kalerkantho


তোমায় সালাম

হ্যারিয়েট বিচার স্টো

১০ জুন, ২০১৭ ০০:০০



হ্যারিয়েট বিচার স্টো

জনশ্রুতি আছে, আব্রাহাম লিংকনের সঙ্গে হ্যারিয়েটের দেখা হয়েছিল ১৮৬২ সালে। লিংকন বলেছিলেন, তাহলে আপনিই সেই ছোট মানুষ, যিনি এই বড় যুদ্ধটা লাগালেন। হ্যারিয়েট বিচার স্টো লিখেছেন আংকেল টমস কেবিন। দাসত্ববিরোধী এ বই নাড়িয়ে দিয়েছিল আমেরিকা দেশটিকে। ১৪ জুন তাঁর জন্মদিবস সামনে রেখে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন আব্দুল্লাহ আল মোহন

 

১৮৬১ সালে গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে আমেরিকা। এ যুদ্ধের পেছনের একটি বড় কারণ দাসপ্রথা। একদল ছিল এ প্রথার পক্ষে, অন্য দল এর বিলোপ চাইছিল। আর দাসপ্রথার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিপুল সচেতনতা তৈরিতে কাজ করেছেন হ্যারিয়েটের আংকেল টমস কেবিন। প্রকাশের প্রথম বছরেই তিন লাখ কপি বিক্রি হয়ে গিয়েছিল বইটির। বলা হয়ে থাকে, বাইবেলের পরে আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া বই এটি। আংকেল টমস কেবিন প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৫২ সালে। উইল কফম্যানও বলেছেন, আংকেল টমস কেবিন আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পটভূমি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। কফম্যান সেন্ট্রাল ল্যাংকাশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আমেরিকান সাহিত্য ও সংস্কৃতির অধ্যাপক এবং আমেরিকান কালচার বইয়ের লেখক।

 

জোশিয়া প্রেরণা দিয়েছে

স্টো ছিলেন একজন সক্রিয় অ্যাবলশনিস্ট (দাসপ্রথা বিলোপ আকাঙ্ক্ষী)। ১৮৫০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস পলাতক দাস আইন পাস করে। এই আইনে পলাতক দাসদের ধরে তার মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়। মালিকরা এই আইনের বদৌলতে কুকুর নিয়ে দাস খুঁজতে বের হতো। অ্যাবলশনিস্টরা তাই আইনটিকে ডাকতেন ব্লাডহাউন্ড ল বলে। স্টো জোশিয়া হেনসনের লেখা পড়েছিলেন। প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৪৯ সালে। এর পুরো নাম ছিল, দ্য লাইফ অব জোশিয়া হেনসন, ফরমারলি অ্যা স্লেভ, নাউ অ্যান ইনহ্যাবিট্যান্ট অব কানাডা, অ্যাজ ন্যারেটেড বাই হিমসেল্ফ। স্টো পরে বলেছেন, জোশিয়ার লেখা থেকে আমি অনুপ্রেরণা পেয়েছি। জোশিয়া মেরিল্যান্ডের একটি টোব্যাকো ক্ষেতে দাস হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৮৩০ সালে অন্টারিওতে পালিয়ে গিয়ে তিনি দাসত্ব থেকে মুক্তি পান। স্টো প্রেরণা পেয়েছেন থিওডোর ডুইট ওয়েল্ড এবং গ্রিমকে সিস্টারসের লেখা আমেরিকান স্লেভারি অ্যাজ ইট ইজ : টেস্টিমনি অব অ্যা থাউজ্যান্ড উইটনেস থেকেও। স্টো বলেছেন, কয়েকজন পলাতক দাসের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তিনি। তারা কেনটাকি থেকে ওহাইও নদী পার হয়ে এসেছিল সিনসিনাটিতে। ১৮৫৩ সালে অ্যা কি টু আংকেল টমস কেবিন নামের লেখায় স্টো তাঁর সূত্র ও অনুপ্রেরণা নিয়ে কথা বলেছেন।

 

