kalerkantho

রসের কারিগর

রতন ঘোষ

৮ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



রতন ঘোষ

টাঙ্গাইল শহরের পাঁচানি বাজারের মিষ্টিপট্টির জয়কালী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। ২০ শতকের ত্রিশের দশকে খোকা ঘোষ প্রতিষ্ঠা করেন এ দোকান। জয়কালীর মিষ্টি ঢাকার রাষ্ট্রপতি ভবনও চেনে। তবে বেশি লোকে চেনে না রতন ঘোষকে

পাতলা কাপড়ের পোঁটলায় পানি ঝরিয়ে দুধের ছানাগুলো এখন ঝরঝরে। কারিগররা পোঁটলাগুলো ওজন করে ঢেলে রাখছে বড় বড় অ্যালুমিনিয়ামের ডিশে। কারখানার দক্ষিণের দেয়াল ঘেঁষে মেঝেতে রাবারের মাদুর পাতা। মাদুরের পূর্ব দিকে রাখা হলো বড় একটি পিঁড়ি, তার ওপর চটের বস্তা দিয়ে গদি করা। আর সামনে দুই ভাঁজ করা আরেক তোড়া চটের বস্তার ওপর রাখা হলো মস্ত বড় একটা বারকোশ। স্টিল আর অ্যালুমিনিয়ামের আরো কিছু ছোট-বড় খুঞ্চি রাখা হলো দুই পাশে। কেউ কেউ এসে বসে পড়ল মাদুরে। কাঠের বড় বারকোশটা ঘিরে। অপেক্ষা করতে থাকল বসে বসে। কারোর অপেক্ষা বুঝি! 

 

তিনি এলেন

খানিক বাদেই এলেন। কাঁচা-পাকা চুল। পেছনের দিকে আঁচড়ানো। গলায় তিন প্যাঁচের রুদ্রাক্ষের মালা। গায়ে একরঙা ফতুয়া। ‘ইনিই আমাদের প্রধান কারিগর’—পরিচয় করিয়ে দিলেন খোকা ঘোষের বিলাত-ফেরত নাতি সমীর ঘোষ। সমীর লন্ডনে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক। দেশে ফিরে এসেছেন বাপ-দাদার ব্যবসা দেখশোনা করবেন বলে। ‘পিশেমশাই, ইনি এসেছেন ঢাকা থেকে, আপনার সঙ্গে কথা বলতে।’

আমাকে দেখে মুচকি হাসলেন, ‘বলেন, কী জানতে চান?’

‘আপনার কথা, আপনার বানানো মিষ্টির কথা।’

কারখানায় একটা তক্তপোশ ছিল। তাতেই আমরা বসলাম পাশাপাশি।

আমি রতন ঘোষ

‘কালিহাতীর নিশ্চিন্তপুর গ্রামে আমার জন্ম। বাবা মণীন্দ্রমোহন ঘোষ। মা পান বালা। দুধের কাজ আমাদের বংশগত। আগে এলাকায় মিষ্টির দোকান করতাম। ২৫ বছর আগে খোকা ঘোষের ছেলে স্বপন ঘোষ আমাকে নিয়ে আসে টাঙ্গাইল শহরে। সেই থেকে শুরু। আজও আছি। যত দিন বাঁচি এখানেই থাকব।’

এখানে এসে তিনি ওস্তাদ হিসেবে পান বিশ্বনাথ ওরফে বিশু ঘোষকে। বিশু ঘোষের হাতে গুণ ছিল। তাঁর তত্ত্বাবধানেই দুধ জ্বাল, মিষ্টি সিদ্ধ, সন্দেশের ছানা ভাজা দিয়ে রতন ঘোষের কাজ শুরু। পাঁচ বছরের মধ্যেই রতন হয়ে ওঠেন দক্ষ কারিগর। তারপর পেরিয়ে গেছে আরো ২০ বছর। ওস্তাদের নাম রেখেছেন। বর্তমানে তিনিই জয়কালীর প্রধান কারিগর।

‘আমাদের সব প্রডাক্টের কোয়ালিটি কন্ট্রোল করেন উনিই। খুুবই অভিজ্ঞ মানুষ। দুধ দেখেই বলে দিতে পারেন খাঁটি না ভেজাল; কতটা ছানা হবে। মূলত মিষ্টি বানানোর কাজটা তিনি নিজ হাতেই করেন। বাকি কাজ অন্যরা করে। তবে তিনি তত্ত্বাবধান করেন সব কাজ। পরিচালনা করেন সবাইকে,’—বলছিলেন পাশ থেকে সমীর।

