kalerkantho


আজ আমরাও

আমি ও প্যাডম্যান

আমি জেরিন ফারজানা। হাওর ও বিল এলাকার মেয়েদের স্যানিটারি প্যাড ব্যবহারের কথা বলি। বলিউড প্যাডম্যান নামে একটি ছবি মুক্তি দিয়েছে কাল। আমি জানতে চেয়েছিলাম প্যাডম্যানকে। মিলিয়ে নিতে চেয়েছিলাম নিজের অভিজ্ঞতাও

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আমি ও প্যাডম্যান

বলিউডের প্যাডম্যান ছবির পোস্টার অবলম্বনে গ্রাফিক্স।

রজঃস্রাব, পিরিয়ড বা রক্তস্রাব—একই অর্থের শব্দ এগুলো। এর যেকোনো একটি শব্দই যথেষ্ট আপনাকে আর আপনার চারপাশকে বিব্রত করার জন্য। অর্থগুলোর মধ্যে আছে অপবিত্র, অসুস্থ, অপরিচ্ছন্ন ইত্যাদি। সোজাসুজি অনেকে এটি বোঝাতে শরীর খারাপ বলেন। যখন এই কথাগুলো লিখছি তখনই পেছন থেকে আমার বাবা এলেন। আমি ল্যাপটপের লিডটা নামিয়ে দিলাম। কিছুক্ষণ পর যখন আবার লিখতে শুরু করলাম, হাসি পেল, আমিও আর দশজনের মতোই! এভাবেই বেড়ে উঠেছি। জানি না পিরিয়ড নিয়ে খোলামেলা কথা বলার সময় আসবে কি না।

 

ঘরে-বাইরে সর্বত্র

সবচেয়ে মজার ব্যাপার ঘটে রমজান মাসে। সবাই জিজ্ঞেস করে সব রোজা ছিলে? যদি কোনো মেয়ে বলে, হ্যাঁ, তাহলেই মুচকি হাসে। গেল রমজানেরই কথা। অফিসে পুরুষ সহকর্মীরা জিজ্ঞেস করছিলেন, আচ্ছা সত্যি করে বলেন তো, আপনি কি রোজা? আমিও উত্তর দিয়েছিলাম, হ্যাঁ। তাদের ভ্রু কুচকে গিয়েছিল। আমি সশব্দে হেসেছিলাম। বলেছিলাম, আপনাদের একটু দেরি হয়ে গেছে। আমার পিরিয়ড শেষ হয়েছে দুই দিন আগে। বাসায় ফিরে স্বামীকে ঘটনাটা বললাম। সে পড়ল আকাশ থেকে। বলল, ‘তুমি এমন কথা কলিগদের সঙ্গে বলো?’ আমাদের ঘরে-বাইরে এমনটাই চলে। আরেক দিনের আড্ডায় কেউ প্রশ্ন করেছিল, সিনেমায় নায়ক-নায়িকাদের টয়লেটে যাওয়া দেখানো হয় না কেন? একজন উত্তরে বলেছিল, ‘কে বলেছে? আস্ত একটা সিনেমা বানিয়ে ফেলল টয়লেট নিয়ে!’ হ্যাঁ, সত্যি বলিউডে টয়লেট : এক প্রেমকথা নামে ছবি হয়েছে গেল বছরের আগস্টে।

তবুও বাকি ছিল

সেক্স এডুকেশন নিয়ে কিন্তু সত্যি ভারতের সিনেমা বেশি কাজ করেনি। তবে এখন মনে হচ্ছে জোরেশোরেই নেমেছে। আর এর পেছনে মেয়েদেরও অবদান আছে। টয়লেট : এক প্রেমকথার প্রযোজকদের একজন যেমন প্রেরণা অরোরা। তিনি প্যাডম্যানেরও কো-প্রডিউসার। গল্পটিও নেওয়া হয়েছে টুইংকল খান্নার দ্য লেজেন্ড অব লক্ষ্মীপ্রসাদ বই থেকে। বইটির চারটি গল্পের মধ্যে সবচেয়ে লম্বাটিই অরুণাচলম মুরুগানানথামকে নিয়ে। গল্পটির নাম মেনসট্রুয়াল ম্যান। অরুণাচলম মেয়েদের জন্য কম খরচে স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরিতে জীবনপাত করেছেন।