বইটি নিয়ে

দুনিয়া কাঁপানো বইগুলোর একটি হলো আংকেল টমস কেবিন। প্রথমে দ্য ন্যাশনাল এরায় (অ্যাবলশনিস্টদের পক্ষের পত্রিকা, ওয়াশিংটন ডিসি থেকে প্রকাশিত হয়েছে, ১৮৪৭-১৮৬০, সাপ্তাহিক) ৪০ কিস্তিতে ছাপা হয়। প্রথম কিস্তি প্রকাশিত হয়েছে ১৮৫১ সালের ৫ জুন। লেখা জনপ্রিয় হওয়ায় এরার প্রকাশক একে বই করার পরামর্শ দেন। স্টো রাজি হলে ১৮৫২ সালের ২০ মার্চ বই আকারে প্রকাশিত হয় আংকেল টমস কেবিন। প্রথম দিনেই তিন হাজার কপি বিক্রি হয়ে যায়। বইটি বিশ্বের প্রায় সব প্রভাবশালী ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।

 

একজন হ্যারিয়েট

১৮১১ সালের ১৪ জুন যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটের লিচফিল্ডে জন্মগ্রহণ করেন হ্যারিয়েট। তাঁর বাবার নাম রেভারেন্ড লেম্যান বিচার আর মায়ের নাম রোকসানা ফুটি বিচার। হ্যারিয়েটরা ছিল ১৩ ভাই-বোন। তাঁর বাবাও ছিলেন দাসপ্রথা উচ্ছেদের পক্ষে। বাবার কাছ থেকেই দাসপ্রথাবিরোধী মনোভাব পেয়েছেন স্টো। একসময় সমমনা বন্ধুদের নিয়ে সামাজিক আন্দোলনও শুরু করেছিলেন স্টো। গড়ে তুলেছিলেন একটা ক্লাব। নাম থসেমি কোলন ক্লাব। ধর্মযাজক বাবার মেয়ে হ্যারিয়েট কিছুকাল শিক্ষকতা করেন। মানবহিতৈষী এই লেখিকা ১৮৯৬ সালের ১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় মৃত্যুবরণ করেন। পাঁচ বছর বয়সে মাকে হারান স্টো। বই পড়ার নেশা তাঁর ছোটবেলা থেকেই ছিল। সবচেয়ে প্রিয় ছিল আরব্য রজনী। বড় বোন ক্যাথেরিনের কাছে লেখাপড়া শেখা শুরু করেন। দাসদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন দেখে বড় হয়েছেন স্টো। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ অংশে নির্যাতন ছিল বেশি। ১৮৫১ সালে আসলে স্টোর পরিকল্পনা ছিল উত্তরের (ভার্জিনিয়া, আরকানসাস, নর্থ ক্যারোলিনা ইত্যাদি অঙ্গরাজ্য) মানুষদের দাসপ্রথার ভয়াবহতা সম্পর্কে জানানোর। সে পরিকল্পনা থেকেই লিখতে শুরু করেন ন্যাশনাল এরায়। উল্লেখ্য আমেরিকার দক্ষিণের অঙ্গরাজ্য যেমন সাউথ ক্যারোলিনা, লুইজিয়ানা, মিসিসিপি, ফ্লোরিডা, অ্যালাবামা, জর্জিয়া ছিল দাসপ্রথার পক্ষে।  

 

বইটির গল্প এমন

আংকেল টম কেন্টাকির এক খামারের দাস। তার মালিকের নাম আর্থার শেলবি। শেলবির ছেলে জর্জ টমকে খুব ভালোবাসে। কিন্তু টাকার অভাব হওয়ায় শেলবি টমকে বিক্রি করে দেন ক্লেয়ারের কাছে। ক্লেয়ারের ছোট্ট মেয়ে ইভার সঙ্গে ভালো বন্ধুত্ব হয় টমের। ইভা স্বপ্ন দেখত এমন এক পৃথিবীর, যেখানে মানুষে মানুষে বিভেদ নেই। কঠিন অসুখে ভুগে ইভা মারা যায় অল্প বয়সেই। আবার টমকে বিক্রি করা হয় সাইমন লেগরির কাছে। লেগরি ভীষণ অত্যাচার করত টমকে। একসময় টমের মুক্তির জন্য ছুটে আসে প্রথম মালিকের ছেলে জর্জ। কিন্তু তার আগেই লেগরির অত্যাচার সইতে না পেরে দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নেয় টম।



মন্তব্য