kalerkantho


অপরূপ বাংলাদেশ

মাঘের রাতে সীতা পাহাড়ে

এবার নাকি শীতই পড়েনি। মাঘের ভর শীতে সীতা পাহাড়ে রাত কাটিয়ে একেবারেই ভিন্নমত পোষণ করলেন মনু ইসলাম

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মাঘের রাতে সীতা পাহাড়ে

মাঘের শীত, তার সঙ্গে উত্তরের হিম হাওয়া। এ হেন প্রতিকূল আবহাওয়ায় সেখানে রাত কাটানোর কথা শুনে মুখ বাঁকালেন সীতা পাড়ার কারবারি কেং কো ম্রো।

তারপরও বেড়িয়ে পড়লাম। সীতা পাহাড়ের গা ছুঁয়ে বান্দরবান-থানচি সড়ক। সড়ক থেকে ৪০-৫০ ফুট উঁচুতে পাড়া।

পাহাড়ের কাছাকাছি হতেই দমকা হাওয়ার শো শো শব্দ সতর্ক করে দিল। তবু ম্রো পাড়ায় মাঘের রাত কাটানোর অদম্য ইচ্ছায় পাহাড়ি পথ ধরে উঠতে থাকি। দেখলাম ঘরগুলোর কোনোটির উচ্চতা ৭/৮ ফুটের বেশি নয়। বাতাসের আক্রমণ এড়াতেই এ ব্যবস্থা। কেং কো কারবারি জানালেন, তিন বছর আগে বাতাসে পাড়ার প্রায় সব ঘর উড়ে যাওয়ায় খর্বাকৃতির ঘরের এই প্যাটার্ন। সোজা চলে গেলাম কারবারির বাড়ি।

পাহাড় চূড়ায় বাঁশের মাচানের ওপর টিনশেড ঘর হলেও হাবভাবে বনেদি। পাড়ার প্রধান বলে কথা। আমাদের পৌঁছার কথা সন্ধ্যায়। কিন্তু শীতে অচেনা পাহাড়ি পথ ধরে যেতে হবে ভেবে আগেই রওনা দিয়েছিলাম। তাই পৌঁছে গেলাম দুপুরের পরপর।

পাড়াটি মোটামুটি ছিমছাম। ১৫টি পরিবারের বাস। সবাই ম্রো। এদের একটি অংশ বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। কেউ ‘মেনলে ম্রো’ প্রবর্তিত ‘ক্রামা’ ধর্মের অনুসারী। মিশনারিদের তত্পরতায় খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেছেন অনেকেই। ১৫ পরিবারের এই গ্রামে তিন অনুসারীদেরই পাওয়া গেল। জনসংখ্যা আশির নিচে। ভোটার সংখ্যা ৩০। বাকিরা শিশু। আশপাশে স্কুল না থাকায় দুটি অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালয়ে পড়াশোনা করে। ইউনিসেফ স্কুল মূলত প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা দেয়। একজন শিক্ষক, স্কুলটিও প্রায়ই বন্ধ থাকে। ম্রোচেট স্কুলে সরকারি পাঠ্যপুস্তকে প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হয়। কিন্তু পুরো পাড়ায় একজন প্রাথমিক শ্রেণী উত্তীর্ণ ছাত্র বা ছাত্রী পাওয়া গেল না। অভিভাবকদের মধ্যে এক-দুজন অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন।

তবে বেশ আন্তরিক ও পরিশ্রমী। আমরা শহুরে মানুষ ‘মাঘের রাত’ কাটাতে এসেছি শুনে কারবাড়ির ঘরে ছুটে এসেছেন বেশ কয়েকজন। রাত ১২টা পর্যন্ত বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দের মধ্যেই তারা আমাদের সঙ্গে গল্পগুজবে মেতে থাকলেন।

কেং কো কারবারির স্ত্রীও বেশ আন্তরিক। চমত্কার একটা ভোজনপর্ব আমাদের উপহার দিয়েছেন। বাংলা বোঝেন না। কখনো হ্লাচিং মারমা আবার কখনো চংরেং ম্রো কারবারির মধ্যস্থতায় আমাদের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দিলেন স্বামী-স্ত্রী।

বাইরে তখনো শোঁ শোঁ শব্দের শিস দিয়ে বাতাসের মাতলামি চলছেই। বাড়িটি উন্নতমানের হলেও বেড়ার ফাঁক গলিয়ে শীতের ছোবল ক্রমেই বাড়ছিল। শীতের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে কারবারি গিন্নিও একের পর এক আমাদের গায়ের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছিলেন ঘরে বোনা কম্বল। তবু শীত মানছিল না। কিন্তু বলি কী করে!

গল্প-গুজব করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লাম। ভোর হওয়ার ঠিক আগে বাইরে মোরগের ডাক শোনা যাচ্ছিল। দপ দপ শব্দে আমার ঘুম ভাঙল। চোখ খুলে দেখলাম বাড়ির মেয়েরা থুরং কাঁধে পানি আনার জন্য বাইরে যাচ্ছে। মার্চ পাস্টের লেফট-রাইট শব্দের মতোই শোনাচ্ছিল ওদের পায়ের কোরাস।

উঁচু পাহাড়ের বসতি হওয়ায় অনেক আগেভাগেই সূর্যের লালিমা ছড়িয়ে পড়ল। সঙ্গীরা সবাই ঘুমিয়ে। একাই বেরিয়ে পড়লাম। এদিক-ওদিক ঘুরে আবিষ্কার করলাম পানি সংগ্রহের ঝিরিপথ। খানিকটা অপেক্ষার পরই কাঙ্ক্ষিত সেই দৃশ্য : নানা আকৃতির পাত্রে পানি বোঝাই করে থুরং-এ চাপিয়ে মেয়েদের ঘরে ফেরার কয়েকটা ছবি নিলাম।

কিছুক্ষণের মধ্যেই জেগে উঠল পাড়া। কেউ শূকর এবং মুরগিকে খাবার দিচ্ছেন। কাঁধে থুরং, হাতে দা নিয়ে কেউ কেউ যাচ্ছেন জুমে কাজ করতে। এরই মধ্যে শীতের কুয়াশামাখা ভোরের অলসতা ভেঙে কয়েকজন শিশু স্কুলপথে রওনা দিয়েছে। তাদের অনুসরণ করলাম। ম্রোচেট স্কুলের দরজা-জানালা খুলে ওরা নিজেরাই কক্ষ ঝাড়ু দিল। বাঁশের মাথায় পতাকা বেঁধে উড়িয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর এলেন এক তরুণ। স্কুলের শিক্ষক। তার নির্দেশে ছেলেমেয়েরা দুই লাইনে দাঁড়িয়ে গেল। তারপর জাতীয় পতাকার দিকে তাকিয়ে শপথ বাক্য, ‘আমি ওয়াদা করিতেছি যে মানুষের সেবায় সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত রাখব...। ’ অনেক দিন পর শুনলাম।

ফিরে এলাম কারবারির বাড়ি। সফরসঙ্গীরা বাইরে দাঁড়িয়ে আগুন পোহাচ্ছেন। আবার আসার অঙ্গীকার করে ফেরার অনুমতি নিই। গাড়ি ছুটল উল্টো পথে। রোদের ভাপের সঙ্গে সঙ্গে মাঘের শীত কমছিল। আমাদের সঙ্গেও দূরত্ব বাড়তে থাকল সীতা পাড়ার।


মন্তব্য