kalerkantho


এগিয়ে যাও বাংলাদেশ

ছোট্ট পায়ের স্বপ্ন

২০ মে, ২০১৭ ০০:০০



ছোট্ট পায়ের স্বপ্ন

অজপাড়াগাঁয়ের স্কুল হলেও উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের সব টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তার দল। সব খেলায় সেরার তকমা পেয়েছে নিজে।

দলকে বিভাগীয় পর্যায়ের ফাইনালে নিয়ে গেলেও নিজের খেলা হয়নি প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকের ছাত্রী বনে যাওয়ায়। ফুটবল নিয়ে ঈশিতার অনেক স্বপ্ন। জানাচ্ছেন চন্দন চৌধুরী

ফুটবলে প্রথম কবে পা ঠুকিয়েছে সঠিক বলতে পারল না ঈশিতা। একটু ভেবে বলল, তৃতীয় শ্রেণিতে স্কুলমাঠে খেলতে নেমেছিল। স্কুলদল উপজেলা পর্যায়ে খেলতে যাবে। হোমনা উপজেলা বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ ছিল সামনে। স্কুলের মাঠে প্র্যাকটিস করতে গিয়েই নজর কাড়ল সবার। আর প্রথম দিনই হয়ে উঠল দলের অনিবার্য একজন। কুমিল্লার হোমনা উপজেলার পাথালিয়াকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী তখন ঈশিতা আক্তার। কারো কাছেই ফুলবল খেলা শেখা হয়নি। ফুটবলের এতটুকু জ্ঞানও ছিল না। আর নিজেও ভাবেনি তাকে দিয়ে কোনো দিন ফুটবল খেলা হবে। ঈশিতা বলল, ‘মুর্শিদ স্যারই শিখিয়ে দিলেন কিভাবে খেলতে হয়। ’ এরপর এই মেয়েটাই হয়ে উঠল স্কুলদলের কাণ্ডারি। দলকে নির্দেশনা দিল সামনে থেকে। প্রথম বছরই হলো উপজেলার সেরা খেলোয়ার। চ্যাম্পিয়ন করিয়ে আনল নিজের স্কুলকে। সেটা ২০১৪ সালের কথা। আর সেই সুবাদেই কুমিল্লা জেলাপর্যায়ে খেলতে যায় অজপাড়াগাঁয়ের এই স্কুলদল। সেবার সেমিফাইনাল খেলেই ফিরতে হয়েছে তাদের।

পরের বছরই মনের দুঃখ ঘোচাল। ঘরে তুলল ফজিলাতুন্নেছা গোল্ডকাপ। নজর দিল জেলা টুর্নামেন্টে। সব স্কুলকে হারিয়ে হলো জেলা চ্যাম্পিয়ন। সেরার মুকুট পরল নিজে।

২০১৫ সালে জেলাপর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় বিভাগীয় পর্যায়ে চট্টগ্রাম খেলতে যায় তার দল। যথারীতি সেখানেও চমক দেখাল সে। প্রাথমিক পর্যায়ে সব দলকে হারিয়ে ফাইনালে নিয়ে গেল স্কুলকে। কিন্তু ঈশিতা নিজেই জানত না যে ফাইনালে খেলতে পারবে না। তত দিনে সে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিকের ছাত্রী। আর তাই ফাইনাল খেলতে যাওয়া হলো না তার। ফলে যা হওয়ার হলো, হেরে এলো দল। রানার্স আপের ট্রফি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হলো পাথালিয়াকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে।

খেলতে খেলতেই ফুটবলের সঙ্গে প্রেম হয়ে গেল মেয়েটির। এখন নাওয়া-খাওয়া ভুলে ফুটবল নিয়েই সময় কাটে। বাবা ইকবাল হোসেন রিকশাচালক। অন্যের জমি বর্গায় চাষবাদও করেন। তার পরও দুই মেয়ে এক ছেলে নিয়ে অভাবে দিন কাটে তাদের। সাধ থাকলেও মেয়ের ফুটবল প্রতিভাকে বিকশিত করার সাধ্য নেই। তিনি বললেন, ‘মেয়েটা ভালো ফুটবল খেলে। আমিও চাই সে যেন জাতীয় পর্যায়ে খেলতে পারে। দেশের জন্য খেলতে পারে। কিন্তু আমার তো তাকে ঢাকা নিয়ে কোচিং করানোর সামর্থ্য নাই। ’ ফুটবলের প্রতি মেয়ের ভালোবাসা দেখে ঈশিতার মা সুখি বেগমও চান মেয়ে ফুটবলার হোক।

ঈশিতা এখন দুলালপুর চন্দ্রমণি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী। দুলালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন সওদাগর বলেন, ‘বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনসহ সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে ঈশিতার ফুটবল প্রতিভা বিকশিত হবে। জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন দেখতে পারবে মেয়েটি। ’

এখন টিভিতেও খেলা দেখে ঈশিতা। ভালো লাগে মেসির খেলা দেখতে। যারা তার খেলা দেখেছে, সবার একই কথা, মেসির খেলার ছাপ রয়েছে তার খেলার মধ্যে। এলাকায় অনেকে তাকে খুদে মেসি বলে। ক্রিকেটেও মন দিয়েছে সে। কিন্তু ফুটবলই তার ধ্যান-জ্ঞান। কিছু দিন আগে কুমিল্লায় খেলোয়াড় বাছাই পর্বে গিয়েছিল। এখনো ফলাফল হয়নি। ঈষিতা বলল, ‘ফুটবলটাকে ভালোবাসি। এই খেলাটাই খেলতে চাই। ’


মন্তব্য