kalerkantho


ভালোবাসি ভালোবাসি

এটুকুই শুধু আছে বাকি

সেতারা বৌদ্ধ ছিল। রাখাইন স্টেটে বাড়ি ছিল। এখন রোহিঙ্গা স্বামী মোহাম্মদের সঙ্গে একটি ক্যাম্পে থাকে। এখানে জীবন নেই, কিন্তু ভালোবাসা আছে। এটুকু সম্বল করেই বেঁচে আছে তাঁরা। হিন্দুস্তান টাইমস ও ভয়েস অব আমেরিকা থেকে বাংলা করেছেন তাহসিন চোকদার

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



এটুকুই শুধু আছে বাকি

গেল জুলাইয়ের ১৬ তারিখে তোলা ছবি। থেটকাবিন ভিলেজ ক্যাম্পে মোহাম্মদ ও সেতারা।

রাখাইন প্রদেশের একটি ছোট শহর সিৎউই। বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি শহরটি। সেখানে বালুকাবেলায় রেস্টুরেন্ট আছে কিছু। প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে সমুদ্রে সূর্যাস্ত দেখা যায়। সেতারার খুব ইচ্ছা স্বামীকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে যায়। কিছু খেতে খেতে সূর্যাস্ত দেখে। কিন্তু এটা শুধু স্বপ্নেই সম্ভব। সেতারা তবু যেতে পারে, কারণ তাঁর পরিচয়পত্রে বৌদ্ধ কথাটি উল্লেখ আছে। কিন্তু মোহাম্মদ রোহিঙ্গা। চেকপয়েন্টগুলো কোনোভাবেই পার হতে পারবে না মোহাম্মদ। উপরন্তু হামলার শিকার হতে পারে। উল্টো মোহাম্মদ ভয় পায় সেতারাকে নিয়ে।

মুখে চন্দন মেখে (মিয়ানমারের বৌদ্ধরা সচরাচর ব্যবহার করে) সেতারা সপ্তাহে দু-চারবার শহরে যায় প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে। বিয়ের সময় মেয়েটিকে তো মুসলমান হতে হয়েছে, সে পরিচয় ফাঁস হলে তো লোকেরা মেরে বসবে সেতারাকে। নিজের ভাইয়েরাই তো সেতারাকে কম মারেনি। ভাবে মোহাম্মদ। উল্লেখ্য, মিয়ানমারে বৌদ্ধ ও মুসলমানদের মধ্যে বিয়ের ঘটনা ঘটেই না। 

ঘটনাটা খুলে বলা যাক

২০১২ সাল। সেতারা তখন ৯ মাসের বিধবা। কাছের একটি রোহিঙ্গা গ্রামের ধারে বোনদের সঙ্গে শৌখিন দ্রব্য বিক্রি করতে গিয়েছিল। রোহিঙ্গাদের শহরে যাওয়া বারণ। তাই দামও ভালোই পাওয়া যায়। ওই গ্রামে মোহাম্মদের ওষুধের দোকান ছিল। সেতারার সঙ্গে তাঁর ফোন নম্বর বিনিময় হয়। সেতারার কিন্তু আগের ঘরের ছোট একটি বাচ্চা আছে। জানে মোহাম্মদ। কিন্তু সে এতেই খুশি যে একজন রাখাইন তাঁকে খারাপ চোখে দেখছে না। আর সেতারা খুশি এ জন্য যে সে একজন হৃদয়বান মানুষের দেখা পেয়েছে। যা হোক ফোনে অনেক কথা হয়। মাঝেমধ্যে দেখা। মোহাম্মদের মোটরবাইকে চড়ে ঘুরে বেড়ায় দুজনে এদিক-ওদিক। তাদের হৃদয় বিনিময় হয়। একসময় সেতারা নিজের ভাইদের বলে যে মোহাম্মদকে বিয়ে করতে চাই। ভাইয়েরা তাকে বেদম পেটায়। বাড়ি থেকে বেরও করে দেয়। রাখাইনের বৌদ্ধরা রোহিঙ্গাদের দখলদার মনে করে। মনে করে ওরা বাংলাদেশ থেকে এখানে এসে জমিজমা লুটে নিয়েছে। তাই তাদের ওপর খুব রাগ। ওদিকে সেতারার বাবা মারা গেছেন ছোটবেলায়ই। ভাইয়েরাই মানুষ করেছে এক রকম। তাই বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পর আর জায়গা থাকল না সেতারার। বোনেরা একটু সহানুভূতি দেখিয়েছে কিন্তু সমাজের চোখ বড় কড়া। অগত্যা সেতারা মোহাম্মদকে বিয়ে করল। তারপর একসময় ২০১৬ সাল এলো। রাখাইন স্টেট রেগে গেল আবার। রোহিঙ্গাদের ঝেটিয়ে বিদায় করতে থাকল (এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু হয়েছে)। সেতারার মেয়ের বয়স তখন আট। মোহাম্মদ তাদের নিয়ে এক রকম আছে থেটকাবিন ভিলেজ ক্যাম্পে। ক্যাম্প থেকে সিৎউই আধা ঘণ্টার পথ। 

 

চলে যাব কিন্তু

মজা করে বলে সেতারা। মোহাম্মদ ভয় পেয়ে যায়। সেতারা বলে, ‘এখানে (ক্যাম্পে) কোনো জীবন নেই। রোহিঙ্গাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। এখানটা রুক্ষ, ধূসর। আর সিৎউই কত সবুজ, শ্যামল। স্কুল আছে, রেস্টুরেন্ট আছে। মানুষ সেখানে হাসে। এখানে তো মানুষ হাসে না। এখানে জীবন নেই।’ সেতারা মুখে যা-ই বলুক না কেন মোহাম্মদকে ছেড়ে তার যাওয়া হয় না। মোহাম্মদ একজন হৃদয়বান মানুষ। সেতারা বলে, রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ খারাপ, তবু আমার গন্তব্য মোহাম্মদ।



মন্তব্য