‘অনেকে বিশ্বাস করতে চান না আমি বাদাম বিক্রেতা। কেউ ভাবেন আমি হয়তো কাউকে বা কোনো সংস্থাকে সাহায্য করার জন্য বাদাম বিক্রি করে তহবিল সংগ্রহ করছি। তখন তাদের বলি, আমি নিজেকে সাহায্য করতে এসেছি এবং আমি কিছু করতে চাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘যুব সমাজের মাঝে একটা বিষয় ব্যাপক ভাবে লক্ষ্য করি। সব কাজকে ওরা সমান ভাবে না। আমি এই ধারণা পাল্টাতে চাই। বাদাম বিক্রি আমার পেশা নয়, তবে ইচ্ছে থাকলে সব কাজ করা যায়, অবসরগুলো চমৎকার ভাবে কাজে লাগানো যায়।’ তাহমিনার এমনই কথা। তাই নিজেই সেই ধারণা ভেঙে দিতে বাদাম বিক্রি করছেন। ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরসহ আশপাশের এলাকায় বিকেল বেলা প্রায়ই দেখা যায় এই তরুণীকে। পিঠে ব্যাগ, গলায় ঝুলানো বাঁশের মাঝারি ঝুড়ি। ছোট ছোট ঠোঙায় বাদাম বিক্রি করছেন। বাদাম নিয়ে বের হন কলেজ ছুটির পর। যখন তার বন্ধুরা আড্ডা দেয়, সে সময়টা তিনি কাজে লাগান। লালমাটিয়া মহিলা কলেজে পড়েন তাহমিনা। ব্যবস্থাপনা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। সবাই ডাকে ‘কথা’ নামে। জন্ম মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায়। এখন দুই ভাইয়ের সঙ্গে ধানমন্ডি থাকেন। বাবা হাবিবুর রহমান সাটুরিয়া হাসপাতালে চাকরি করেন; একই হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন মা আয়েশা হাবিবও। ২০০৮ সালে মা মারা যাওয়ার পর একা হয়ে পড়েন বাবা, আর পড়াশোনা সূত্রে তাহমিনাকেও ঢাকায় চলে আসতে হয়। বাদাম বিক্রির শুরুর দিকে বাবাকে জানাননি। পরে বাবা জেনে আপত্তি করেননি, সৎ পথে করা কাজকে মেনে নিলেন। বড় ভাইও আগ্রহ জুগিয়েছেন। কিন্তু মানতে পারেননি ছোট ভাই। এ কারণে বোনটার ওপর তার খুবই রাগ। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর উচ্চশিক্ষা নিতে মালয়েশিয়া যাওয়ার সুযোগও এসেছিল। কিন্তু দেশ ছাড়তে চাননি কথা। পড়াশোনা করা অবস্থায় একটা ট্রাভেল এজেন্সিতে চাকুরি করতেন। কিন্তু চাকুরির বাধ্যবাধকতা ভালো লাগেনি। সময় মেনে যাওয়া-আসায় তার কাছে নিজেকে রোবট রোবট লাগছিল। মোটেও স্বাধীন মনে হয়নি নিজেকে। বাদাম বিক্রি ও ট্রাভেল এজেন্সির চাকুরির মধ্যে কোনো ভেদ আছে এমনটি মনে করেন না তাহমিনা। তার কাছে দুটি কাজই মহান। কেমন করে এই কাজের কথা মাথায় এলো? বললেন, ‘ফেরিওয়ালা তাজুল ইসলাম লিখনকে নিয়ে একটা লেখা পড়েছিলাম। অভিজাত ঘরের ছেলে হয়েও তিনি ভ্যানে ফেরি করে বেড়ান। সেখানে বাদাম বিক্রির কথাটি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। আর এরপরই কাজে নেমে পড়া।’ কলেজের বন্ধুরাও তার কাজটি বেশ ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছে। এই রোজার মাসে তাহমিনা তার ঝুড়ি নিয়ে বের হবেন না। তবে রোজার পর যখন বের হবেন, সঙ্গে আরও কয়েকজন বন্ধুও নাকি থাকবেন। তাহমিনা বলেন, ‘আমার এই কাজ নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেন, তবে পঁচানব্বই ভাগই ইতিবাচক। তখন সাহস বেড়ে যায়। কিন্তু কেউ কেউ বলে আমি নাকি অন্য বাদাম বিক্রেতাদের রোজগার নষ্ট করতে এসেছি বা সবার নজর কাড়ার জন্য কাজটা করছি। এটা ঠিক নয়। সবাইকে বলতে চাই, পড়াশোনা করেও বাদাম বিক্রি করা যায়। শিক্ষার জন্য এত এত টাকা ব্যয় করছে সরকার। আজ যারা বাদাম বিক্রি করছে তারা যদি শিক্ষিত হয়, আরো নান্দনিক ভাবে কাজটি করতে পারবে। পড়াশোনা করলে সেটা সম্ভব, এতে আইডিয়াগুলো ভালোভাবে তৈরি হয়। আমার সঙ্গে অন্য বাদাম বিক্রেতার ফারাক হলো নান্দনিকতার।’ বাদাম কেনেন তিনি সাটুরিয়া থেকে, প্রতি কেজি ৮০ থেকে ৯০ টাকা। বাসায় নিজেই বাদামগুলো ভালোভাবে ভাজাসহ বাছাই করেন। পরে ক্রেতাদের হাতে তুলে দেন সুন্দর দেখতে কালো ঠোঙায়। কয়েক ঘণ্টায় দুই থেকে আড়াই শ টাকা আয়। এই টাকা আয় করাকে তিনি গুরুত্ব দেন না। তার কাছে ‘একটা কিছু করা’ই আসল। বলেন, ‘ছোট একটি বাংলাদেশ, এতো বড় বড় জব পাওয়া সম্ভব নয়। তাই সব হতাশা ছেড়ে যে কোনো কাজে মন দেওয়াই উত্তম। অনেকে পণ করেন চিকিৎসক বা ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। এতে করে সবার স্বপ্ন পূরণ হয় না। হতাশা কাজ করে। আবার অনেকে চুরি-ডাকাতিসহ খারাপ পথ বেছে নেন। কিন্তু যেকোনো কাজে নিজেকে খুশি রাখতে পারাই ব্যক্তিগত অর্জন। অলস সময়ে বসে না থেকে দেশের সব কাজকে সমানভাবে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।’ তবে ভবিষ্যতে কী করবেন সেটা জানেন না কথা। সব কাজই যে তার কাছে কাজ। একটা কিছু তো করবেনই, সেটাই হবে কথার কাজ।