kalerkantho


খোসবাগ

ইতিহাসের হাহাকার

সুখেন্দু সেন   

২০ জুন, ২০১৫ ০০:০০



ইতিহাসের হাহাকার

সিরাজের কবরের সামনে লেখক

মুর্শিদাবাদে এখন পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ হাজারদুয়ারী প্যালেস মিউজিয়াম, যা একসময় ছিল বড়কুঠি বা নবাব প্যালেস। এটি নির্মাণ করেন মীর জাফরের পঞ্চম বংশধর নবাব হুমায়ুন জাঁ। দুর্লভ ও সমৃদ্ধ সংগ্রহের জন্য এ মিউজিয়ামের বিপুল খ্যাতি। তবে মীর জাফরের নাম জড়িয়ে থাকায় আমি বেড়িয়ে শান্তি পাইনি। আমার কাছে মুর্শিদাবাদ মানে পলাশীর প্রান্তর। বাংলার সূর্য অস্ত যাওয়া। মুহাম্মদী বেগ যে ছুরি দিয়ে সিরাজকে হত্যা করেছিল, সেই ছুরিটি এই প্যালেসেই সংরক্ষিত আছে। আর আছে সিরাজের ব্যবহৃত সাতনলা একটি বন্দুক। প্যালেস দেখে গেলাম খোসবাগ। এখানে বেশি মানুষ যায় না। আমার সঙ্গী হলো বিহারের ছেলে মুকেশ। সিরাজ বিহারেরও নবাব ছিলেন। খোসবাগে অবশ্য একটি ভালো বাগান আছে। সেখানে অনেক গোলাপ।

লালবাগ থেকে ভাগীরথী পার হয়ে দক্ষিণ দিকে প্রায় এক মাইল দূরে শান্ত ও নির্জন পরিবেশ খোসবাগের। শায়িত আছেন সুবে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলা। নবাব আলীবর্দী খাঁ জীবিত থাকাকালেই নিজ সমাধির জন্য নির্মাণ করেছিলেন প্রাচীর বেষ্টিত ও সুগন্ধি পুষ্পবৃক্ষশোভিত খোসবাগ। আলীবর্দীর পাশেই প্রিয় দৌহিত্র সিরাজের সমাধি। সিরাজের পদপ্রান্তে বেগম লুৎফা। পূর্ব পাশে শায়িত আছেন সিরাজের ভ্রাতা মির্জা মেহেদি, যাঁকে সিরাজের মতোই নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছিল। অত্যন্ত সাধারণ সমাধিক্ষেত্র। কোনো আড়ম্বর নেই। ২৫০ বছরের ইতিহাস এখানে স্থির, অচঞ্চল। গভীর এক বিষণ্নতায় অন্তর ছেয়ে গেল। চলে গেলাম ১৭৫৭ সালে। ফুলের বাগানগুলো যেন বিস্তীর্ণ আম্রকানন। এক প্রান্ত থেকে ক্লাইভের ইংরেজ বাহিনী কামান দাগছে। অন্য প্রান্তে নবাবের বিশাল বাহিনী মীর জাফরের নির্দেশে পুতুলের মতো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। গুটিকতক অনুগত সৈন্য নিয়ে মীর মদন আর মোহনলাল প্রাণপণে লড়ছেন। কামানের গোলার বিস্ফোরণে মীর মদন হঠাৎ লুটিয়ে পড়লেন যুদ্ধক্ষেত্রে। নবাব সিরাজ উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে গেলেন সেনাপতি মীর জাফরের কাছে। মিনতি করলেন আক্রমণের নির্দেশ দিতে। একবার যদি একযোগে আক্রমণ করা যেত ক্লাইভের বাহিনী হয়তো টিকতে পারত না। রক্ষা পেত বাংলার স্বাধীনতা। পলাশীর প্রান্তরে ডুবত না স্বাধীনতার সূর্য। দাদা কি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন? আপনি কি বাংলাদেশের? গাইড সম্ভবত কয়েকবারই এ প্রশ্ন করেছিল। উত্তর পাওয়ার আগেই আবার বলতে শুরু করল-বাংলাদেশের লোকেরাই এখানে বেশি আসে। ওদের কাছে মনে হয়, কেবল সিরাজই বাংলার নবাব। সিরাজকে হত্যা করে তো মুর্শিদাবাদের মসনদে বসেছিলেন মীর জাফর আলী খাঁ। পরবর্তী সময়ে মীর জাফরের বংশধররাই হয়েছিলেন সুবে বংলার নবাব। কত শানশওকত ছিল নবাবদের। মুর্শিদাবাদের কেউ তো সিরাজের কথা মনে রাখেনি। গাইডের কথায় সংবিৎ ফিরে পেলাম। তাকিয়ে দেখলাম মুকেশ কাছে নেই। অদূরের বাগানে গোলাপের ভ্যারাইটি দেখছে খুব মন দিয়ে।

 



মন্তব্য