kalerkantho


ফেসবুক থেকে পাওয়া

মানসিক হাসপাতালে দ্বিতীয়বার

২১ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



হাসান দুলাভাইয়ের বাড়ি বেড়ানোর উপলক্ষে আরো একবার যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল পাবনা মানসিক হাসপাতালে। মনে পড়ছিল সাড়ে তিন বছর আগে প্রথমবার যাওয়ার কথা।

তখন বেশ কয়েকজনের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। অনেকের চেহারাই মনে আছে, কিন্তু নাম মনে আছে শুধু বাবু ভাইয়ের (গিটার বাবু)। হাসপাতালের বাইরে বাঁ দিকের একটি ভবনের নিচতলায় থাকতেন। ভালো গান গাইতেন আর একটা গিটার ছিল বলেই তিনি ‘শিল্পী’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তখনই জেনেছিলাম তিনি সুস্থ হওয়া সত্ত্বেও ইচ্ছা করেই বাড়ি যান না।

সাড়ে তিন বছর পর আবারও তাঁর সঙ্গে দেখা হবে ভেবেছিলাম। তাঁর রুমের জানালাটা বন্ধ ছিল। তাই গেটে দায়িত্বে থাকা এক গার্ডের কাছে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘বাবু ভাই আছেন? ওই যে ভালো গান গাইতেন!’ তিনি বললেন, “কোন বাবু? ও ‘গিটার বাবু’? না, ‘গিটার বাবু’ বাড়ি চলে গেছে। ”

তাঁর বাড়ি যাওয়ার খবরে খুশি হয়ে যখন বাইরে বের হয়ে আসলাম, তখন দোতলা থেকে একজন মানসিক রোগী বললেন, ‘ভাই, ভালো আছেন? আমার বড় ভাই একেবারে আপনার মতো।

বরিশাল ক্যাডেট কলেজ থেকে পাস করে পরে ঢাকা ভার্সিটিতে পড়েছে। আপনার কাছে কী মোবাইল আছে? আমার বড় ভাইয়ের নাম আব্দুল্লাহ। তাঁর নাম্বারে একটু কল করবেন?’ হাসান ভাইয়ের হাতেই মোবাইল ছিল। তিনি নাম্বার শুনে কল করলেন। কিন্তু নাম্বারটা বন্ধ। আমরা তাঁর নাম জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, ‘আমার নাম রেজোয়ান। ’ রেজোয়ান এবার বললেন, ‘ভাই, আমার ভাইয়ের নাম্বারটা পরে খোলা পেলে বলবেন সাতাইশ তারিখ একটা রিলিজের ডেট আছে। ওই দিন আসলে আমি যেতে পারব। ’ তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ছিল আরো দুজন। একজনের মাথা এমনিতেই টাক, আর বাকি দুজনের মাথা কামানো। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই, আপনাদের সবার মাথা কামানো কেন?’ রেজোয়ান ভাই বড়ই সাদাসিধা উত্তর দিলেন, ‘এখান থেকেই আমাদের মাথা কামিয়ে দিয়েছে। আমাদের মেনটাল সমস্যা তো, তাই। ’

এমন সময় আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আমার ভাগ্নি রোযা আমাকে জিজ্ঞেস  করল, ‘মামা, এই মানুষগুলো এখানে কেন?’ আমি বললাম, ‘এদের সুস্থ মনে হলেও সবারই কমবেশি মানসিক সমস্যা আছে। ’ ঠিক তখনই একজন লতা আপুকে বললেন, ‘আপু, এই আপু! আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন?’ লতা আপু উত্তর দিলেন। কিছুক্ষণ পরে আবারও সেই তিনি আবারও বললেন, ‘আপু, এই আপু! আসসালামু আলাইকুম। ’

সময়স্বল্পতার কারণে আমরা বেশিক্ষণ থাকতে পারিনি। গাড়িতে উঠতেই রোযা বলল, ‘আমি এখানে আবারও আসব। ’ তখন হাসান ভাই রসিকতা করে বললেন, ‘হ্যাঁ, তোর বাপ যখন এখানে থাকবে, তখন সব সময়ই আসতে পারবি। ’ বাবার এমন কথায় রোযার প্রতিক্রিয়া দেখতে আমরা সবাই ওর দিকে তাকালাম। দেখি ওর দুই চোখে অশ্রুর বৃষ্টি। বাবার এমন উদ্ভট কথা শুনে না, ও কাঁদতে শুরু করেছিল মানসিক রোগীদের অবস্থা দেখার পর থেকেই। আমি রোযার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ভাবলাম ওর মতো দর্শনার্থী হয়তো খুব কমই মানসিক হাসপাতালে যায়, যারা মানসিক রোগীদের অস্বাভাবিক আচরণ দেখে ও উদ্ভট কথা শুনে না হেসে নীরবেই চোখের অশ্রু ঝরায়।

পাবনা থেকে ঢাকা ফেরার পথে ভাবছিলাম শুধু একজন রেজোয়ান না, অনেক রেজোয়ানই হয়তো সুস্থ হয়ে বাড়ি যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে প্রতিদিন। কিন্তু আপনজনরা তাদের খোঁজ নেওয়ারও সুযোগ পায় না। আর তাই অভিমানে আর মনঃকষ্টে ইচ্ছা করেই অনেক মানসিক রোগী মানসিক হাসপাতালে দীর্ঘসময় পার করে দেয় ‘গিটার বাবু’র মতো।

 

সায়েক আহমেদ সজীব, ইংরেজি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য