 

ভেবেছিলেন টুইংকল খান্না

টুইংকল জানতেন ‘মাসিক’ ব্যাপারটির সঙ্গে নানা কিছু জড়িয়ে আছে ভারতীয় সমাজে। সেগুলোর বেশির ভাগই খারাপ ধরনের। টুইংকল অচলায়তন ভাঙতে চাইলেন। শুধু বই দিয়ে সবার কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়, জানতেন টুইংকল। সিনেমা দিয়ে বরং অনেক বেশি লোকের কাছে যাওয়া যাবে। অরুণাচলমের ভূমিকায় ভাবলেন খিলাড়িখ্যাত অক্ষয়কুমারের কথা। পিরিয়ডের মতো বিব্রতকর শব্দ নিয়ে কথা বলার জন্য একজন খিলাড়িই তো দরকার! সাধারণ দর্শকদের কথা মাথায় রেখেই টুইংকল কিছু হাস্যরস জোগান দেওয়ার কথাও ভাবলেন। টুইংকল বলেন, অরুণাচলমের অনুমতি পেতেই বেশি বেগ পেতে হয়েছে। প্রায় আট মাস লেগেছিলাম তাঁর পেছনে। এক পর্যায়ে তিনি রাজি হন।’ অবশ্য অরুণাচলম বলেছেন, ‘অক্ষয়ের মতো মানুষ আমার চরিত্র করছেন, এটা গর্বের ও সম্মানের।’ উল্লেখ্য, টুইংকল খান্না প্যাডম্যান ছবির প্রযোজক।

 

ফুল্লুর দুর্ভাগ্য দেখুন

গেল জুনেই কিন্তু মুক্তি পেয়েছিল ফুল্লু। অভিষেক সাক্সেনার এ ছবিটির বিষয়ও পিরিয়ড। ছবিটি নাম করেনি, কারণ তারকা উপস্থিতি ছিল না। কোনো আপত্তিকর দৃশ্য না থাকা সত্ত্বেও ছবিটিকে এ সার্টিফিকেট নিয়ে রিলিজ দিতে হয়েছিল। যেখানে মাসিক নিয়ে এত রাখঢাক, সেখানে এ (অ্যাডাল্ট) সার্টিফিকেট তো পেতেই হবে! প্যাডম্যানকে এসব ঝামেলা পোহাতে হয়নি। অভিষেক সাক্সেনা অবশ্য বলেছেন, ফুল্লু আর প্যাডম্যান আলাদা। প্যাডম্যান সফলতার কাহিনি আর ফুল্লু শুধুই জনসচেতনতা তৈরি করতে চেয়েছিল।

 

এবার কিছু দেশের কথা

একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, আমাদের দেশেও মাত্র ১৩ শতাংশ মেয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের সুযোগ পায়। বাকিদের অনেকেই জানে না এটা ব্যবহারের উপায়। কেউ কেউ জানলেও সামর্থ্যের অভাবে ব্যবহার করতে পারে না। এমন পরিস্থিতিতে প্রকৌশলী তারেক হাসান, ডা. শাকির ইব্রাহিম, সাংবাদিক মারজিয়া প্রভা ও আমি জৈবপ্রযুক্তিবিদ জেরিন ফারজানা গড়ে তুলি ডোনেট আ প্যাড ফর হাইজিন বাংলাদেশ নামের একটি সংগঠন। আমরা হাওর আর বিল এলাকার বিশেষ করে স্কুলগুলোতে কাজ করি। অল্প খরচে প্যাড সরবরাহ করি। আমরা প্রচারণা চালাই এই বলে যে গৃহকর্মীর মাসের বেতনের সঙ্গে একটি করে সানিট্যারি ন্যাপকিন প্যাড দিন। ঋতুকালে মেয়েদের স্বাস্থ্য সচেতনতা ও প্যাডবিষয়ক সেমিনারও আয়োজন করে সংগঠনটি।

 

