kalerkantho

সোমবার । ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ । ৮ ফাল্গুন ১৪২৩। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ফেসবুক থেকে পাওয়া

মামা চিনতে পারছুইন?

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মামা চিনতে পারছুইন?

শরৎবাবুর মতোই প্রায় দুই ক্রোশ ধুলোর সমুদ্র পাড়ি দিয়া বাজারে পৌঁছাইতে পৌঁছাইতে প্রায় ঘণ্টার ওপরেই লাগিয়া গেল...ইহার পর রাস্তার দুর্ভোগ না হয় নাই বা বলিলাম, সিএনজির খাঁচার ভেতর মানুষের চাপে একপ্রকার পিষ্ট হইয়াই ১৫ কিলো পাড়ি দেওয়ার পর খোলা আসমানের তলায় যখন আসিলাম, তখন আমার অবস্থা প্রায় কেরোসিন...রাস্তা তখনো ২৫ কিলো বাকি...সে যা-ই হোক, শেরপুরের বাস ধরিয়া যখন ত্রিশাল আসিয়া নামিলাম, পথের ধকলই হোক আর সামনের তিন কিলো অসম্ভব রকম ভাঙা রাস্তা দেখিয়াই হোক, কেন যেন কান্না পাইতে লাগিল...একে তো সারা জীবন শহরে থাকিয়া অভ্যাস, হাতের কাছে সবই পাইয়াছি...এই নির্বান্ধব গ্রাম্য পরিবেশে পুরো চার-চারটি বৎসর কাটাইয়া দিতে হবে ভাবিতেই ভেতরটা কেমন হু হু করিতে লাগিল...ত্রিশাল বাসস্টপে দাঁড়াইয়া যখন এহেন আকাশ-পাতাল ভাবিতেছি পেছন থেকে কে একজন বলিয়া উঠিল, মামা ভালা আছুইন? আমি ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়া বলিলাম, হ্যাঁ.. আপনি? একখানা রিকশার ড্রাইভিং সিটে বসা মানুষটা...বয়স ২৬-২৭ হইবে... রোদে পোড়া কালো শরীর... মামা চিনতে পারছুইন? আমি আমার বিখ্যাত বোকা বোকা হাসিটা দিয়া বুঝাইলাম, উত্তরটা না সূচক.... উঠুইন মামা, ভার্সিটি যাইবাইন তো? লন দিয়া আহি...উঠিয়া বসিতেই বলিল, ফরিক্কার দিন গেছিলাইন না আমার রিশকায়... এইবার মনে পড়িল.... কাউকে কাঁদতে কষ্টের... কারো কান্না ভেজা চোখ দেখাও দুঃসহ, তবে সবচেয়ে দুঃসহ বোধ করি কাউকে কান্না লুকাইতে দেখা... এই রিকশাওয়ালা সেই দিন গল্প বলিয়াছিল আবেগ আপ্লুত হইয়া, আমাদের পরীক্ষা দিতে যাইতে দেখিয়া যুবকের সমস্ত আবেগ যেন বাহির হইয়া আসিতেছিল, ইশকুলে ভালো ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও কিভাবে দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত হইয়া ইশকুল ছাড়িয়া রিকশা ঠেলা ধরিল, কী করিয়া অসুখে পড়িয়া তাহার বাপটা মরিল ঔষধের অভাবে...খাইয়া না খাইয়া সে কী রকমে দিনানিপাত করিয়াছে পরিবার লইয়া...তাহার জীবনের শখগুলি কী করিয়া মাটি হইল...বলিতে বলিতে তাহার গলা ধরিয়া আসে, আমি টের পাই...চোখে ধুলা গেছে বলিয়া গামছায় চোখ মুছে...পাছে আমি দেখিয়া ফেলি...এসব গল্প ইতিহাসে লেখা হয় না বটে, তবে তাহার ঘাড়ের গামছায় মোছা অশ্রুকণা ইতিহাসের চেয়ে কোনো অংশে যে কম নয় তাহা আমি হলপ করিয়াই বলিতে পারি...ভাবনায় ছেদ পড়িল বেল শুনিয়া, ক্রিং ক্রিং... মামা নামুইন...আয়া পড়ছি... ও হ্যাঁ! কত দিতে হবে? দ্যান যা মন চায়... তাহাকে ভাড়া মিটাইয়া দিয়া গেট দিয়া ঢুকিব তখন কি মনে হইতে পেছন ফিরিয়া ডাকিলাম, মামা! রিকশাওয়ালা ফিরিয়া কহিল, কিছু কইবেন মামা? ব্যাগ থেকে একখানা প্যাকেট বাহির করিয়া তাহাকে দিয়া বলিলাম, তোমার ছেলের হাতে দিয়ো, কেমন?

 

শাইয়িন কবির

জাতীয় কবি কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়।


মন্তব্য