজেন্সির হয়েও কাজ করেন সোহান।

 

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১২১ দিন

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস। ঈদের ছুটি চলছিল। সোহান বগুড়ায়। পত্রিকা পড়ে রোহিঙ্গাদের কথা জানতে পারলেন। বেশি খারাপ লেগেছিল রোহিঙ্গা বহনকারী একটা ট্রলার ডুবে যাওয়ার খবর পড়ে। এরই মধ্যে আনাডোলু থেকে ফোন আসে—রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যাও। কিন্তু ঈদের সময়, মা-বাবা কিছুতেই ছাড়তে চান না। শেষে অনেক বুঝিয়ে ৪ সেপ্টেম্বর টেকনাফ রওনা হলেন। ইচ্ছা ছিল পাঁচ-সাত দিন থাকবেন। সেমতো ব্যাগে মাত্র দুই সেট প্যান্ট-শার্ট পুরেছিলেন। টাকা নিয়েছিলেন সাত কি আট হাজার। আর সনি আলফা ক্যামেরাটা তো সব সময় থাকে। টেকনাফ পৌঁছে একটি হোটেলে উঠলেন। প্রতিদিন সকালে বের হতেন। কোনো দিন শাহপরীর দ্বীপ, কোনো দিন লেদা ক্যাম্প, কোনো দিন বা বালুখালী। সারা দিন ছবি তুলে সন্ধ্যায় ফিরতেন। সোহান বলেন, ‘ক্যামেরাই আমার সম্বল। এটা দিয়েই যতটা পারি মানুষের উপকার করার চেষ্টা করি।’ থাকতে থাকতে সে দফায় সোহান ১৯ দিন টেকনাফে থেকেছিলেন। ফলে অর্থসংকটসহ আরো অনেক সংকট দেখা দিয়েছিল। কোনো কোনো দিন একবেলা খেয়ে থেকেছেন। কোনো দিন বা এক প্যাকেট দুধ। একই শার্ট পরেছিলেন ১০-১২ দিন। একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন সোহান। তখন ফিরে এসে সপ্তাহখানেক পর আবার গিয়েছিলেন। সেবার রোহিঙ্গা-বোঝাই ট্রলারের ছবি তুলতে গিয়ে ক্যামেরাসহ পানিতে পড়ে গিয়েছিলেন। ঢাকায় এসে তৌহিদ পারভেজ বিপ্লবের কাছ থেকে ক্যামেরা ধার নিয়ে আবার চলে গিয়েছিলেন।

 

কন্টেস্টের ছবিটি ৯ সেপ্টেম্বর তোলা

লেদা ক্যাম্প টেকনাফ থেকে প্রায় চার-পাঁচ কিলোমিটার দূরে। মাঝেমধ্যেই যেতেন সোহান। ৯ সেপ্টেম্বর দুপুরের পর পরই রওনা দিয়েছিলেন। সোহান বলেন, লেদা ক্যাম্পে আমার চেনা ছিল অনেকে। পৌঁছে তাই পরিচিতদের খুঁজলাম। হঠাৎ দেখি কিছু মানুষ পাহাড়ের দিকে দৌড়াচ্ছে। পিছু পিছু আমিও পাহাড়ের ওপর উঠলাম। দেখি ওই পারে রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি পোড়ানো হচ্ছে। আর পাহাড়ে দাঁড়িয়ে রোহিঙ্গারা তা দেখছিল। তাদের চোখে জল। অনেকে ফোনে ওপারে থাকা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে কথা বলছিল। তখন আমি পেছনের আরেকটি পাহাড়ে চলে যাই। অনেক ক্লিক করেছিলাম। বাসায় ফিরে দেখি বেশ ভালো একটা ছবি পাওয়া গেছে। ছবিটা নিজেই কথা বলছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে—নাফ নদের ওপারে ধোয়ার কুণ্ডলী। আর এপার থেকে মিয়ানমারে নিজেদের ঘরবাড়ি পুড়ে যাওয়া দেখছিল রোহিঙ্গারা। শিরোনাম দিলাম ওয়াচিং হাউস বার্ন। ১০ তারিখে ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানে সেটি ছাপা হয়। এরপর টাইম ম্যাগাজিনসহ আরো অনেক জায়গায় ছাপা হয়েছিল। অনেকের প্রশংসাও কুড়িয়েছিল ছবিটি।

 

ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো পুরস্কার

এবার ১২৫টি দেশ থেকে মোট চার হাজার ৫৪৮ জন আলোকচিত্র-সাংবাদিক ৭৩৪৪টি ছবি জমা দিয়েছেন ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো কনটেস্টে। এর মধ্যে সোহানই একমাত্র বাংলাদেশি। ছবিটি সম্পর্কে জুরি বোর্ডের প্রধান ম্যাগডালেনা হেরারার মন্তব্য করেছেন, ছবিটি আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

সোহান বলেন, ‘প্রতিযোগিতার খবর প্রথম আমাকে দেন ফটোগ্রাফার তানভীর রোহান। একেবারে শেষ দিন আবেদন করেছিলাম। একটি বিভাগের সেরা তিনে আসতে পেরে সত্যি অদ্ভুত লেগেছে। ভালো লাগাটা বলে বোঝানো যাবে না।’ উল্লেখ্য, আগামী ১২ এপ্রিল নেদারল্যান্ডসের আমর্স্টারডামে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।

 

ঝুলিতে আরো অনেক পুরস্কার

২০১৭ সালে বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি আয়োজিত বার্ষিক ফটো কনটেস্টে সিলভার ও ব্রোঞ্জ পুরস্কার পান। একই প্রতিযোগিতায় জাতীয় পর্যায়েও একবার রানার আপ হয়েছেন। বিশ্বব্যাংক আয়োজিত দ্য কনসালটেটিভ গ্রুপ টু অ্যাসিস্ট দ্য পুওর বা সিজিএপি শীর্ষক প্রতিযোগিতায় এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড, দ্য হামদান বিন মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম ইন্টারন্যাশনাল ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ডস ২০১৬-১৭-এর ফাইনালিস্ট ছিলেন। বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক গ্রুপ (বিডিপিজি) আয়োজিত প্রথম ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতায় প্রথমসহ আরো অনেক পুরস্কার জিতেছেন সোহান। দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, হাফিংটন পোস্ট, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, সিএনএন, আল জাজিরাসহ অনেক সংবাদমাধ্যমে ছাপা হয়েছে সোহানের তোলা ছবি।



মন্তব্য