আরো কিছু ভাবনা

অনেক দিন ভেবেছি, মেয়েরা সুস্থ থাকে কবে? আজ পিরিয়ডজনিত মাথা ব্যথা তো কাল পেটের ব্যথা। পরের সপ্তাহে সাদা স্রাব। কোনো দিন আবার জ্বর। এই পরিস্থিতিতে বেশি প্রয়োজন শারীরিক প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা। মেয়েদের সহ্যক্ষমতা অনেক। শারীরিক যন্ত্রণা নিয়েও হাসিমুখে ঘুরে বেড়াতে পারে। মেয়েরাই পৃথিবীতে নতুন মানুষ আনে। সমাজ ব্যাপারটি ভুলে না গেলে সবারই উপকার হয়।

 

আমার আমি

১৯৮২ সালে জন্ম আমার। মায়ের ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হব। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম জৈবপ্রযুক্তি বিভাগে। স্নাতকোত্তর হয়ে দেশে ফিরি ২০০৯ সালে। চেষ্টা করতে থাকি কম রাসায়নিক ব্যবহার করে ও ন্যাচারাল এক্সট্রাক্ট দিয়ে প্রসাধনী পণ্য তৈরি করতে। নাম রাখলাম গ্রিন এসেন্স। ভালো খবর হলো, ২০১১ সাল থেকেই আমার প্রতিষ্ঠান এক্সপারটিজ বায়োটেক (গ্রিন এসেন্স প্রস্তুতকারক) একটি প্রাইভেট লিমিটেড কম্পানি। গত বছর থেকে নিরাপদ ফেয়ারনেস ক্রিম নিয়ে কাজ করছি। বাজারের রং ফরসাকারী ক্রিমগুলোতে পারদ বা সিসা থাকে। এগুলো রক্তে মিশে গিয়ে কিডনিতে পাথর তৈরি করে। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এসব ব্যবহারকারী মেয়েদের মধ্যে ৩০ শতাংশ গর্ভধারণে জটিলতার শিকার হয়। আমি যে রং ফরসাকারী ক্রিম প্রস্তুত করছি তা অনেকটাই নিরাপদ হলেও খরচ সীমার মধ্যে আনতে পারছি না। রং ফরসাকারী ক্রিম নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে জানি, কিন্তু কালো মেয়েদের ব্যাপারে সমাজ সত্যি উদার নয়।

 

আসল প্যাডম্যান অরুণাচলম মুরুগানানথাম 

১৯৬২ সালে জন্ম তামিলনাড়ুর এক তাঁতির ঘরে। বাবা মারা যান এক সড়ক দুর্ঘটনায়। মা কারখানা শ্রমিকের কাজ নিয়েছিলেন। অর্থাভাবে লেখাপড়া বেশি করতে পারেননি। আসলে স্কুলের গণ্ডিও পার হতে পারেননি। কারখানা শ্রমিকদের খাবার সরবরাহ করার কাজে লেগে যান। মেশিন সারাইয়ের কাজও শিখেছিলেন। মজুরি যা পেতেন সবটাই সংসারে খরচ হয়ে যেত।

১৯৯৮ সালে বিয়ে করেন শান্তিকে। বিয়ের পর পর দেখলেন, পিরিয়ড বা মাসিক চলাকালে শান্তি ছেঁড়া বা ময়লা কাপড় আর পত্রিকার কাগজ মুড়িয়ে প্রয়োজন সেরে নিচ্ছেন। কারণ বাজারে যে স্যানিটারি ন্যাপকিন পাওয়া যেত তার অনেক দাম। অরুণাচলমকে ব্যাপারটি ভাবিয়ে তুলল। কাপড় বোনার অভিজ্ঞতা ছিল, প্রথমে সে জ্ঞানটাই কাজে লাগাতে চাইলেন। চেষ্টা করতে থাকলেন কম খরচে প্যাড বানানোর। প্রথম তুলা আর কাপড় দিয়ে প্যাড বানালেন। স্ত্রী আর বোনকে দিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছিলেন। কিন্তু তাঁরা লজ্জায় বেশি দিন সহযোগিতা দিতে পারল না। তিনি গ্রামের কয়েকজন মেয়ের কাছে সহায়তা চাইলেন। প্রথমদিকে কয়েকজন রাজি হলো। কিন্তু পাড়াময় রটে গেল অনেক মেয়ের সঙ্গে তাঁর অবৈধ সম্পর্ক আছে। পরিণামে স্ত্রী চলে গেল বাবার বাড়ি। উল্লেখ্য, অরুণাচলমদের সমাজে ঋতুকালীন কাপড় থেকে শুরু করে ঋতুবতীরাও ছিল অচ্ছুৎ। আরো উল্লেখ্য, ভারতে মাত্র ৫ শতাংশ মেয়ে প্যাড ব্যবহার করে।

