kalerkantho


কীর্তিমান বাংলাদেশি

আশিরের তথ্যযোগ

জাপানের কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আশির আহমেদ। গবেষণা করছেন বাংলাদেশের গ্রামগুলোর তথ্যব্যবস্থাপনা নিয়ে। তিনি জানতে চান তথ্য কিভাবে জন্ম হয়, কিভাবে হারিয়ে যায়। অথচ এসব তথ্য গ্রামবাসীর আয়ের উৎস হতে পারে। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন ফারিয়া মৌ

২২ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



আশিরের তথ্যযোগ

বোর্ডের মেধাতালিকায় নিজের নাম দেখে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না আশির। শখ ছিল বুয়েটে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার; কিন্তু আসন মাত্র  ৩০টি হওয়ায় পেলেন পুরকৌশল (সিভিল) বিভাগ। বাবা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, চাচাতো-জেঠাতো ভাই সব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। এক পরিবারে আর কতজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার! ভাবলেন, স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পড়তে যাবেন।

তখনো ইন্টারনেট আসেনি। তাই বিদেশে পড়ার সুযোগ বা বৃত্তি সম্পর্কে জানা সহজ ছিল না। আশিরের মনে এলো, বিভিন্ন দূতাবাসের গিয়ে খবর পাওয়া যেতে পারে। এক দিনে ১৩টি দূতাবাসে গেলেন। জাপান দূতাবাসে জানতে পারেন কিছুদিনের মধ্যেই স্কলারশিপের বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে। সেই বৃত্তিতেই ১৯৮৮ সালের অক্টোবর জাপান যান তিনি।

প্রথমেই জাপানিজ ভাষা স্কুল, তারপর শুরু কম্পিউটার শেখা। ১৯৯৩ সালে কম্পিউটার কেনেন। তৈরি করছিলেন একটা সিম্পল অ্যাড্রেস বুক। বন্ধুদের নাম, ঠিকানা, টেলিফোন নম্বর ব্যবহার করে কাজ শুরু করেন। সে তালিকায় ছিল ঢাকা কলেজ ও কুমিল্লা জিলা স্কুলের বন্ধুদের নাম। পাশাপাশি নিজের গ্রাম চাঁদপুরের এখলাসপুর প্রাইমারি স্কুলের বন্ধুদের নাম যোগ করতেই এক বিরাট কৌতূহল মাথায় চেপে বসে। প্রথম শ্রেণিতে ৬০-৭০ জন ছিল। পঞ্চম শ্রেণি পাস করে মোটে ১৪ জন। ৮০ শতাংশই ঝরে গেছে। এরপরের গল্পটা অনেকের অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে। ১৯৯৩ সালে ছুটিতে দেশে আসেন ড. আশির। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের সহযোগিতায় ১০ বছরের তথ্য নেন। ১৯৮২ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত। দেখতে পান প্রায় ৪৭ শতাংশ ছেলে-মেয়ে প্রাইমারি স্কুল পাড়ি দেওয়ার আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। এর কারণ জানতে প্রায় ১১০০ পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করলেন। জরিপে দেখা গেল স্কুলবিমুখ ছেলে-মেয়েদের ৭১ শতাংশই ওই সময়টায় খেলাধুলা করে। অনেকে আবার খেলাধুলাও করে না। অন্যরা কী করে শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে।

স্কুলে এদের কিভাবে ধরে রাখা যায়, গ্রামবাসীদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করলেন আশির। প্রথম শুরু করলেন চকোলেট থিওরি। স্কুলে এলে চকোলেট দেওয়া হবে। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকরা জানালেন, যে পিরিয়ডে চকোলেট দেওয়া হয়, তাতে বেশির ভাগ ছাত্র থাকে। শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে পদ্ধতি পাল্টানো হলো। নিজের স্কলারশিপের টাকা থেকে এক অংশ ৩০ জন স্কুলবিমুখ গরিব ছাত্রকে মাসিক ৩০০ টাকা করে বৃত্তি প্রদান শুরু করেন। একজন সেক্রেটারি আর কয়েকজন ভলান্টিয়ার নিলেন। মাসে ১৫ হাজার টাকা দিয়ে কত বড় কাজ! এই বৃত্তি ছিল অন্য রকম—

১. বৃত্তির উদ্দেশ্য মেধাবী নয়, সাধারণ ছাত্র তৈরি। প্রতিদিন স্কুলে উপস্থিত থাকতে হবে। এক দিন অনুপস্থিতিতে ৩০ টাকা, তিন দিন স্কুলে অনুপস্থিত থাকলে কোনো টাকাই দেওয়া হবে না। এতে উপস্থিতির হার বেড়ে হলো ৯৮ শতাংশ।

২. বছরে একবার ঢাকায় শিক্ষা সফর। জাদুঘর, নভোথিয়েটার, নন্দন পার্ক দেখিয়ে আত্মবিশ্বাস বাড়ানো।  

৩. সমাজে তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে এমন কিছু করা। নিজের নামে বছরে একটা করে গাছ লাগানো।

এ উদ্যোগের কথা জেনে আশিরের জাপানি বন্ধু ‘কানো’ পাশে এসে দাঁড়ান। আশির আহমেদের ডাক নাম বাবু, সঙ্গে জাপানি বন্ধুর নাম যোগ করে ১৯৯৫ সালে এলাকায় গড়ে তোলা হয় ‘বাবু-কানো পাঠাগার’। ১৯৯৭ সাল থেকে এখলাসপুর ইউনিয়নের চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয় বৃত্তির আওতায় আনা হলো। ২২ বছরে বাবু-কানো পাঠাগার থেকে প্রায় এক হাজার ৩০০ ছাত্রকে বৃত্তি দেওয়া হয়েছে।

