kalerkantho


এই বাংলাকে ভালোবেসে

ব্রিটেনের লুসি হল্ট ৫৮ বছর ধরে বাংলাদেশে আছেন। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের শুশ্রূষা দিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরা ফিরে গেছেন। কিন্তু লুসির ইচ্ছা, এ মাটিতেই দেহ রাখবেন। রফিকুল ইসলাম দেখা করে এসেছেন

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



এই বাংলাকে ভালোবেসে

পুরো নাম লুসি হেলেন ফ্রান্সিস হল্ট। জন্ম ১৯৩০ সালের ১৬ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যের সেন্ট হ্যালেন্সে। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন কেউ নেই এখানে তাঁর। বরিশাল অক্সফোর্ড মিশনে থাকেন তিনি। বাংলাকে ভালোবেসে, বাংলার মানুষের সেবা করে পার করেছেন ৫৮ বছর। দুঃখ এই—দেশটির নাগরিকত্ব পাননি। সরকার অবশ্য তাঁর ভিসা ফি মওকুফ করেছে। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখার জন্য বিজয় দিবসে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ তাঁকে সম্মাননা দিয়েছে।

 

জন্ম ১৬ ডিসেম্বর

লুসির জন্মও ১৬ ডিসেম্বর। লুসি বলেছেন, ‘বিষয়টি আমাকে খুব ভাবায়। বাংলাদেশের সঙ্গে আমি বাঁধা পড়েছিলাম বুঝি আমার জন্মের দিনই। দুই বোনের মধ্যে আমি ছোট।’ ১৯৪৮ সালে ক্লাস টুয়েলভ শেষ করেন। ১৯৬০ সালে তিনি বাংলাদেশে আসেন। যোগ দেন বরিশাল অক্সফোর্ড মিশনে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের পড়ানোর কাজ নেন। এরপর থেকে ঘুরেফিরে বাংলাদেশেই আছেন। যশোর, খুলনা, নওগাঁ, ঢাকা ও গোপালগঞ্জে কাজ করেছেন তিনি। অবসরে গিয়েছেন ২০০৪ সালে। ফিরে এসেছেন বরিশালে। মিশন প্রাঙ্গণে একটি ছোট্ট টিনের ঘরে তাঁর থাকার ব্যবস্থা। সেখানে আসবাব বলতে ছোট একটি কাঠের চৌকি আর কাঠের ছোট দুটি টেবিল। পাশে একটি তাকে কিছু বই ও পুরনো ডায়েরি। 

 

মুক্তিযুদ্ধের কাল

যশোর ক্যাথলিক চার্চ স্কুলে ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন লুসি ১৯৭১ সালে। যুদ্ধ শুরু হলে চার্চের সহকর্মীরা খুলনা চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু লুসি যুদ্ধাহতদের সেবা করার মানসে যোগ দেন যশোরের ফাতেমা হাসপাতালে। লুসি বলেন, ‘আমি ডাক্তার নই, কিন্তু তখন অনেককে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। ডাক্তাররাও তখন আগের মতো হাসপাতালে আসতেন না। ডাক্তারও অবশ্য বেশি ছিল না।’ লুসি বঙ্গবন্ধুর ভক্ত ছিলেন। যুদ্ধ শুরুর সময়ই ব্রিটেনে বন্ধু ও স্বজনদের চিঠি লিখে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতেন। লুসি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে আমি এতটাই শ্রদ্ধা করতাম যে ১৯৭২ সালে আমি নিজ হাতে ডাইনিং টেবিলের ম্যাট বানিয়ে তাঁর স্ত্রীর কাছে পাঠিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ রেহানা মায়ের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফিরতি চিঠি দিয়েছিলেন। লুসি বলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখতে পারায় নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি।’ 

 

ইচ্ছা হয়

তিনি লজ্জা বোধ করেন এ জন্য যে তাঁর পূর্বপুরুষরা এ দেশটিকে দখল করে রেখেছিল, মানুষকে কষ্ট দিয়েছিল। এ মানুষটার মনে শুধুই বাংলাদেশ। তাঁর ইচ্ছা, এখানেই দেহ রাখবেন। এই বাংলাদেশে, এই বরিশালে। তাই এখন তাঁর দরকার দ্বৈত নাগরিকত্ব। লুসি বলেন, এই দেশের সঙ্গে আমার আত্মার যোগ হয়ে গেছে। এখানেই শেষশয্যা নিতে না পারলে শান্তি পাব না।

 

ভালোবাসি লুসিকে

উষা দাসের বয়স ৫৯ বছর। লুসির ছাত্রী ছিলেন একসময়। বলেন, ‘তাঁকে (লুসিকে) দেশে ফিরে যাওয়ার কথা বললেই কাঁদেন। অবসরকালীন ভাতা পান মোটে সাড়ে সাত হাজার। কিন্তু তাতে তাঁর কষ্ট নেই। তাঁকে নাগরিকত্ব দিলে তিনি খুশি হবেন।’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকর্মী দিপু হাফিজুর রহমান বলেন, ‘লুসি আমাদের এমনই বন্ধু, তাঁকে নাগরিকত্ব দিলে আমাদেরই সম্মান বাড়বে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনা হয়েছে বিষয়টি। আশা করি শিগগিরই আমরা সুসংবাদ পাব।’

বরিশালের জেলা প্রশাসক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘লুসি হল্ট দ্বৈত নাগরিকত্বের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বরাবর একটি আবেদন করেছেন। আবেদনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা-সেবা বিভাগে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে তাঁর ভিসা ফি মওকুফ করা হয়েছে।’

 

সিঁড়িতে বসেছিলাম আমরা

অক্সফোর্ড মিশন হোস্টেলের পুকুরের সিঁড়িতে সেদিন লুসির সঙ্গে বসেছিলাম। কথাবার্তার একপর্যায়ে নিয়ে গেলেন মিশনের ভেতরের কবরস্থানে। একপর্যায়ে  অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললেন, ‘এইখানে দেহ রাখতে চাই। আমি বাংলাকে ভালোবাসি। ভালোবাসি বরিশালকে।’



মন্তব্য