বিপদে পড়ে গেলেন অরুণাচলম। পরীক্ষা না চালাতে পারলে প্যাডে পরিবর্তন আনতে পারবেন না। শেষে নিজে এক অদ্ভুত কাজ করলেন। একটা বেলুনে বা ব্লাডারে গবাদিপশুর রক্ত নিয়ে নিজের শরীরে বেঁধে সেই প্যাড ব্যবহার শুরু করলেন। সাইকেল চালাতে গিয়ে চাপ পড়ত আর রক্ত চুইয়ে পড়ত। এর মধ্যে গ্রামবাসী উত্তেজিত হয়ে পড়ল। তারা বলতে লাগল, অরুণাচলমকে ভূতে ধরেছে। অরুণাচলমকে তাঁরা একঘরে করে দিল। কিন্তু তিনি থামলেন না। গ্রামের হাসপাতালে বিনা মূল্যে প্যাড সরবরাহ করতে থাকলেন। শর্ত একটাই, ব্যবহৃত প্যাড ফেরত দিতে হবে। বাজারে পাওয়া প্যাডগুলো গবেষণা করে দেখলেন, শোষণক্ষমতা বাড়াতে সেগুলোতে কাঠের ভূষি আর গাছের ছাল ব্যবহৃত হয়। যে মেশিনে এগুলো তৈরি হয় তার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে তিন কোটি রুপি। তারপর অনেক দিন খেটেখুটে প্রায় একই শোষণক্ষমতাসম্পন্ন একটি মেশিন তিনি তৈরি করলেন। খরচ হলো মাত্র ৬৫ হাজার রুপি। তিনি মুম্বাই থেকে প্রক্রিয়াজাত গাছের ছাল আনালেন আর প্যাডগুলো প্যাকেট করার আগে জীবাণুমুক্ত করলেন।

২০০৬ সালে তিনি মাদ্রাজের আইআইটিতে (ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি) তাঁর প্রজেক্ট জমা দিলেন। আইআইটি সেটিকে ন্যাশনাল ইনোভেশন ফাউন্ডেশনের তালিকাভুক্ত করল। জিতেও নিলেন গ্রাসরুট টেকনোলজিক্যাল ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড। জয়শ্রী ফাউন্ডেশন তাঁর প্রকল্পে বিনিয়োগ করল। যন্ত্রটি বাজারজাত করা হলো। অরুণাচলম মেয়েদের এই যন্ত্র চালানোর ট্রেনিং দিলেন। মেয়েদের পরিচালিত সেলফ-হেল্প গ্রুপ নামের একটি সংস্থার মাধ্যমে তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়তে লাগল। তাঁর এই সামাজিক উদ্যোগ একই সঙ্গে দুটি কাজ করছিল—যন্ত্রের মাধ্যমে ছোট ছোট কারখানা গড়ে উঠতে শুরু করল এবং স্বল্প খরচে প্যাড পাওয়ার কারণে গ্রামের মেয়েরা আরো বেশি স্বাস্থ্যসচেতন হতে শুরু করল।

অরুণাচলম আইআইটি মুম্বাই, আইআইএম (ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট) ব্যাঙ্গালুরু, আহমেদাবাদ এমনকি হার্ভার্ডে তাঁর গল্প তুলে ধরেছেন। টাইম ম্যাগাজিন ২০১৪ সালে ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির মধ্যে তাঁকে স্থান দিয়েছে। তার গল্প নিয়ে অমিত ভিরমানি একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেন।

অরুণাচলম বলেন, জীবনকে অর্থবহ করতে আর কিছুই নয়, প্রয়োজন শুধু একটি সমস্যার! আপনি সেই সমস্যার সমাধান খুঁজুন, দেখবেন জীবন অর্থবহ হয়ে উঠবে। আর টাকা এমনিই আসবে, এর পেছনে ছোটার দরকার পড়বে না।’


মন্তব্য