kalerkantho

বনের মানুষ

গাউস মাঝি

বন তাঁর ভালো লাগে। ভালো লাগে বনের কাদামাটিতে হাঁটতে, বনের ধারে নোনা পানিতে নৌকা বেঁধে থাকতে, গোলপাতার সবুজে চোখ রাখতে। গাউস শেখের সন্ধান পেয়েছিলেন মাসুম সায়ীদ

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



গাউস মাঝি

রামপালের ভোচপাতিয়া গ্রামে তাঁর জন্ম। খুব ছোটবেলায় মাকে হারান। লুঙ্গির গিঁট বাঁধা শেখার পরই নামতে হয় জীবিকার সন্ধানে। শুরুটা হয় মাছ ধরা দিয়ে। ছোট্ট ডিঙি নৌকা নিয়ে পশুরের জোয়ার-ভাটায় বাপ-বেটা জাল ফেলে ভেসে বেড়াতেন টালমাটাল। ওই ডিঙি বাওয়াই যোগসূত্র ঘটায় সুন্দরবনের সঙ্গে গাউস শেখের।

 

নৌকার মাঝি

বাবার সঙ্গে রামপালের বসতভিটা ছেড়ে চলে আসেন মোংলায়। ঘর ভাড়া নেন কুমারখালীর আরাজি মাকারদুমের মেসের শাহ সড়কে। ট্যুরিস্টদের বড় লঞ্চ থেকে বনে নামানোর জন্য দরকার হয় নৌকা। লাগে শক্তপোক্ত মাঝি। গাউস শেখ গাইড ট্যুরসের (পর্যটনপ্রতিষ্ঠান) সঙ্গে কাজ শুরু করেন প্রথমে। বনে তাঁর নিত্য আনাগোনা। ভালো লাগাও শুরু। নাও বাওয়ার কাজ না থাকলে ট্যুরিস্ট লঞ্চের বাবুর্চির সঙ্গে রান্নাবান্না করতেন। সুকানিকে বিশ্রাম দিয়ে লঞ্চের হুইলও ধরতেন। মাস্টারকে সাহায্য করতেন বনের পথ চিনে নিতে। ট্যুরিস্ট মৌসুমের কয়টা মাস তাঁর খুব ব্যস্ত যায়। অন্য সময় বন্দরে কুলির কাজ করেন।

 

গবেষণার কাজে

২০০৩ সালের দিকে সুন্দরবনের বাঘ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মনিরুল হাসান খান। মোংলা থেকে ছোট্ট একটি লঞ্চ নিয়ে যেতেন সুন্দরবনে। বেশির ভাগ সময় হাসেম নামের এক মাঝি তাঁকে সঙ্গ দিতেন। একবার হাসেম অসুস্থ হয়ে পড়েন। ডাক পড়ে গাউস শেখের। গবেষণার কাজ তাঁর কাছে একদমই নতুন ঠ্যাকে। এ কাজে গন্তব্যে পৌঁছানোর কোনো তাড়া নেই। জোয়ার শুরু হলে কোনো খালের মুখে নৌকা ঢুকিয়ে দিয়ে হাল ধরে বসে থাকে আর নজর রাখে। অন্তর দিয়ে বন দেখা সেই শুরু গাউসের। বেশি দিন লাগেনি গাউসের মাঝি থেকে গবেষণা সহযোগী হয়ে উঠতে।

 

বাঘের চোখে চোখ

জীবনে বাঘের দেখা পেয়েছেন অনেকবার। বলছিলেন, ‘আসলে এইডা তো গুইনে রাখা সম্ভব না। কারণ ট্যুরের জগতে ২০ বছর—কম কইরা হইলেও বিশের ওপরে আছি আমি সুন্দরবনের এই ক্ষেত্রে। কতবার যে বাঘ দেখেছি আসলে বইলে শেষ করা যাবে না। বোঝানোও যাবে না। তবে আনুমানিক মনে হয় যে কম কইরে হইলেও ত্রিশবার তো আমি দেখছি। কটকা, কচিখালী, বড় কটকার মুখে, সুপতি খালে, আন্ধারমানিক, হরিণটানার ওখানে দেখছি—এর কোনো শেষ নেই যে কত জায়গায় বাঘ দেখছি। এই কয় দিন আগেও আমরা বাঘ দেখছি এই রকম নৌকায় বইসা। ওই যে আমি আর মিজান ভাই আছি—দুইজন নৌকায় ছিলাম। ছোড ওই রকম একটা খাল। আমারে মিজান ভাই বলতেছে যে গাউস ভাই ওইজানি কী একটা পাড়ি দ্যাছে!’

আরো বলে, ‘আসলে বাঘ স্যার এই রকম একটা বিষয়—লাখ লাখ টাকা খরচ কইরেও বাঘ দেখা সম্ভব না। আবার কেউ কেউ তেইশ টাকার বিনিময়ে করমজইল আইসাও বাঘ দেইখা ফালাইছে। ’

 

ভয় পাননি?

