kalerkantho

রাসায়নিকের গুদাম সরেনি, তালিকা নেই

চুড়িহাট্টায় অভিযান হাঁকডাকেই সারা!

রেজোয়ান বিশ্বাস ও শাখাওয়াত হোসাইন   

২৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডের পর গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রাসায়নিক গুদাম ও কারখানার তালিকা ১৫ দিনের মধ্যে জমা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন পুলিশ কর্মকর্তারা। এ সময় আইজিপি ড. জাবেদ পাটোয়ারী এবং ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া উপস্থিত ছিলেন। একই আশ্বাস এসেছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) থেকেও। এরপর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পাঁচটি দলে বিভক্ত হয়ে রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম সরাতে সংশ্লিষ্ট সব কটি সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধি নিয়ে অভিযানও শুরু করে বিশেষ একটি টাস্কফোর্স। অভিযানের এক মাস পর এসে টাস্কফোর্সের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ডিএসসিসি এখনো তালিকা করেনি। পুরান ঢাকার রাসায়নিক কারখানা এবং গুদামের সার্বিক তথ্য নেই প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক  মো. সামসুল আলমের কাছেও।

ডিএসসিসির একাধিক কর্মকর্তা কোনো তালিকা না পাওয়ার বিষয়টি কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তালিকা না থাকলেও রাসায়নিক কারখানা সরাতে সমর্থ হবেন তাঁরা। ডিএসসিসির মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেন, ‘রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা সরাতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে এখনো কোনো তালিকা করা হয়নি।’ লালবাগ বিভাগের পুলিশ বলছে, পুলিশ এলাকার সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করছে। তালিকা করা তাদের কাজ নয়। এটা করবে বিস্ফোরক অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন ও ফায়ার সার্ভিস।

অভিযানও চলছে ঢিমেতালে। এখন পর্যন্ত ৩৭টি রাসায়নিক গুদামের মালিককে কারখানা সরিয়ে নিতে নির্দেশ দিয়েছে টাস্কফোর্স। সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিনে অভিযান রাখা হয় বন্ধ। এ ছাড়া অভিযানে গেলেও দু-তিন ঘণ্টা থেকে সাত-আটটি বাড়ি পরিদর্শন শেষে নিজ কার্যালয়ে ফিরে যান কর্মকর্তারা। সর্বশেষ গত রবিবার পাঁচটি দলের মধ্যে অভিযান পরিচালনা করেছে মাত্র দুটি দল।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কারখানা থেকে এখনো মালামাল সরানো হয়নি। কয়েকজন ব্যবসায়ী কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁরা এখনো কেমিক্যাল কারখানা স্থানান্তরের বিপক্ষে। রাসায়নিক বা কেমিক্যাল কারখানার পরিবর্তে প্লাস্টিক কারখানাগুলোতে শুরুতেই অভিযান চালানো হচ্ছিল বেশি। এ কারণে অভিযানের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে ব্যবসায়ীদের বাধার মুখে পড়ে টাস্কফোর্স। এরপর কয়েক দফা বৈঠকের পর ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে গত ১০ মার্চ প্লাস্টিককে অভিযানের আওতামুক্ত ঘোষণা করেন ডিএসসিসির মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। এর পর থেকে রাসায়নিকের পাশাপাশি পলিথিন কারখানা ও গুদামে অভিযান চলছে।

আবার অভিযান পরিচালনার পর ব্যবসায়ীরা রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা সরাতে শুরু করেছেন—ডিএসসিসি কর্মকর্তারা এমন দাবি করলেও সরেজমিনে গিয়ে সে তথ্যের কোনো প্রমাণ মেলেনি। সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুরান ঢাকায় কয়েক হাজার রাসায়নিক গুদাম আছে। চলমান বিশেষ অভিযানকে বাধা দিয়ে এলাকাতেই কারখানা রাখার চেষ্টা চলছে।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউম মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বেলায়েত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা রাসায়নিক গুদাম সরানোর বিপক্ষে না। তবে সরিয়ে রাখব কোথায়? সরকার রাসায়নিক সরানোর আলাদা জায়গা বা যত দ্রুত আমাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে তত দ্রুত আমরা সরে পড়ব।’ তিনি বলেন, ‘যে ২৯টি কেমিক্যাল নিষিদ্ধ করা হয়েছে সেগুলো এখন আর ব্যবসায়ীরা রাখে না। টাস্কফোর্সের অভিযানের পরও কেউ যদি এই নিষিদ্ধ কেমিক্যালের ব্যবসা করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে আমরা বাধা দিব না।’

