kalerkantho

সোমবার । ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ । ৮ ফাল্গুন ১৪২৩। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮।


স্টকহোমের তুষারকন্যা

স্বপ্ন ছিল সিন্ডারেলা হবেন। গায়ে দেবেন নীল জামা। অবশেষে গেল জন্মদিনে সিন্ডারেলা হতে পারলেন কুমিল্লার মেয়ে পূজা রায়

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



স্টকহোমের তুষারকন্যা

সেই যখন থেকে বুঝতে শিখেছি মানে সেই ছোটবেলা থেকেই সিন্ডারেলার নীল লম্বা জামাটা আমার পছন্দ। ভাবতাম একদিন যদি পারি সিন্ডারেলা হব।

তারপর সত্যি সত্যি বছর কয় আগে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশ সুইডেনে আসি। বেড়াতে নয়, থাকতে। কাজকর্মও জুটিয়ে নিয়েছি। এখন আমার অবস্থান এখানে বেশ পোক্ত। এর মধ্যে অভিজিত্ নন্দী এলো বাংলাদেশ থেকে। দুই বছর আগে। ছবি তোলা তাঁর শখ ছিল, এখন পেশা বলা ভালো। এখানে পড়ছেনও ছবি তোলাবিষয়ক একটা বিষয়।

এই দেশে তুষারপাতের অপেক্ষা বেশি করতে হয় না। কিন্তু ছুটিছাঁটা তো লাগে। তার মধ্যে অভিজিত্ আবার ভয়ানক ব্যস্ত। ফাঁক পেলেই ফিনল্যান্ড না হলে হল্যান্ড ছোটেন। তাঁকে মডেল ফটোগ্রাফার বলা যায়, বেশি ভালো হয় ফ্যাশন ফটোগ্রাফার বললে। অনেক বুদ্ধি তাঁর মাথায়। নাই-নাই কিছু নাইয়ের মধ্যেও তিনি একটা ফ্রেম বেঁধে ফেলেন, একটা রং ধরে ফেলেন।

আমারও অনেক আহ্লাদ। অভিজিৎকে বলে রেখেছিলাম, ‘আমার জন্মদিনটাতেই আমি সিন্ডারেলা সাজব। তুই গাঁটরিবোঁচকা আর বরফ নিয়ে রেডি থাকবি। ’ এবার তিনি কথা রেখেছিলেন। তুষারও সেদিন ঝরেছিল ঢের স্টকহোমে। নীল জামা কেনা হয়ে গিয়েছিল আগেই। আমি হাতায় লেস লাগিয়ে নিয়েছিলাম পছন্দমতো।

দুপুরের পর অভিজিত্ আমাকে নিয়ে রওনা দিলেন। নিয়ে গেলেন জুরগার্ডেন। এটি স্টকহোমের মাঝখানে একটি দ্বীপ। বিখ্যাত জায়গা। অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা আছে জুরগার্ডেনে। আছে জাদুঘর, অ্যামিউজমেন্ট পার্ক ইত্যাদি। ইয়ট হারবারও আছে। রাজা তৃতীয় জন ১৫৭৯ সালে হরিণ আর অ্যালক রাখার জন্য এখানে একটি বাগান করেন। কাছে কোনো এক জায়গায় মাছ ধরতেও বসতেন শুনেছি। ১৬৬৭ সালে এখানে পক্ষাঘাতগ্রস্তদের জন্য কিছু ঘর তৈরি করা হয়। ১৮ শতকে জুরগার্ডেন পরিপূর্ণ একটি বিনোদনকেন্দ্র হয়ে ওঠে। রয়্যাল গেম পার্ক তৈরি হয় এখানে। জুরগার্ডেন মানে দ্য রয়্যাল গেম পার্ক। রাজা ষোড়শ চার্লস জন ১৮২০ সালে এখানে রোজেনডাল প্যালেস তৈরি করেন।

যা-ই হোক, অভিজিত্ আমাকে সিটি হলে নিয়ে যান। মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলের অফিস এখানে। অনেক মূল্যবান চিত্রকর্ম আছে এ ভবনে। গ্র্যান্ড সেরিমনিয়াল হল নামে বেশি পরিচিত। নোবেল নৈশভোজের আয়োজন হয়। সিটি হলের সামনের সিঁড়িতে গিয়ে বসলাম। লোকজন আমাকে ঠাণ্ডায় বসে থাকতে দেখে অবাক হলো। সেদিনের তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ১৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। পুরো স্টকহোম ছেয়ে গিয়েছিল তুষারে। লোকজন শীতের কাপড় পরেও ঠাণ্ডা সহ্য করতে পারছিল না। অথচ আমি সিন্ডারেলা সেজে বসে আছি। মজা লাগছিল যখন শিশুরা হ্যালো সিন্ডারেলা বলে ডাকছিল। কেউ কেউ আবার রাজকুমারী অ্যালসা (ওয়াল্ট ডিজনির এনিমেটেড ছবি ফ্রোজেনের চরিত্র) বলছিল। কয়েকজন এসে তো আমার সঙ্গে ছবি তুলে নিল। জানতে চাইল, কিসের আয়োজন?

যখন ছবি তোলা হচ্ছিল তখন আমার বেশি ঠাণ্ডা লাগছিল না। ওপরে আকাশ ছিল নীল। বিকেলের হালকা রোদ ছিল। আমি তুষারের ওপর নীল জামা পরে বসেছিলাম। আসলে আমি একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। ঠাণ্ডা অনুভব করছিলাম না।

অথচ আমার শীতের জ্যাকেট ছিল না, ছিল না শীতের জুতা। তবে ছবি তোলা থামলে কিন্তু ঠাণ্ডা লাগা শুরু হয়ে যায়। হাত, পা, শরীর সব বরফ হয়ে যাচ্ছিল। তবু ছবি তোলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কষ্ট করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। মনে হচ্ছিল এক্ষুনি পড়ে যাব বা অজ্ঞান হয়ে যাব। ঘরে ফিরে এসে অভিজিৎকে বললাম, এটা আমার জন্মদিনের সেরা প্রাপ্তি। আমি সিন্ডারেলা হতে পারলাম। আজ আমার খুব সুখ।

 


মন্তব্য