kalerkantho


সরাইলের গ্রেহাউন্ড

দেশের একটি বাড়িতেই কেবল প্রজনন ও বিক্রি হয় গ্রেহাউন্ড জাতের সরাইল কুকুর। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের সেই বিখ্যাত বাড়ি ঘুরে এসে লিখেছেন বিশ্বজিৎ পাল বাবু   

১৬ মে, ২০১৪ ০০:০০



সরাইলের গ্রেহাউন্ড

কুকুরছানা কোলে নিয়ে অজিত রবি দাস

বাড়িতে ঢোকার পরই ঘেউ ঘেউ। একটু এগিয়ে দেখা গেল কুকুরগুলো। শিকলে বাঁধা, তবুও আগন্তুক দেখে তেড়ে এলো। বাড়ির চারপাশের গাছের নিচে বাঁধা কুকুরছানা। মণি রবি দাস নামে এক নারী এগিয়ে এসে জানালেন, ছানাগুলো বিক্রি হবে। কেবল কালোটা বাদে। ওটা বিক্রি হয়ে গেছে। বাকিগুলো আছে বিক্রির অপেক্ষায়। দাম কত? একেকটি ছানা ১০ থেকে ৪০ হাজার টাকা! বাড়িটাকে লোকে চেনে 'কুকুরবাড়ি' হিসেবে। আছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামে। সে বাড়িতে যেতে বেগ পেতে হয়নি কোনো। সরাইল সদরের কালীকচ্ছ বাজার থেকে দুই কিলোমিটারের পথ। পথে অন্তত ১০ জনের সঙ্গে দেখা। 'কুকুর বিক্রি হয় সে বাড়িটা কোন দিকে?' পথ দেখিয়ে দেন সবাই।

তিন ভাই- জিতু রবি দাস, তপন রবি দাস ও অজিত রবি দাসের একান্নবর্তী পরিবার। এ পরিবারের প্রধান পেশা কুকুর বিক্রি। তাঁরা বিক্রি করেন সরাইলের ঐতিহ্যবাহী 'গ্রেহাউন্ড' জাতের কুকুর। সারা ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলায় কেবল এই একটি বাড়িতেই এ জাতের কুকুরের প্রজনন ঘটে। তাঁদের বাপ-দাদারও পেশা ছিল কুকুর বিক্রি। তবে কুকুর বিক্রি করে রোজগার আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। ফলে কুকুর পালার পাশাপাশি মুচির কাজেও লেগেছেন ভাইয়েরা।

তপন দাসের বাড়িতে আছে প্রায় ২০টি কুকুর। বড় কুকুর ছয়টি। সেগুলো বাচ্চা দেয়। শাবকগুলোকে বিক্রি করা হয়। দুধ-ভাত, মাছ-মাংস কুকুরছানার প্রিয় খাবার। সুস্বাস্থ্যের জন্য মাঝেমধ্যে মাংসও খাওয়ানো হয়। কেবল মিষ্টিজাতীয় কিছু খাওয়ানো হয় না। তবে আগের মতো গ্রেহাউন্ডের যত্ন নেওয়া সম্ভব হয় না জায়গা ও খরচের অভাবে। তপন দাস বললেন, 'একটি কুকুর পালতে যে পরিমাণ খাবার খাওয়ানো দরকার, তা জোগাতে পারি না। নিজেদেরই তিনবেলা ভালো করে খাওয়া জোটে না, কুকুরকে কী খাওয়াব? কেবল পৈতৃক পেশা বলে ধরে রেখেছি। আগের মতো গ্রেহাউন্ডও জন্মে না। পাঁচটি বাচ্চা জন্মালে দুটো মরে যায়। রোগবালাইও বেশি হয়।' ফলে গ্রেহাউন্ডের সঙ্গে অন্য কুকুরের মিলনের মাধ্যমে নতুন জাতের কুকুরের প্রজননে মনোযোগী হয়েছেন। সেগুলোকে বলেন 'ক্রস'।

সরাইলের কুকুর বহুকাল ধরে ইতিহাসের পাতায় নাম কুড়িয়ে আছে। নানা কিংবদন্তি, ঘটনার জন্মদাতা এ কুকুর। বহুকাল আগে জমিদারের এক দেওয়ান হাতি নিয়ে কলকাতা যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে একটি কুকুর দেখে খুব ভালো লেগে যায়। কুকুরটিকে নিতে আগ্রহী হলেন। তবে বাদ সাধলেন কুকুরের মালিক। প্রিয় প্রাণীটি কোনোমতেই হাতছাড়া করবেন না। দেওয়ানও হিংস্র কুকুরটি নেবেনই। অনেক কথাবার্তা, আলাপ-আলোচনা, বাদ-বিবাদের পর হাতির বিনিময়ে কুকুর নিয়ে ফিরলেন জমিদারের দেওয়ান। সেটিই শ্বাপদসংকুল জঙ্গলে হবে তার একমাত্র রক্ষাকর্তা, শিকারের সঙ্গী। সরাইলের জমিদারের দেওয়ানের হাত ধরে এভাবেই গ্রেহাউন্ড চলে আসে ব্রাক্ষণবাড়িয়ায়।

একেক কুকুরের একেক নাম- টাইগার, মধু, পপি, কালি, লালি, টমি, কালা। নাম ধরে ডাকার সঙ্গে সঙ্গে হাজির হয় কুকুরটি। নাম রাখা হয় জন্মের কিছুদিন পর দেহের বর্ণ বা স্বভাব অনুযায়ী। গ্রামাঞ্চলে শিয়াল, বনবিড়াল, বাগডাশ শিকারে পারদর্শী। শহুরে মানুষের কাছে পালিত হয় শখে।

দেখতে অনেকটা শিয়ালের মতো। হালকা-পাতলা গড়ন। আকারে লম্বাটে; স্বভাবে বাঘ। চোখেমুখে শিকারের নেশা! উপমহাদেশে বিখ্যাত এই কুকুর আদি আবাসের রেশ ধরে 'সরাইলের কুকুর' নামে পরিচিত। বছরখানেক আগে যোগ দিয়েছে র‌্যাবের ডগ স্কোয়াডে।

 



মন্তব্য