‘সে সুযোগ নাই। কেননা এমনও সিসুয়েশনে কাজ করতে হইছে যে আপনারে হালই থুইয়া আমি কই যামু? আমি তো লাফাইয়া গাছে উঠতে পারমু। কিন্তু আপন তো গাছে উঠতে পারবেন না। মরলে আপনারে সঙ্গে নিয়াই মরমু। ...এমন অবস্থায়ও বাঘ পাইছি যে যাওয়ার কোনো রাস্তা নাই। বাঘ চাইলে লাফ দিয়া পড়তে পারে নৌকায়। লোক নিয়া যাইতে পারে। ’

তবে একবার চমকে গিয়েছিলেন গাউস শেখ। সুপতির পেছনে সাপের খালে ঘটনা। মনির স্যার সঙ্গে ছিলেন। নৌকায় আরো একজন লোক ছিলেন—নাম রহমান। খালের একটা মোড়। মোড় ঘুরেই মুখোমুখি হয়ে যান বাঘের। পানির ধারে। নৌকা দেখে বাঘও এগিয়ে এসেছিল সামনে কৌতূহলে। টানা একটা ফিল্ম শেষ হলো। বাঘ পানির কিনার থেকে উঠে গিয়ে দাঁড়াল পাড়ের ওপরে। দ্বিতীয় ফিল্ম লাগানো হলো। নৌকা যত আগায় বাঘ দু-এক পা করে সরে। সরতে সরতে গিয়ে দাঁড়ায় গাছের আড়ে। পেছায় কিন্তু যায় না। বেলাও শেষ পর্যায়ে। খাল থেকে বেরোতে হবে। ১০-১৫ মিনিটের পথ নদী। নৌকা রেখে কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। সুযোগ নেই গাছে ওঠারও। তারপর ক্যামেরার ফ্লাশ জ্বেলে বাঘকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করা হলো। প্রথমে ভয় না পেলেও শেষ পর্যন্ত কাজ হলো। গা ঝাড়া দিয়ে হেঁটে চলে গেল বনের ভেতরে। দুজন প্রস্তুত থাকল লাঠি হাতে। বৈঠা বেয়ে গাউস শেখ নৌকা নিয়ে এসে পড়লেন নদীতে। কিন্তু তখনো মনে হচ্ছিল—‘বাঘ আসছে পিছু পিছু। ’ তবু ভয় না, বরং রোমান্স হিসেবেই বিবেচনা করেন এটাকে তিনি।

 

ডলফিন প্রকল্পে

ডলফিন নিয়ে তখন করমজলে কাজ করছিল ‘বাংলাদেশ সিটাসিন ডাইভারসিটি প্রজেক্ট’। মনির স্যারের সহযোগী জাহাঙ্গীর সাহেবের ক্যামেরার ফিল্ম শেষ হয়ে গেলে গাউসকে সঙ্গে করে করমজল যান ফিল্ম সংগ্রহ করতে। সেখানেই পরিচয় হয় প্রকল্পের কর্তাব্যক্তি এলিজাবেথ আর রোবায়েত মনসুরের সঙ্গে। সেই সূত্র ধরে কাজ করার সুযোগ হয় ডলফিন প্রকল্পে। খুলনায় প্রকল্প অফিস। এখানেই ডলফিন বিষয়ে খুঁটিনাটি জানার সুযোগ হয়। হাতে-কলমে শিখে শিখে বনে যান বিশেষজ্ঞ। মৃত ডলফিনের পোস্টমর্টেমে হয়ে ওঠেন অভিজ্ঞ। জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরির জন্য আয়োজন করা হয় ডলফিন মেলার। পর পর চার বছর এ মেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন গাউস।

 

সাপ ও কুমির

সুন্দরবন পিটভাইপার আর কিং কোবরার মতো বিষাক্ত সাপেরও আস্তানা। প্রায়ই পর্যটক আর গবেষণায় শিক্ষানবিশরা পিটভাইপারকে গুলিয়ে ফেলেন লাউডগার সঙ্গে। গাউস কিন্তু ঠিকই সাবধান করেন। নোনা পানির কুমিরদের বিচরণক্ষেত্র ও এদের গতিবিধি সম্পর্কে তিনি অবগত। বনের উদ্ভিদ আর লতাগুল্মও চেনেন বেশ। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি জানেন সুন্দরবনের কোথায় কী? কোন খালে কুমির, কোন বাঁকে হরিণ আর বাঘ থাকে কোথায়। কোন চরে পাখির আড্ডা তাও জানা গাউস শেখের।

 

বন তাঁরে ঠকায়নি

তিন দিনে ৪৫০ টাকা বেতন আর ৫০ টাকা বকশিশ মিলে মোট ৫০০ টাকায় শুরু হয়েছিল কাজ। এখন তিন দিনের ট্যুরিস্ট ট্রিপে পান দুই হাজারেরও বেশি। সঙ্গে বকশিশ। গবেষণার কাজে পান আরো বেশি। এখন আর কুলির কাজ করতে হয় না তাঁকে। অনেকেই নিয়ে আসতে চেয়েছেন ঢাকায়। রাজি হননি। সুন্দরবনের মায়া ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না। বনপ্রেমিকদের সহযোগিতা করতে চান নিজের অভিজ্ঞতার সবটুকু উজাড় করে দিয়ে। সুন্দরবন বেঁচে থাক তার আপন সৌন্দর্য নিয়ে। পরের প্রজন্ম যেন বনটা পায়—এটাই আশা গাউস শেখের।


মন্তব্য