kalerkantho


ইতালিতে এক জোড়া স্যান্ডেল পাঠিয়েছেন জসিম

‘দাগ’ পাঠিয়েছিলেন কান চলচ্চিত্র উৎসবে। এখন নেপলস মানবাধিকার চলচ্চিত্র উৎসবে পাঠিয়েছেন ‘অ্যা পেয়ার অব স্যান্ডেল’। একটি বড় ছবি করবেন বলেই এত আয়োজন। ছবির টাকা জোগাড়ের জন্য টেক্সটাইল মিলও খুলেছেন। পিন্টু রঞ্জন অর্ককে আরো অনেক কথা বলেছেন জসিম আহমেদ

১১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ইতালিতে এক জোড়া স্যান্ডেল পাঠিয়েছেন জসিম

সুনামগঞ্জের বসিয়া খাউরী গ্রামে জন্ম। বাবা হাজি আরব আলী জলমহালের ইজারাদার ছিলেন।

মা আয়মনা বিবি গৃহিণী। আট ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট জসিম। ডানপিটে ছিলেন। সিলেটের আলিয়া মাদরাসা থেকে কামিল পাস করেছেন। এরপর ঢাকায় চলে আসেন ১৯৯১ সালে। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির অভ্যাস ছিল। স্থানীয় পত্রপত্রিকায় তাঁর গল্প-কবিতা ছাপা হয়েছে। ঢাকায় আসার পর সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। লাল-সবুজ, রূপালী, আজকের কাগজ হয়ে একসময় নিউজ এজেন্সি প্রোবে যোগ দেন। সংবাদের পাশাপাশি বিভিন্ন ডকুমেন্টারিও বানাত প্রোব। সেখান থেকেই লাইট-ক্যামেরার পাঠ নেন। একসময় নিজেই ডকুমেন্টারি বানাতে শুরু করেন। বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবসের মতো বিশেষ দিনগুলোয় টিভি কর্তৃপক্ষের চাহিদামতো ডকুমেন্টারি বানিয়ে দিতেন। একবার বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘উত্তরণ’ নামের একটি ডকুমেন্টারি বানালেন। বিটিভিতে প্রচারিত হয়েছিল। সেটা দেখেই জসিমকে ডেকে পাঠান বিটিভির তৎকালীন ডিজি সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী। বললেন, ‘আপনার কাজ ভালো লেগেছে। তবে টেকনিক্যাল কিছু ব্যাপার জেনে নিলে ভালো হয়। আমরা সাহায্য করব। আপনি আমাদের সঙ্গে কাজ করুন। ’ বিশেষ দিবসে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা বিটিভির অনেক দিনের রেওয়াজ। একবার বিজয় দিবস উপলক্ষে ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’ শীর্ষক একটি বিশেষ প্রকল্পে জসিমকে কাজ করার সুযোগ দেন জাকী সাহেব। জসিম সে প্রকল্পে অনেক গুণী নির্মাতার একজন হয়ে কাজটি ভালোভাবেই সম্পন্ন করেছিলেন। পরে ‘রক্তের অক্ষরে লেখা’ শিরোনামে একটি প্রামাণ্যচিত্র বানিয়েও তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর বানালেন ‘বন্দিশালায় নয় মাস’। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধু যে কারাগারে বন্দি ছিলেন, সেই কারাগারের গল্প নিয়েই ‘বন্দিশালায় নয় মাস’। বেশ কয়েকটি নাটকও বানিয়েছেন জসিম।

২০০১ সালে বন্ধু জাহিদ হোসেন অপুকে সঙ্গে নিয়ে ‘ভিউজ অ্যান্ড ভিশন’ নামের একটি প্রডাকশন হাউস খুললেন। ঠিক করলেন সিনেমা বানাবেন; কিন্তু প্রযোজক পাননি। সিনেমা যে তাঁকে বানাতেই হবে। বছর দুয়েক এম সিক্স নামের ফ্রান্সের একটি টিভি চ্যানেলে কাজ করেছেন। এই চ্যানেলে কাজ করতে গিয়েই কিছু ইউরোপিয়ান ব্যবসায়ীর সঙ্গে পরিচয় হয়। একসময় টেক্সটাইল ব্যবসায় জড়িয়ে গেলেন। ২০০৭ সালের দিকে নাসির উল্লাহ নামের এক আত্মীয়ের সঙ্গে মিলে একটি টেক্সটাইল মিলও দিলেন নরসিংদীতে। নাম জিএল ফ্যাব্রিক। ট্রাউজার আর জিপার বানাতেন। মাত্র ২০ জন লোক কাজ করত তখন। এখন তাদের তিনটি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে গ্লোবাল লেবেলস নামের প্রতিষ্ঠানটি আবার ঢাকা ইপিজেডে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩০০ জনের মতো মানুষ কাজ করছে।

