kalerkantho


শতাব্দী পেরিয়ে সাধনা

ভারত উপমহাদেশের বিখ্যাত আয়ুর্বেদ ওষুধ প্রস্তুতকারক   

৪ জুলাই, ২০১৫ ০০:০০



শতাব্দী পেরিয়ে সাধনা

ছবি : নাভিদ ইশতিয়াক তরু

পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়া এলাকার দীননাথ সেন রোডে প্রায় দুই একর জমির ওপরে আজও দাঁড়িয়ে আছে সাধনা ঔষধালয়ের প্রধান কার্যালয়। এ বৈশাখে শত বছর পূর্ণ করেছে আয়ুর্বেদশাস্ত্রী, শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যক্ষ যোগেশ চন্দ্র ঘোষের 'সাধনা ঔষধালয়'। প্রধান কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নারায়ণ চক্রবর্তীর দেখা মিলল। প্রায় ৩৫ বছর এখানে চাকরি করছেন। ছয় দশক তাঁর শ্বশুর বেণীমাধব মুখার্জিও এ কম্পানির জেনারেল ম্যানেজার ছিলেন। সাধনা ঔষধালয়ের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক শিলা ঘোষের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে নারায়ণ চক্রবর্তী বলেন, 'উনারা তো দেশে নেই, ভারতে। বেশির ভাগ সময় ওখানেই থাকেন। ওখান থেকেই সব কিছু পরিচালনা করেন। বছরে দু-চারবার আসেন। ভারতেও এ কম্পানি আছে-ওখানে সেটা দেখাশোনা করেন।'

যোগেশ চন্দ্র ঘোষের পরিবারের কাউকে পাওয়া গেল না। নারায়ণ চক্রবর্তী ও অফিস সহকারী রঞ্জিত কুমার দত্তই এখানের পুরনো চাকরিজীবী। দুজনেই বললেন, 'আমরা যোগেশ চন্দ্র ঘোষের ছেলে নরেশ চন্দ্র ঘোষকে দেখেছি। তিনিও অধ্যাপক যোগেশ চন্দ্র ঘোষের মতোই সাধনা, সৎ ও সদালাপী ছিলেন। নিয়মিত অফিস, কারখানায় আসতেন। নিজ তত্ত্বাবধানে সব কিছু করতেন। কর্মচারীদের বিপদে-আপদে সাহায্য করতেন। এখন প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার নরেশ চন্দ্র ঘোষের এক ছেলে প্রদীপ চন্দ্র ঘোষ ও মেয়ে শিলা ঘোষ। একসময় দেশ ছাড়িয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আমাদের ওষুধ যেত। এখন শুধু বাংলাদেশ আর ভারতে রয়েছে। এ দেশে ৬৮টি বিপণন কেন্দ্র রয়েছে। একসময় কম্পানির চার শ থেকে সাড়ে চার শ প্রকারের ওষুধ ছিল, এখন রয়েছে মাত্র ১২০ প্রকারের ওষুধ। যে আয় হয় তা দিয়ে কম্পানি মোটামুটি টিকে রয়েছে। কয়েক বছর ধরে আধুনিকায়নের চেষ্টা চলছে। আশা রাখি কম্পানির উন্নতি হবে।' কম্পানির ভেতরে বানরের উৎপাত। সমস্যা হয় কি না জানতে চাইলে নারায়ণ চক্রবর্তী বলেন, 'দিনে ১০-১৫ কেজি ছোলা দেওয়া হয়। তাতে ওরা শান্ত থাকে, এখন তো বানরের সংখ্যাও কমে গেছে, আগে প্রচুর ছিল। মাঝে কিছু দিন দেখলাম সরকারি উদ্যোগে বানরকে কলা দেওয়া হতো।'

যোগেশ চন্দ্র ঘোষ

শিক্ষাবিদ, আয়ুর্বেদশাস্ত্রী, শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যক্ষ যোগেশ চন্দ্র ঘোষের জন্ম ১৮৮৭ সালে শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার জলছত্র গ্রামে। বাবা পূর্ণচন্দ্র ঘোষ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শুরু গ্রামের স্কুলে। ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত মেধাবী। লেখাপড়ায় আগ্রহ দেখে বাবা ছেলেকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। ১৯০২ সালে ঢাকার জুবিলী হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা, ১৯০৪ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে এফএ পাস করে চলে যান পশ্চিমবঙ্গে। ১৯০৬ সালে কোচবিহার কলেজ থেকে স্নাতক, ১৯০৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর, এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ড। সেখান থেকে এফসিএস। তারপর আমেরিকা থেকে এমসিএস। ভালো চাকরি নিয়ে আমেরিকায় স্বাচ্ছন্দ্যেই থাকতে পারতেন; তা না করে দেশে ফিরে ভাগলপুর কলেজে রসায়নের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৯১২ সালে একই পদে চলে আসেন ঢাকার জগন্নাথ কলেজে। এ পদে ছিলেন ৩৫ বছর। ১৯৪৭ সালে কলেজের অধ্যক্ষ হন। ১৯৪৮ সালে চাকরি থেকে অবসর নেন।