২০০১ সাল থেকে ড. আশির চাকরির সুবাদে সেন্দাই শহর থেকে টোকিও চলে যান। এতে জাপানি বন্ধু কানোর সঙ্গে যোগাযোগে ভাটা পড়ে। ২০০৪ সাল থেকে একাই বৃত্তির কার্যক্রম চালিয়ে যেতে লাগলেন আগের মতো।  

১৯৯৬ সালের কথা। তখনো গ্রামে নিয়মিত পত্রিকা পাওয়া যেত না। গ্রামে কিভাবে তথ্য পৌঁছে, সঠিক তথ্যের অভাবে কিভাবে গ্রামবাসী সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে সে নিয়ে সমীক্ষা শুরু করেন আশির। ঢাকা থেকে এখলাসপুর ৫০ কিলোমিটার। মাঝখানে পাঁচটি নদী। এই নদী পার হয়ে গ্রামে দৈনিক পত্রিকা পৌঁছে না। তিনি পত্রিকা সরবরাহ প্রকল্প শুরু করলেন। সদরঘাট থেকে প্রতিদিন চাঁদপুর যেতে কিছু লঞ্চ এখলাসপুরে যাত্রী নামায়। হকারদের সঙ্গে আলোচনা করে পাঁচটি পত্রিকার ব্যবস্থা করলেন। লঞ্চের ড্রাইভার (সারেং) বিনা পয়সায় সেই পত্রিকা এখলাসপুরে লঞ্চঘাটে পৌঁছে দিতে রাজি হন। লঞ্চঘাট থেকে পাঠাগারের কর্মীরা স্কুলে স্কুলে পত্রিকা পৌঁছে দেবেন। প্রতিদিন দুপুরের আগেই স্কুলে পত্রিকা পৌঁছে যেত।

তথ্যের প্রতি গ্রামবাসীর আগ্রহ তাঁকে বিস্মিত করেছে। এরপর গ্রামের চা-দোকানের আড্ডাগুলোর বিষয় হয়ে গেল পত্রিকার সমসাময়িক টপিকগুলো। পত্রিকা দেওয়া হচ্ছিল শুধু স্কুলগুলোতে আর পাঠাগারে। এর পাঁচ বছর পর ২০০১ সালে আশির গ্রামে ফিরে দেখেন একইভাবে গ্রামের এক বৃদ্ধ চাচা প্রতিদিন ৬৪টি পত্রিকা বিক্রি করছেন। বৃদ্ধ চাচার সঙ্গে কথা বললেন, ‘আপনার মতো পাঁচজন লোক চাই। ’ ২০০৫ সালে শুরু হলো পুরো মতলব থানার গ্রামগুলোতে পত্রিকা পৌঁছে দেওয়ার প্রকল্প। ১১৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চারজন বাহকের মাধ্যমে পত্রিকা পৌঁছে দেওয়া শুরু হলো। দেখা গেল গ্রাহকের কাছে বিলির সময় তারও চারগুণ পত্রিকা অন্যরা কিনে নেয়। একটি পত্রিকা যদি আট টাকা হয়, পাঠাগার ঢাকা থেকে কেনে ছয় টাকায়। বাকি দুই টাকার এক টাকা বাহকের আর বাকি এক টাকা পাঠাগারের। পাঠাগার এই টাকা দিয়ে স্কুলে স্কুলে বিনা টাকায় পত্রিকা সরবরাহ শুরু করে। প্রায় ৫০০ পত্রিকা গ্রামের চায়ের দোকান, পাঠাগার, ধর্মীয় উপাসনালয়ে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এভাবে গ্রামে তথ্য সহজলভ্য করে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন ড. আশির। এ কারণে ২০০৬ সালে তাঁকে ‘সাদা মনের মানুষ’ উপাধি দেওয়া হয়। সে বছরই ড. মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন এবং এর কিছুদিন পরই একটা কনফারেন্সে জাপান সফরে যান। সেখানেই ড. ইউনূসের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ। পরে তিনি জাপানের কিউশু ইউনিভার্সিটি আর গ্রামীণ কমিউনিকেশন্সের যৌথ উদ্যোগে ‘গ্লোবাল কমিউনিকেশন্স সেন্টার’ গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন করেন এবং প্রকল্প পরিচালক হিসেবে যোগ দেন।

১৯৯৯ সালে জাপানের তোহকু বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্যবিজ্ঞানের ওপর পিএইচডি করে সেখানকার তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে হাইস্পিড ইন্টারনেট নিয়ে গবেষণা করেন আশির। ২০০০ সালে তাঁর অধীনে স্থাপন হয় তোহকু বিশ্ববিদ্যালয়ের গিগাবিট নেটওয়ার্ক অফিস। ২০০০-২০০২ সাল পর্যন্ত কাজ করেন আমেরিকার এভায়া ল্যাবে (সাবেক বেল ল্যাব)। তারপর জাপানের এনটিটি কমিউনিকেশন্সে। এখন গবেষণা করছেন কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়ে। জাপানের জীবন নিয়ে লিখেছেন তিন খণ্ডে ‘জাপান কাহিনি’। স্ত্রী নুরেন আবেদীনকে নিয়ে জাপানেই থাকেন এই বাঙালি গবেষক।


মন্তব্য