ব্যবসা দাঁড়ানোর পরে আবার ভিউজ অ্যান্ড ভিশনকে সক্রিয় করলেন। বনানীতে অফিস নিয়ে পুরোদমে কাজ শুরু করলেন। বলেছেন, ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা বানানোর আগে একটু প্রস্তুতি দরকার। তারই অংশ হিসেবে কয়েকটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের সিনেমা বানাচ্ছি। ’ ২০১৭ সালের গোড়ায় জসিম নির্মাণ করলেন ‘দাগ’। ১২ মিনিট ১৩ সেকেন্ডের এই ‘দাগ’ নিয়ে হাজির হয়েছিলেন ৭০তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে। শর্টফিল্ম কর্নারে প্রদর্শিত হয়েছে ছবিটি। ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টেলিভিশন চ্যানেল শর্টস টিভি নেটওয়ার্কে প্রদর্শিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এই স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি। রোহিঙ্গাদের নিয়ে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা বানানোরও পরিকল্পনা আছে জসিমের।

 

অ্যা পেয়ার অব স্যান্ডেল​

 

অ্যা পেয়ার অব স্যান্ডেল

রোহিঙ্গাদের নিয়ে ছবি করার পরিকল্পনা অনেক আগে থেকেই ছিল। বন্ধু নজরুল ইসলাম মিঠু, ফরিদ আহমেদ সাজুকে নিয়ে কয়েকবারই বসেছি।

কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে গিয়েছিও কয়েকবার। কোনো নতুন খবর পেলেই যেতাম। ফ্রান্সের কান চলচ্চিত্র উৎসব থেকে ফেরার পর গেল জুনে আবার গিয়েছিলাম কক্সবাজারে। ইচ্ছা ছিল পুরো এক বছর সময় নিয়ে কাজটি করব। আগস্টেই খবর পেলাম রোহিঙ্গারা দলে দলে ঢুকছে। মিঠু জার্মানির একটি নিউজ এজেন্সিতে কাজ করে। আর সাজু আগে ছিল বিবিসির সংবাদকর্মী। মিঠু এবারও ঘটনাস্থলে গিয়ে রিপোর্ট করছিল। এর মধ্যে এলো ঈদের ছুটি।  ছুটির পরপরই হাজির হয়ে গেলাম কক্সবাজারে। সাজু, মিঠুসহ দলে পাঁচজন। সকাল সকাল রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হাজির হয়ে গেলাম। হাতে একটি আইফোন সেভেন প্লাস। সেটা দিয়েই ছবি তুলছিলাম। ভাবছিলাম পরে কোনো ফিচার লিখলে ছবিগুলো কাজে দেবে। সাজু মাঝে মাঝে ভিডিও করছিল। কুতুপালং ক্যাম্প ছিল সেটা। দ্বিতীয় দিন গিয়েছিলাম ঘুনধুম। তৃতীয় দিন শাহপরীর দ্বীপ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কারণ ট্রলারে চড়ে অনেকে আসছিল ওইদিকটা দিয়ে। শাহপরী যাওয়ার পথঘাট খুব একটা সুবিধার না। গাড়ি থেকে নেমে অনেকটা পথ হেঁটে যেতে হয়। ভাঙা রাস্তা, জল-কাদা মাড়িয়ে আমরা হাঁটছি। হঠাৎ বৃষ্টি নামল। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে দিলাম দৌড়। এক দৌড়ে জেটির কাছে চলে গেলাম। দেখলাম নৌকা বোঝাই হয়ে মানুষ আসছে। অনেক মানুষ। বেশির ভাগই নারী। প্রত্যেকের কোলে একটি করে বাচ্চা। একজন মহিলার কাছ থেকে একটি পলিথিন নিয়ে মাথা ঢাকলাম। আর ফোনটা বের করে ওদের ছবি তুলতে চাইলাম; কিন্তু বৃষ্টির কারণে ভালো ছবি আসছিল না। ভাবলাম, ছবি যেহেতু ভালো আসছে না, তাহলে ভিডিও করি। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে ভিডিও করা শুরু করলাম। একটি মহিলার দিকে নজর গেল। বয়স ২৭-২৮ এর মতো হবে। বোরকা পরা। কোলে একটি বাচ্চা। তাকেই ফলো করতে লাগলাম। নৌকা থেকে নামার সময় তিনি বাচ্চাকে আরেকজনের কাছে দিলেন। নিচে নেমে আবার কোলে তুলে নিলেন। এরপর একটু হেঁটে রাস্তার ধারে বসলেন। সেখানে আরো অনেকে ছিল। এর মধ্যে বৃষ্টি কিছুটা কমেছে। সারা দিন দ্বীপেই কাটল। বিকেলে গাড়িতে বসে ওদের সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিলাম। বললাম, ‘একটু এডিট করে ভিডিওটা ফেসবুকে আপলোড করব। মানুষজন দেখুক। ’