 

সাধনা ঔষধালয়

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে পড়ার সময় তিনি প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের সান্নিধ্য পান। প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ই তাঁকে দেশজ সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের জ্ঞানকে কাজে লাগাতে উৎসাহ দেন। প্রফুল্ল চন্দ্রের দীক্ষা ও নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে ১৯১৪ সালে ৭১ দীননাথ সেন রোডে গড়ে তোলেন 'সাধনা ঔষধালয়'। কঠোর সাধনার মধ্য দিয়ে যে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন, এ বছর ১০১ বছরে পড়ল। জানা যায় বিপুল সাফল্যের কারণে একসময় চীন ও উত্তর আমেরিকায় সাধনা ঔষধালয়ের শাখা ছিল।

ভারতবর্ষে আয়ুর্বেদের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের। সেই পথপরিক্রমায় আয়ুর্বেদের জনপ্রিয়তা যখন ক্ষীণ হয়ে এসেছিল, তখনই একে পুনরুজ্জীবন দিয়েছেন অধ্যাপক যোগেশ চন্দ্র ঘোষ। এ সময়ে তিনি রোগ-ব্যাধির কারণ ও লক্ষণ, আয়ুর্বেদ চিকিৎসার অন্তর্নিহিত তত্ত্ব, আয়ুর্বেদ ওষুধের ব্যবহার পদ্ধতি ও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে বহু মূল্যবান বই লেখেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য বই-অগ্নিমন্দা ও কোষ্ঠবদ্ধতা, আরোগ্যের পথ, গৃহচিকিৎসা, চর্ম ও সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি, চক্ষু কর্ণ নাসিকা ও মুখ রোগ চিকিৎসা, আয়ুর্বেদ ইতিহাস, টেক্সট বুক অব এনঅর্গানিক কেমিস্ট্রি, সিম্পল জিওগ্রাফ, সিম্পল এরিথমেটিক, আমরা কোন পথে ইত্যাদি।

 

কিছু মৃত্যু থাকে জীবনেরও অধিক

জীবনের দীর্ঘ ছয়টি দশক আয়ুর্বেদ চিকিৎসার মাধ্যমে মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন যোগেশ চন্দ্র ঘোষ। সমাজের জনহিতকর কাজে তিনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন এবং পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় বহু হিন্দু পরিবার ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পদ ফেলে পাড়ি জমান ওপারে। দেশের মায়ায় বাঁধা পড়ে থেকে যান যোগেশ চন্দ্র ঘোষ। ১৯৬৪ সালে যখন হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার শহর হিসেবে পৃথিবীতে ঢাকার পরিচয় ছড়িয়েছে, তখনো নির্দ্বিধায় সব সংকটকে মোকাবিলা করে এখানেই থেকেছেন। ১৯৭১ সালেও দেশ থেকে নড়লেন না। অনেকে তাঁকে ভারতে চলে যাওয়ার কথা বললেও 'সাধনা ঔষধালয়' এবং দীর্ঘ ১৭ বছর একসঙ্গে থাকা দুই দারোয়ান রামপাল ও সুরুজকে নিয়ে থেকে যান। ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল স্থানীয় শান্তি কমিটির এক সদস্য একদল পাকসেনা নিয়ে গেণ্ডারিয়ার ৭১ দীননাথ সেন রোডে সাধনা ঔষধালয়ের কারখানায় প্রবেশ করে। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও 'নাশকতা'র কাজে সহায়তা করার অভিযোগে যোগেশ চন্দ্র ঘোষকে অফিসেই গুলি করে হত্যা করে। দেশ স্বাধীনের পর তাঁর ছেলে ডা. নরেশ চন্দ্র ঘোষ আবার সাধনা ঔষধালয়কে দাঁড় করান। জাতির জন্য আত্মদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯১ সালের শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে যোগেশ চন্দ্র ঘোষের নামে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ।

 



মন্তব্য