জন্ম থেকেই তার এক পা ছোট, অন্য পায়ের চেয়ে অর্ধেকের কম। কিন্তু এ নিয়ে বসে নেই সম্পদ সাহা। খেলাধুলা, পড়াশোনা সব কিছুতেই সে এগিয়ে। তার ইচ্ছা জাতীয় প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের হয়ে খেলা। তাকে নিয়ে লিখেছেন শাখাওয়াত উল্লাহ ছবি : শাখাওয়াত উল্লাহ ও গিরিধারী ব্যাটটা ভালো হাঁকাতে জানে নোয়াখালীর নামি বিদ্যাপীঠ চরবাটা খাসেরহাট উচ্চ বিদ্যালের মাঠে চলছে ক্রিকেট খেলা। বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। স্কুল বন্ধ। দুপুর বেলা ক্রীড়া শিক্ষক হাফেজ আহমদ তার শীর্ষদের দিয়ে প্রীতি ম্যাচ খেলাচ্ছেন। হুট করে চোখ আটকে গেল বোলারের দিকে। তেরো-চৌদ্দ বছর বয়সের সুদর্শন বোলারের দিকে এমনিতেই চোখ পড়বে। কিন্তু এ বোলার একটু অন্য রকম। দেখতে রাজপুত্রের মতো কিন্তু পায়ের দিকে তাকালে দেখা যায় সে এক পা নিয়ে তার সব কাজ করছে। আরেকটি পা আছে, কিন্তু সেটা অন্য পায়ের অর্ধেকও না। এক পায়ে সে যখন দাঁড়িয়ে থাকে, তখন বোঝার উপায় থাকে না যে তার আরেকটি পা অচল। সেই এক পা দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সে বল করছে। বল খুব ভালো না হলেও মোটামুটি যে ভালো, তা সে প্রমাণ করেছে। হাফেজ স্যারকে জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন, ‘একটু অপেক্ষা করো। সে কী রকম ব্যাটিং করে সেটাও একটু দেখো।’ দুই ওভার পরেই ইনিংস শেষ। এবার ব্যাটিংয়ের পালা। সাধারণত সে দুজন ব্যাটসম্যান আউট হওয়ার পর দলের বিপদের সময় নামে। আজ বিশেষ অনুরোধে সে ওপেনিং করল। দেখার মতো ব্যাটিং। চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করা যাবে না, এ রকম একটা ছেলে কত নৈপুণ্য দেখাতে পারে! চরবাটা খাসেরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ যেকোনো জেলা স্টেডিয়ামের চেয়ে ছোট নয়। এখানকার ক্রিকেট টিম নোয়াখালী আন্তজেলা ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ক্রিকেটে কখনো চ্যাম্পিয়ন, কখনো রানার্সআপ হয়ে থাকে। সেই মাঠে সেরা দলের বোলারের বিরুদ্ধ তার চারের মার দেখার মতো একটি বিষয়। ছেলেটির নাম সম্পদ সাহা। জন্ম ২০০২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি। বাবা দীপক চন্দ্র সাহা ২০১২ সালে মারা গেছেন। তিনি ছিলেন স্বাস্থ্য সহকারী। মা বকুল রানী সাহাও স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে ২২ বছর ধরে কাজ করেন। ভাই-বোন চারজন। তিনবই তার বড়। দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। মা আর দিদিকে নিয়ে সম্পদের ছোট্ট পরিবার। বিমুগ্ধ, সাফোয়ান, নিপুণ, কিসমতসহ ক্লাসের অন্য ছেলেরা সম্পদের খেলার সঙ্গী, বুকের বন্ধু। বন্ধুদের কাছে সে পরোপকারী হিসেবে পরিচিত। বাড়ির টুকটাক কাজে মাকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি পাশের বাড়ির দিদিমার বিশেষ প্রয়োজনেও ছুটে যায় সম্পদ। বাড়িয়ে দেয় সহযোগিতার ছোট্ট হাতখানি। ছোট্ট সম্পদের একজন শত্রু আছেন। তিনি আর কেউ নন, ঘরের শত্রু, ছোট দিদি পান্না সাহা। সম্পদের অভিযোগ, ‘সে (দিদি) টিভিতে খালি সিরিয়াল দেখে। আমাকে খেলা দেখতে দেয় না।’ দিদি পাল্টা যুক্তি ‘এমনিতে সে কারো সঙ্গে রাগারাগি করে না। সবার কাছে সে শান্ত-সুবোধ ছেলে। কিন্তু ঘরে-বাইরে যেখানে যা-ই ঘটুক, তার সব অভিমান, রাগ-ক্ষোভ সব আমার ওপর দিয়ে যায়। এ জন্য সে বাড়িতে না থাকলে আমি আনন্দে থাকি। আমি না থাকলে সে-ও খুশি।’ বলেই একটা চাপা হাসি হাসলেন পান্না। তার হাসিতেই বোঝা যায় এই শত্রুতা কত মধুর, কত লোভনীয়। জন্ম থেকেই সম্পদের বাঁ পা ডান পায়ের অর্ধেকের চেয়েও ছোট। সেই থেকে কপালে দুশ্চিন্তার রেখা আর সমাজের বাঁকা কথা মা বকুল রানী সাহার নিত্যদিনের সঙ্গী। তাই বকুল রানী চান এসব খেলাধুলার পেছনে সময় ব্যয় না করে ছেলে মন দিয়ে পড়ালেখা করুক। ‘হেতে বালা করি হোয়ালেয়া ন কইল্লে ত অইত ন। হেতে কি বেকের মতন নি। অইন্য হোলাইনে তো কাম করি খাইতো হাইরবো। হেতার ত হোয়ালেয়া ছাড়া গতি নাই।’ তার প্রশ্ন, এসব খেলাধুলা করে কী হবে? পড়ালেখায়ও সম্পদ পিছিয়ে নেই। তার স্কুলের প্রধান শিক্ষক অসিত বরণ তালুকদার বলেন, ‘সে যেমন খেলাধুলায় ভালো, তেমনি পড়ালেখায়ও ভালো। তার নাম সম্পদ, সে আসলেই আমাদের অনেক বড় সম্পদ।’ তার জন্য স্কুল বেতন ফি ছাড় দেয় কি না জিজ্ঞেস করতে প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘তার জন্য কোন ছাড়ের প্রয়োজন হয়নি। সে ফাইভে ট্যালেন্টফুলে বৃত্তি পেয়েছে আর নিজের কৃতিত্বের কারণেই সে তার জায়গা দখল করে নিয়েছে।’ বিস্তারিত কথা হয় হাফেজ স্যারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সে শুধু ক্রিকেট নয়; ফুটবল, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন সব খেলায় ভালো। ক্রিকেটে বোলিং ব্যাটিং দুটিতেই সমান পারদর্শী। তার যদি অন্য পা ঠিক থাকত, আমার বিশ্বাস সে জাতীয় দলের মতো বড় জায়গায় নিজের জায়গা করে নিত। এক পা নিয়ে সে কী করে লাফিয়ে লাফিয়ে ফুটবল খেলে, ভলিবল খেলে, তুমি দেখলে অবাক হয়ে যাবা। ভলিবলে এবারও আমাদের স্কুল জেলা চ্যাম্পিয়ন। কয়েকবার আমার ছেলেরা জাতীয় পর্যায়েও খেলেছে। প্র্যাকটিসের জন্য তাকে রাখি, উত্সাহ দিই ঠিকই, কিন্তু আমার খুব খারাপ লাগে শুধু তার শারীরিক প্রতিবন্ধকতার জন্য তাকে সেই সব জায়গায় নিতে পারি না।’ সম্পদ সাহা বলেন, ‘স্যারেরা আমাকে কখনো ধমক দিয়ে কথা বলেননি। আমি যেন ভালো খেলাধুলা করতে পারি সে জন্য আমাকে উত্সাহ দেন।’ ক্রিকেট তার খুব প্রিয় খেলা। মাশরাফি প্রিয় খেলোয়াড়। ‘যদি মাশরাফির এক ওভার বল খেলতে পারতাম!’ কী কারণে যেন আচমকা কথাটা বলে লজ্জায় মুখ লুকাল এই বালক। সম্পদ সাহার শ্রেণি শিক্ষক মাওলানা কেফায়েত উল্লাহর বলেন, ‘মানুষ বড় হয় দুটি জিনিস নিয়ে, এক. মনোবল, দুই. সততা। আমি তার মধ্যে দুটি জিনিসই দেখেছি। এমন কোনো খেলা নেই, যেটা সে পারে না। পড়া যেটা দিই খুব ভালো করে আয়ত্ত করে নেয়। সাঁতার কাটতে পারে। গাছে উঠতে পারে। এতগুলো ভালো যার মধ্যে আছে সে তো পিছিয়ে থাকবে না।’ সম্পদ সাহার বাবার মৃত্যুর সময় সে ক্লাস ফাইভে ছিল। সামনে পিএসসি পরীক্ষা। তখন চরবাটা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সাখাওয়াত স্যার বলেছিলেন, ‘ওর বাবা নেই, কী হয়েছে? বাবা তো সবার থাকে না। ওর দায়িত্ব আমি নিলাম।’ স্যার তাঁর কথা রেখেছেন, পিতার মতো পাশে থেকেছেন, খোঁজখবর নিয়েছেন, যত্ন করে পড়িয়েছেন আর সে কারণে সম্পদ ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। একদিকে ভালো খেলাধুলা, অন্যদিকে পড়াশোনায় ভালো করে সে বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। পাড়ার ছোট্ট ছেলে থেকে পাশের বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ পর্যন্ত সবাই তার গুণের সমজদার। স্কুলের শিক্ষকরা অন্য শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণার জন্য সম্পদকে উদাহরণ দেন। সৈকত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আবদুল্লাহ দিদার বলেন, ‘সে যখন খেলে আমি মুগ্ধ হয়ে তার খেলা দেখি। তার খেলায় একটা অসাধারণ আর্ট আছে। তার এই চেষ্টা আমার নিজের জন্যও এক বড় অনুপ্রেরণা।’ বছরের শুরুতে পড়ালেখার চাপ কম, তাই সারা দিন খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত। কখনো ব্যাট হাতে ক্রিকেটের মাঠে, কখনো ফুটবল মাঠে, আবার কখনো ভলিবল বা ব্যাডমিন্টনের কোর্টে। তবে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে ক্রিকেটকেই। বলা যায় তার ধ্যান-জ্ঞান ক্রিকেট। আবার এ বয়সে একটা বালকের যেমন ডানপিটে হওয়ার কথা, সে তেমনও। বছর খানেক আগে গাছে উঠে লাফালাফি করতে গিয়ে ডান পা-টাও ভাঙতে বসেছিল। তাই গাছে ওঠার ওপর মায়ের কড়া বারণ। কিন্তু কে শোনে কার কথা! মা বাড়িতে না থাকলে গাছের পাকা পেয়ারাটা তো তাকেই পাড়তে হয়। নিজের পাড়া ডাবটা নিয়ে ছোট দিদির সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়। প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলে জায়গা করে নিতে সে বেশ আগ্রহী। এ প্রসঙ্গে কথা হয় বাংলাদেশ জাতীয় প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মো. মহসিনের সঙ্গে। তিনি জানান, ‘সম্পদের কথা আমি শুনেছি। তার খেলা দেখিনি। তার স্কুলের শিক্ষকরা আমাকে ফোন করেছেন। তাঁদের বলেছি নোয়াখালীতে আমি যাব। সে যদি সত্যিই ভালো খেলে আর আগ্রহ থাকে, আমি তাকে দলে নেওয়ার জন্য সব রকম সহযোগিতা করব।’ চরবাটা খাসেরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী আর সম্পদের আপনজনরা এখন প্রতীক্ষার প্রহর গুনছেন, কখন বাংলাদেশ জাতীয় প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের হয়ে খেলবে তাদের প্রিয় সম্পদ। আর সম্পদের অপেক্ষা তার মহসিন ভাইয়ের জন্য। তার বিশ্বাস মহসিন ভাই আসবেন, আর তাকে দলে নিয়ে নেবেন। যদিও পথটা খুব সহজ নয়, তবু বুকের ভেতর বড় আশা নিয়ে সে অপেক্ষা করছে।