রাতে হোটেলে বসে বসে ছবি আর ফুটেজগুলো দেখা শুরু করলাম। একটি জায়গায় চোখ আটকে গেল। শুটিংয়ের সময় এটা খেয়াল করিনি। দেখলাম, একটি বাচ্চা একবার নিচে তাকাচ্ছে, আরেকবার ওপরের দিকে। এরপর এক জোড়া স্যান্ডেল ওপরে তুলে ধরল। ওই বাচ্চা কোলের মহিলা যেখানে বসে ছিলেন, তার পাশেই ছিল এই বাচ্চাটা। চিৎকার দিয়ে সাজুকে ডাকলাম। দৃশ্যটা দেখালাম।

ওকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বল তো, বাচ্চাটা স্যান্ডেল কাকে দেখাচ্ছে?’

—‘আপনারে। ’

—ইয়েস। দিস ইজ দ্য স্টোরি। ‘ও আমাকে স্যান্ডেল দেখাচ্ছে। মানে মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে দেখাচ্ছে। বিশ্বমোড়লদের দেখাচ্ছে। ’

তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম, এটা আর ফেসবুকে দেব না; বরং আরো কিছু ছবি তুলব কাল। সাজুকে বললাম, কাল দুটি ক্যামেরায় শুট করব। তোমারটা আর আমারটা। পরে রোহিঙ্গাদের আগমনের সব পয়েন্টে আরো তিন দিন শুট করেছি। এরপর ঢাকায় ফিরেছিলাম। ঢাকায় এসে সাজুকে বললাম, রোহিঙ্গাদের নিয়ে কিছু তথ্য একত্রিত করো। সাবটাইটেলে দেব। এডিট করার জন্য বসলাম। প্রায় ৬০ মিনিটের ফুটেজ। প্রথমে কাটাকুটি করে ছয় মিনিটের মতো রাখলাম; কিন্তু মেজাজ শান্ত রাখতে পারছিলাম না। কারণ গল্পটা দাঁড়ায়নি। পরদিন ভাবলাম শুধু। একবার ছাদে গিয়ে আবার ঘরে ফিরে আবার ছাদে গিয়ে। সব ফুটেজ আবার দেখলাম। তারপর গল্পটা মনে মনে বুনলাম—শাহপরী দ্বীপ দিয়ে স্রোতের মতো ঢুকছে  রোহিঙ্গারা। করছে আশ্রয়ের খোঁজ। পথে তাদের মতোই আরো মানুষের দুর্দশা দেখছে। হাহাকার করছে ভিটাহারা মানুষ। শেষ হবে শিশুর হাতের জুতা ওপরে উঠে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। সারা দিন ধরে এডিট করার পর মনে হলো কিছু একটা দাঁড়িয়ে গেছে। সাজুকে ফোন দিয়ে বললাম, এটা সিনেমা হয়ে গেছে। এরপর সাউন্ড ডিজাইনার রিপনকে (রিপন নাথ) ফোন করলাম। সে তখন ‘ডুব’ সিনেমার ট্রেইলার নিয়ে ব্যস্ত। বলল, ‘মেইলে পাঠান’। পাঠালাম। দেখে বলল, ‘ভাই, চেষ্টা করলে আপনি এটাকে আরো ভালোভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন। ’ পরে আবার এডিট করলাম। এবার দৈর্ঘ্য দাঁড়াল চার মিনিট ১৪ সেকেন্ড। জিতুকে দিয়ে কালার এডিট করালাম। এর মধ্যে ডেইলি স্টারের রাফি হোসেন ভাই বললেন, ‘আপনি ছবিটা রটারডামে (রটারডাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব) দিচ্ছেন না কেন?’ পরে সেখানে যোগাযোগ করলাম। তত দিনে সাবমিশনের সময়সীমা শেষ।

এরপর নেট ঘেঁটে দেখলাম, সামনে আছে ইতালির নেপলস মানবাধিকার চলচ্চিত্র উৎসব। ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। সেখানেও সিনেমা জমা নেওয়া শেষ! তবুও মেইল করলাম। ওরা সিনেমার লিংক পাঠাতে বলল। ১৫ অক্টোবর লিংকটা পাঠালাম। দেখে ২০ অক্টোবর জবাব দিল, সিনেমাটা জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে আপনাকে। জানলাম, উৎসবে প্রদর্শনের জন্য নির্বাচিত ৯টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের একটি হচ্ছে ‘অ্যা পেয়ার অব স্যান্ডেল’। আজ ১১ নভেম্বর শেষ হচ্ছে নেপলস উৎসব। শুরু হয়েছিল ৬ নভেম্বর। ‘অ্যা পেয়ার অব স্যান্ডেল’ দেখানো হয়েছে ৮ নভেম্বর।

 

মন্তব্য