তবে ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর জাহিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অভিযান নিয়মিত চলছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম সরাতে পারব বলে আশাবাদী।’

ডিএসসিসির তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ মার্চ পর্যন্ত দাহ্য রাসায়নিক রাখার অভিযোগে ১৬২টি বাড়ির পরিষেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে টাস্কফোর্স। এর মধ্যে ১৬টি বাড়ি থেকে রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা সরিয়ে নেওয়ায় সেবা সচল করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২৭টি প্রতিষ্ঠান সিলগালা এবং চারটি বাড়ি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে টাস্কফোর্স। একই সঙ্গে ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে ৯৭ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

চলমান অভিযানের একপর্যায়ে চকবাজার জয়নাগ রোডের ১৯ নম্বর বাড়িতে অভিযান চালায় টাস্কফোর্স। সেখানে লামিয়া এন্টারপ্রাইজে নিষিদ্ধ রাসায়নিক পেয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে টাস্কফোর্স। একই অভিযানে জুড়িয়াটুলি লেনের ৩৬/১ নম্বর ভবনের আরেকটি ভবনে রাসায়নিক গুদামের সন্ধান পেয়ে এই ভবনের পরিষেবা বন্ধ করে দেয় টাস্কফোর্স। ওই অভিযানের সাত দিন পরও এ দুটি কারখানাতে গিয়ে দেখা যায়, মালামাল আগের মতো গুদামজাত করে রাখা হয়েছে। কারখানায় তালা মেরে রাখা হয়েছে।

টাস্কফোর্সের অভিযানেও ঢিলেঢালা ভাব চলে এসেছে। আগামী ১ এপ্রিল পর্যন্ত অভিযান চালানোর কথা থাকলেও মাঝে বেশ কয়েক দিন অভিযান চালানো হয়নি। পাঁচটি টিমের সমন্বয়ে অভিযান চালানোর কথা থাকলেও কোনো কোনো দিন একটি আবার দুটি টিম অভিযান চালাচ্ছে। যদিও অভিযান চালকরা বলেছেন, অভিযানের সময় ঠিকমতো রাসায়নিক পাওয়া যাচ্ছে না, কারণ ব্যবসায়ীরা এরই মধ্যে রাসায়নিক সরিয়ে নিয়েছে। তবে রাসায়নিক সরিয়ে তারা কোথায় রাখছে তা জানার চেষ্টা করছে না টাস্কফোর্স। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল গুদাম সরকার নির্ধারিত কেরানীগঞ্জসহ অন্যত্র সরানো হবে কি না। শ্যামপুর ও টঙ্গীতে সরকারিভাবে রাসায়নিক সরানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সেখানে এখনো কোনো গুদাম তৈরি করা হয়নি।

এরই মধ্যে র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ পুরান ঢাকার রাসায়নিক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বলেছেন, ‘অভিযানের ভয়ে কেমিক্যাল সরিয়ে কেউ কেউ নিজের ও আত্মীয়ের বাসায় রাখছে। তাই পুরান ঢাকাকে সেফ করতে গিয়ে দাহ্য পদার্থ ছড়িয়ে পুরো ঢাকাকে যেন টাইম বোমায় পরিণত না করা হয়।’ গত ফেব্রুয়ারি মাসে পুরান ঢাকার চকবাজার থানার চুড়িহাট্টায় রাসায়নিক থেকে ভয়াবহ আগুনে এখন পর্যন্ত ৭৪ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এর আগে ২০১০ সালে নিমতলিতে অগ্নিকাণ্ডের পর পুরান ঢাকার গুদাম ও দোকানগুলোতে রাসায়নিক ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ ছিল। যারা ট্রেড লাইসেন্স নিয়েছে তাদের নবায়নও বন্ধ আছে। নতুন করে আর কাউকে পুরান ঢাকায় ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না বলে জানা গেছে।

মন্তব্য