তাঁর কাজ

মিষ্টি, চমচম, রসমালাই, মোহনভোগ বা কালোজাম, দধি—সমান পারদর্শী সব কিছুতেই। তবে আমৃতির তিনি গ্র্যান্ডমাস্টার। গোটা পাঁচানি বাজারে এ ব্যাপারে কেউ নেই তাঁর ধারে-কাছে। কিন্তু তিনি নিজে খেতে পছন্দ করেন রসগোল্লা। ঘি-ছানার চেয়েও বেশি পছন্দ দেশি মাছ—বোয়াল, পাবদা, কই। ‘দেশের সেরা ধনী জহুরুল হক—আমার মিষ্টি খেতে পছন্দ করতেন খুব’—বললেন গর্বের সঙ্গেই।

 

ফেলে আসা দিন

‘আগে শহরে লোকজন আছিল কম। রাত ৮টা-৯টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যেত দোকান। পদ্ম পাতায় আমরা কাস্টমারকে মিষ্টি খেতে দিতাম। মাটির পাতিলে পার্সেল করতাম মিষ্টি। এখন তো কারখানার মধ্যেই থাকি। কাস্টমাররা বাইরে থেকে মিষ্টি খেয়ে সেলসম্যানকে বকশিশ দিয়া যায়। আমার লগে তেমন কোনো কাস্টমারের দেখা হয় না।’

এখন দিন বদলে গেছে। পার্সেলের জন্য পাতিলের বদলে কাগজের বাক্স। তবে রসমালাই আর দধি পাতার জন্য এখনো মাটির পাতিল। ‘গরম গরম ভরতে হয় বলে এগুলোর জন্য মাটির পাতিলই ভালো।’

 

যোগ্য শিষ্য

গত ২০ বছরে পেয়েছেন অনেক শিষ্য। তাঁদের বেশ কয়েকজন এখনো আছেন তাঁর সহকারী হিসেবে। প্রধান সহকারী হরিলাল আছেন ২০ বছর ধরে। বিষ্ণু ১৫ বছর। চার-পাঁচ বছর ধরে আছেন কয়েকজন। সবচেয়ে পুরনো শিষ্য খোকন। তিন নিজেই এখন ব্যবসা করেন করটিয়া বাজারে।

 

শিল্পী মন

তাঁর হাতেই তৈরি হয় টাঙ্গাইলের বিখ্যাত মিষ্টি। কারিগরও তৈরি হয়েছে অনেক। কিন্তু নিজে কখনোই খুলে বসতে চাননি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ‘ব্যবসা করা ঝামেলার কাজ। আমার ভালো লাগে মিষ্টি বানাতে।’ শিল্পী মনের এই উদাসীনতাকে খাটো করে দেখেনি কর্তৃপক্ষ। থাকার জন্য দিয়েছে বাড়ি। এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়ে বড়। বিয়ে-থা হয়েছে। ছেলেটা কাজ করে সিঙ্গাপুরে। নির্ঝঞ্ঝাট জীবনটা তাঁর কাটে মিষ্টির সঙ্গেই—শিষ্যদের নিয়ে। প্রায় দিনই মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করেন। বিকেল ৪টা-৫টা থেকে শুরু হয় মিষ্টি বানানো। দুপুরে নাওয়া-খাওয়া আর বিশ্রামের পর দোকানে আসেন সেই বিকেল নাগাদ।

 

জয়কালীর এত নাম!

একটা কথা বলে রাখা ভালো—অনেকে ভাবেন খাঁটি মিষ্টি মানেই শুধু ছানার তৈরি। কথাটা ঠিক নয়। ছানা নরম জিনিস। তাতে ময়দা না মেশালে গোল হয়ে থাকবে না আর সিদ্ধ করার জন্য রসে ডোবালে ছড়িয়ে যাবে। তাই ময়দা মেশাতে হয় খানিকটা। কথা হচ্ছে ছানা-ময়দার পরিমাণটা কী? সেটাই জানা হলো আজ সমীরের মুখ থেকে। মিষ্টিতে ছানা-ময়দার অনুপাত ১০:১—অর্থাৎ  এক কেজি ছানায় ১০০ গ্রাম ময়দা। এই অনুপাত ঠিক না থাকলে মিষ্টি ভালো হবে না। আর এটিই মিষ্টির ব্যবসায় সততা বা প্রতিশ্রুতির জায়গা। সেটা ঠিক রাখেন বলেই ‘জয়কালীর’ এতই সুনাম।

 



মন্তব্য